×
South Asian Languages:
রুশী ইতিহাসের রহস্য

শুধুমাত্র মানুষের মধ্যেই রাখাঢাকা থাকে না, স্মৃতিসৌধদেরও থাকে নিজস্ব রহস্য. রুশী স্থাপত্যশিল্পের অন্যতম সেরা ও জাজ্বল্যমান নিদর্শণ হচ্ছে মস্কোর রেড স্কোয়ারের একেবারে মাঝখানে অবস্থিত তদ্গত ভাসিলি ক্যাথেড্রাল. এই ক্যাথেড্রালটির নির্মাণ ও তার অস্তিত্ব বজায় রাখা প্রচুর লোকগাথা ও রহস্যের অবগুন্ঠণে ঢাকা. দীর্ঘকাল যাবত্ ঐ ক্যাথেড্রালের প্রধান স্থপতির নামই অজানা ছিল, নাম জানা যাওয়ার পরেও আজ পর্যন্ত তার পরবর্তী জীবন সম্পর্কে কোনো হদিশ পাওয়া যায়নি.

শীতল যুদ্ধের কয়েক দশক ধরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল পৃথিবীর অন্যতম সবচেয়ে অনমনীয় লৌহ প্রাচীরের আড়ালে. ঐ দেশে অসংখ্য নিষিদ্ধ জায়গা ছিল. সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বসে পড়ার পরে আকস্মিক মুক্তির হাওয়ায় মাতাল সমাজ সব গুপ্ত তথ্য ফাঁস করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল. প্রাচীণ চৈনিক দার্শনিক লাও-জী বলেছিলেন, যে “প্রাজ্ঞ ব্যক্তি সবরকম চরমপন্থা এড়িয়ে চলে”. কিন্তু তুমুল পরিবর্তনের যুগে চরমপন্থা পুরোপুরি বর্জন করা সম্ভব হয় নাঃ কৃত্রিমতার মুখোশ খুলে দিতে গিয়ে সাংবাদিকরা তখন প্রায়ই বাড়াবাড়ি করে ফেলতো, চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস করার নাম করে তারা তখন কল্পনাপ্রসূত বৃত্তান্তাবলীকে অমোঘ সত্য বলে প্রচার করেছিল.

     পঞ্চদশ শতাব্দীটা ছিল ভৌগলিক আবিষ্কারের যুগ. নতুন নতুন ভূমি আবিষ্কার করছিল দুঃসাহসী সমুদ্রযাত্রীরা, গবেষকরা মেতে উঠেছিলেন নতুন নতুন জগত্ অধ্যয়নের জোরদার কাজে. বহু ইউরোপীয়ই রহস্যে মোড়া ভারতবর্ষ আবিষ্কার করার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তাদের পেছনে ফেলে দিয়েছিলেন এক রুশী পরিব্রাজক - বণিক আফানাসি নিকিতিন.
      ১৮১২ সালের বসন্তে রাশিয়া বড় যুদ্ধের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল. ততদিনে প্রায় গোটা ইউরোপ জয় করা ফরাসী সম্রাট নেপোলিয়ন পূর্ণোদ্যমে রাশিয়া আক্রমণের তোড়জোর শুরু করেছিলেন আমাদের দেশের পশ্চিম সীমান্তে. রাশিয়া প্রতিরক্ষার আয়োজন করছিল. এই অশান্ত সময়ে জেনারেল আলেক্সান্দর তুচকোভের সাথে দেখা করতে এলেন তার অর্ধাঙ্গিনী মার্গারিতা. সুদীর্ঘ ও দুর্গম পথযাত্রায় ক্লান্ত হয়ে মার্গারিতার ঝিমুনি এসেছিল.
     কূটনীতির মুখ্য কর্তব্য - দেশেদের মধ্যে বিরোধের নিরসন. এই শুভ লক্ষ্য সাধন করার জন্য সব উপায়ই গ্রহণযোগ্য, এমনকি গোপনও. রুশী কূটনীতিজ্ঞদের মধ্যে বহু এমন ডাকসাইটে ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যারা অবধারিত যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করেছেন. তাদেরই অন্যতম গ্রাফ সিমিওন ভোরোন্তসোভ ১৭৮৫ থেকে ১৮০৬ সাল পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেনে রাশিয়ার স্বার্থ রক্ষা করেছিলেন.
    ৬০ বছর আগে ১৯৫৩ সালের ৫ই মার্চ মস্কোর উপকন্ঠে রাষ্ট্রীয় খামার বাড়িতে সোভিয়েত ইউনিয়নের দন্ডমুন্ড বিধাতা জোসেফ স্তালিন মারা যান. সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, ৭৪ বছর বয়সী স্তালিনের মৃত্যুর কারণ ছিল মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ. কিন্তু খুব শীঘ্রই তার মৃত্যুর সাথে সোভিয়েত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের জড়িত থাকার গুজব ছড়িয়ে পড়তে থাকে.
      ১৯৩৪ সালের ১লা ডিসেম্বর লেনিনগ্রাদে(অধুনাতন সেন্ট-পিটার্সবার্গে) সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির জেলা কমিটি ভবনে গুলির আওয়াজ শোনা গেল. নিজের ক্যাবিনেটের চৌকাঠে খুন হলেন লেনিনগ্রাদের কমিউনিস্টদের নেতা ও সোভিয়েত একনায়ক জোসেফ স্তালিনের ব্যক্তিগত বন্ধু সের্গেই কিরভ. আততায়ীকে অপরাধস্থলেই ধরা হয়. দেখা গেল, যে সে পার্টির লেনিনগ্রাদ জেলা কমিটির প্রাক্তন কর্মী লেওনিদ নিকোলায়েভ.
ক্ষমতার ভার যতই দুঃসহ হোক না কেন, সর্বদাই এমন লোকেদের দেখা পাওয়া যায়, যারা যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা পাওয়ার স্বপ্ন দেখে. তারা সেজন্য যে কোনো উপাদান ব্যবহার করেঃ ষড়যন্ত্র, ঘুষ, প্রতারণা. আরাধ্য লক্ষ্য সাধন করার মরিয়া প্রচেষ্টায় অনেক বেহিসাবী লোক অন্যের নাম ভাঙায়, নিজেদের পরিচয় দেয় বিখ্যাত কোনো ব্যক্তি বা তার উত্তরসূরী বলে.
রাশিয়ার সব শাসকদের মধ্যে প্রথম আলেক্সান্দরের ব্যক্তিত্ব বোধহয় ছিল সবচেয়ে রহস্যময়. তাঁর সিংহাসনে আরোহণ এবং তার তিরোধান রহস্যে মোড়া. সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় একাতেরিনার পরম আদরের পৌত্র আলেক্সান্দরের জন্ম হয়েছিল ১৭৭৭ সালে. শৈশব থেকেই তাঁকে পরম ক্ষমতাশালী ঠাকুমা ও তাঁর সাথে সারাক্ষণ বিবাদরত পিতা রাজকুমার পাভেলের মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলতে হতো.
রাশিয়ার রাজতন্ত্রের ইতিহাসে কম রহস্য লুকিয়ে ছিল না. প্রজাদের কোনো ধারনাই ছিল না, যে বর্ণাঢ্য প্রাসাদগুলির প্রাচীরের অন্তরালে কত মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটতো. কিন্তু ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পরে জারের পরিবারের মহাফেজখানা জনগণের জন্য খুলে দেওয়া হয়, তাদের ডায়েরী, চিঠিপত্র পড়ার সুযোগ হয়. সেখান থেকেই আমরা জানতে পারি, যে জারের পরিবারে হৃদয়াবেগ কিরকম তোলপাড় করতো.
জার প্রথম পাভেলের গোটা জীবনটা ছিল গোলকধাঁধা. এমনকি তার জন্মও রহস্যে মোড়া. রাজসভায় কানাঘুষো করা হতো, যে তিনি নাকি জার তৃতীয় পিটারের সন্তান ছিলেন না, তাঁর জন্ম নাকি হয়েছিল সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় একাতেরিনার প্রেমিক কাউন্ট সালতিকোভের ঔরসে. জার পাভেল এই গুজব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন এবং সারাজীবন এতে তাঁর হৃদয় বিদারিত হয়েছে. পাভেল সিংহাসনে আসীন ছিলেন ১৭৯৬ সাল থেকে ১৮০১ সাল পর্যন্ত.
স্মরণাতীত কাল থেকে সব দেশের মানুষ জুয়ো খেলার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে. কঠোর নিষেধাজ্ঞা সবসময় কাজ দেয়নি. খেলুড়েরা পাশ কাটিয়ে যেত, খেলার জন্য গোপন সব জায়গায় জড়ো হয়ে. রাশিয়ায় তাসের আবির্ভাব হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীতে ইভান দ্য টেরিবলের রাজত্বকালে এবং এতটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল, যে চাষীরা এমনকি গীর্জার পাশেও খেলতো. ধর্মপ্রচারকদের উদ্যোগে তাস দিয়ে জুয়ো খেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল.
ক্ষমতাসীন প্রত্যেক ব্যক্তি – সে তিনি রাষ্ট্রপতিই হোন, রাজা বা জার – সারাক্ষণ জনসমক্ষে. তাদের দিকে হাজার হাজার চোখের দৃষ্টিনিবদ্ধ. তাদের যে কোনো অপ্রিয় কাজ বা অসতর্ক মন্তব্য সাথেসাথে প্রচার হয়ে যায় সমাজে. জনতার অহর্নিশ মনোযোগ থেকে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা চেষ্টা করেন অন্ততঃ তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে আড়াল করার, কিন্তু তা সবসময় সফল হয় না.
চিরকাল সব জাতির মানুষের মধ্যে যে কোনো মূল্যে ক্ষমতায় আসীন হতে উত্গ্রীব লোক কম ছিল না. অনুগামীদের আকৃষ্ট করে এই সব লোক সিংহাসনের ন্যায্য উত্তরাধিকার বলে দাবী জানাতো. অধিকাংশ নাম ভাড়ানো মিথ্যুকরা ধরা পড়েছে, তবে কেউ কেউ সিংহাসনে আসীন হতে পেরেছে. সপ্তদশ শতকের সূচনাকে রাশিয়ায় মাত্স্যন্যায় বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে.
যে কোনো সভ্যতার ইতিহাস বহু রহস্য দিয়ে বোনা, রাশিয়া – তার ব্যতিক্রম নয়. রুশদেশের ইতিহাস যেন জটিল এক শব্দজব্দ. তার এক অংশ মোটামুটি তথ্যভিত্তিক উত্সের মাধ্যমে ভরা, দ্বিতীয়াংশ শব্দজব্দের ফাঁকা ঘর. তবে ভরা ঘরগুলোর মধ্যেও কম ধাঁধা লুকিয়ে নেই, কারণ সেগুলিকে পূর্ণ করেছে নিস্পৃহ লোকেরা নয়. একই ঘটনাকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, তাই উত্তরপুরুষদের মধ্যেও মতভেদের সৃষ্টি হয়.
1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31
ডিসেম্বর 2017
ঘটনার সূচী
ডিসেম্বর 2017
1
2
3
4
5
6
7
8
9
10
11
12
13
14
15
16
17
18
19
20
21
22
23
24
25
26
27
28
29
30
31