১. মস্কো সময় সকাল ৯টা বেজে ৭ মিনিটে কাজাখস্থানের বৈকানুর মহাকাশ উড়ান কেন্দ্র থেকে ১২ই এপ্রিল ১৯৬১ সালে ইউরি গাগারীন সমেত মহাকাশযান "ভস্তক" আকাশে উড়েছিল. প্রথম মহাকাশচারী পৃথিবীর চারদিকে মহাকাশের কক্ষপথে একটি পাক খেয়ে ১০ টা বেজে ৫৫ মিনিটে রাশিয়ার ইউরোপীয় অংশের দক্ষিণ পূর্বে সারাতভ এলাকার স্মেলোভকা গ্রামের কাছে পৃথিবীর মাটিতে নেমে আসেন.

২. উড়ানের পরে প্রথম যে লোকেরা মহাকাশচারীকে দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁরা হলেন বন রক্ষী কর্মীর স্ত্রী ও তাঁর ছয় বছরের নাতনি রিতা. কাছের সামরিক ঘাঁটি থেকে কিছু পরেই সৈন্যরা হাজির হয়েছিলেন, তাঁদের একটি দল মাটিতে নেমে আসা মহাকাশ যানের অংশ পাহারা দিতে শুরু করেছিলেন, আর একটি দল গাগারীনকে নিয়ে ঘাঁটিতে ফিরে গিয়েছিলেন. সেখান থেকে গাগারীন টেলিফোনে রিপোর্ট করেছিলেন: "বিমানবাহিনীর প্রধানকে জানাতে বলছি: কাজ শেষ করেছি, মাটিতে নেমে এসেছি আগে থেকে ঠিক করা জায়গায়, ভালই বোধ করছি, কোন রকমের আঘাত লাগেনি বা হাড় ভাঙে নি. গাগারীন".

৩. "ভস্তক" রকেট ছিল তিনটি ভাগের. রকেটের সব কটি ভাগের এঞ্জিনের সর্বমোট শক্তি ছিল ২ কোটি অশ্ব শক্তিরও বেশী. শেষ ধাপের রকেট পরিবাহক সমেত মহাকাশ যানের ওজন ছিল ৬, ১৭ টন, লম্বা ছিল – ৭, ৩৫ টন, আর শেষ ধাপ ছাড়া ওজন ছিল – ৪, ৭৩ টন.

৪. মহাকাশ যান "ভস্তক" ছিল দুটি ভাগে, একটি ছিল নীচে নেমে আসার যন্ত্র সমেত ও অন্যটি ছিল যন্ত্রপাতির ভাগ. নীচে নেমে আসার অংশটি ছিল একটি ২, ৩ মিটার ব্যাসের গোলক ও তার ওজন ছিল ২, ৪ টন. তার ভিতরে ছিল মহাকাশচারীর জন্য আসন, নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রপাতি, জীবন সংরক্ষণের ব্যবস্থা. এই আসন এমন ভাবে তৈরী করা হয়েছিল, যাতে উড়ান ও নীচে নেমে আসার সময়ে প্রবল চাপ মহাকাশচারীর উপরে সবচেয়ে কম প্রভাব ফেলে. কেবিনে পৃথিবীর মতই স্বাভাবিক বায়ুর চাপ ও হাওয়া ছিল. মহাকাশচারীর বিশেষ পোষাকের হেলমেট খোলা রাখা হয়েছিল আর মহাকাশচারী যানের ভিতরে স্বাভাবিক নিশ্বাস নিতে পারছিলেন. জীবন সংরক্ষণের ব্যবস্থা হিসাব করা হয়েছিল দশ দিনের জন্য.

৫. গতি কমানোর ইঞ্জিন চালু হওয়ার পরে মহাকাশ যানের বেগ কমে ও তা নীচে নামতে শুরু করেছিল. সাত হাজার মিটার উচ্চতায় যানের ঢাকনা খুলে নীচে নেমে আসার যন্ত্র থেকে মহাকাশচারীর আসন সমেত তিনি ছিটকে বেরিয়ে আসেন. চার হাজার কিলোমিটার উচ্চতায় আসন মহাকাশচারীর কাছ থেকে আলাদা হয়ে নীচে পড়তে শুরু করে, মহাকাশচারী নিজেই নামতে শুরু করেন. আর আড়াই হাজার কিলোমিটার উচ্চতা থেকে আসল প্যারাশুট খুলে যাওয়ার পরে নীচে নামার যন্ত্র আলাদা করে মাটিতে আলতো করে নেমে আসে.

৬. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা "নাসা" বহুদিন পর্যন্ত গাগারীনের এই মহাকাশ ভ্রমণকে সম্পূর্ণ বলে মানতে চায় নি. আমেরিকার লোকেদের দৃষ্টিকোণ থেকে মহাকাশচারীর সম্পূর্ণ ভ্রমণ হতো যদি তিনি নীচে নেমে আসার যন্ত্র একসাথে নিয়ে নামতে পারতেন. বিশ্বের সমাজ ও বৈজ্ঞানিক মহল আমেরিকার এই দৃষ্টিকোণ মানতে পারে নি.

৭. ভবিষ্যতের মহাকাশচারীদের বেছে নেওয়া ও তৈরী করার কাজ সোভিয়েত দেশের সামরিক বিমান বাহিনীকে দেওয়া হয়েছিল. মহাকাশচারী বাছা হয়েছিল যুদ্ধ বিমান চালক দের মধ্য থেকে, তাদের বয়সের সীমা ছিল ৩৫, উচ্চতা ১৭৫ সেন্টিমিটারের কম ও ওজন ৭৫ কিলোগ্রাম অবধি. প্রথমে ২০ জনকে বাছা হয়েছিল মহাকাশচারী হিসাবে. তার মধ্যে ইউরি গাগারীনও ছিলেন.

৮. নিজের বিশ্ব জয়ী উড়ানের পরে গাগারীন বিদেশ যাত্রা সূচীর মধ্যে তিরিশটি দেশে গিয়েছিলেন. ঐতিহাসিক মহাকাশ ভ্রমণের পরে সবচেয়ে প্রথম দেশ যেখানে তিনি গিয়েছিলেন, তা ছিল ভারতবর্ষ. ইউরি গাগারীন এর পরে বহুবার মনে করেছেন ও নিজের কাছের লোকেদের কাছে ভারতের ভোলা যা না এমন বেড়ানোর কথা ও সেখানের লোকেদের উষ্ণ অভিনন্দনের গল্প করেছিলেন.

৯. ১৯৬৪ সালে গাগারীন মহাকাশচারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সহকারী প্রধান পদে আসীন হয়েছিলেন. তিনি মহাকাশচারীদের বহু মহাকাশ ভ্রমণের প্রস্তুতি ও প্রযুক্তি নির্মাণে সহায়তা করেন. গাগারীন চন্দ্র অভিযানের জন্যও কম শক্তি প্রয়োগ করেন নি, তিনি নিজেই এমন কি তখন তৈরী করা হচ্ছিল এমন এক সম্ভাব্য মহাকাশ যানে পাঠানোর জন্য চন্দ্র অভিযাত্রী দলের সদস্য ছিলেন.

১০. বিশ্বের প্রথম মহাকাশচারী ২৭শে মার্চ ১৯৬৮ সালে মিগ – ১৫ যুদ্ধ বিমানে চড়ে একটি প্রশিক্ষণ উড়ানে দুর্ঘটনায় মারা যান.

১১. ১৯৬০ এর দশকে সোভিয়েত দেশে (এমন কি পশ্চিমের দেশেও দুই একটি শোনা যায় এমন হয়েছিল) বহু সদ্যজাত শিশুর নাম ইউরি রাখা হয়েছিল তাঁর সম্মানে.

১৩. গাগারীনের সম্মানে চাঁদের উল্টো পিঠের খাদের নামকরণ করা হয়েছিল.

১৪. ইউরি গাগারীনের নামে একটি স্বর্ণ পদক ঠিক করেছে আন্তর্জাতিক বিমান সংগঠন (FAI), যা ১৯৬৮ সাল থেকে রুশ ও আমেরিকার মহাকাশচারীদের মহাকাশ গবেষণায় তাঁদের অবদানের জন্য দেওয়া হয়ে থাকে.

১৫. সোভিয়েত দেশের বহু জনপদে ইউরি গাগারীনের নামে রাস্তা, স্কোয়ার, বড় রাস্তা, পার্ক, ক্লাব, স্কুল রয়েছে.

১৬. গাগারীনের নামে ১৯৬৮ সালে স্মোলেনস্ক অঞ্চলের একটি শহরের নাম দেওয়া হয়েছিল.

১৭. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশচারীরা, যাঁরা চাঁদে গিয়েছিলেন, তাঁরা সেখানে মহাকাশ গবেষণায় যাঁরা প্রাণ উত্সর্গ করেছেন, সেই রকম লোকেদের মুখাবয়ব সমেত স্মৃতি পদক রেখে এসেছেন. সেই রকম দুটি পদকে, যেখানে সোভিয়েত মহাকাশচারীদের ছবি রয়েছে – তার একটিতে রয়েছে ইউরি গাগারীনের ছবি.