২০১২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে মালদ্বীপে এক অভ্যুত্থান হয়েছিল, যেখানে ভারত পন্থী রাষ্ট্রপতি মোহামেদ নাশিদকে ক্ষমতা থেকে অপসৃত করা হয়েছিল. মনে হয়েছিল যে, এই এলাকায় শক্তির ভারসাম্য চিনের পক্ষেই চলে গিয়েছিল. পরবর্তী কালের ঘটনা মনে হয়েছিল যে, এটারই যেন প্রমাণ: মালদ্বীপের নবনিযুক্ত প্রশাসন দেশের রাজধানী মালে শহরে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত চুক্তি ভারতীয় কোম্পানীর সঙ্গে বাতিল করে দিয়েছিল. তার পরে যখন নাশিদ আবার ক্ষমতায় ফেরার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল অবশ্যম্ভাবী, তখন প্রশাসন নির্বাচনের প্রথম পর্বের ফলাফল বাতিল করে দিয়ে নতুন করে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছিল. তারপরে ব্যবহার করেছিল প্রশাসনিক চাপের কৌশল ও সব রকম ভাবে নাশিদ যাতে ক্ষমতায় ফিরতে না পারে, তারই ব্যবস্থা করেছিল. ফলে দেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন আবদুল্লা ইয়ামিন আবদুল গাইয়ুম – যিনি এই দ্বীপের প্রাক্তন স্বৈরাচারী শাসক মামুন আবদুল গাইয়ুমের সত্ভাই, যার শাসনের সময়ে এই দ্বীপপূঞ্জ এলাকায় চিনের প্রভাব বেশী করেই বেড়ে গিয়েছিল.

কিন্তু ২০১৩ সালের শেষদিকে ভারত খুবই শক্তি প্রয়োগ করে চেষ্টা করেছে মালদ্বীপকে নিজেদের প্রভাবের কক্ষপথে ফিরিয়ে আনার. ডিসেম্বর মাসে দিল্লীতে মালদ্বীপের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মোহামেদ নাজিম গিয়েছিলেন. ভারতের পক্ষ থেকে তাঁর সঙ্গে যাঁরা আলোচনা করেছেন, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এ. কে. অ্যান্টনি তাঁকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, ভারত আগের মতই মালদ্বীপের প্রতিরক্ষা বিষয়ে প্রধান সহকর্মী দেশ হিসাবে রয়েছে. দুই প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর আলোচনার ফলাফল চুক্তি হিসাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রপতি আবদুল্লা ইয়ামিনের সফরের সময়ে. প্রাথমিক ভাবে এই সফরের পরিকল্পনা করা হয়েছিল ডিসেম্বর মাসের শেষে, কিন্তু তারপরে তা জানুয়ারী মাসে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“মালদ্বীপ – এটা বিশ্ব মানচিত্রে একমাত্র বিন্দু নয়, যেখানে চিন ও ভারতের স্বার্থ একে অপরের উপরে চড়েছে ও তার ফলে সংঘাত লেগেছে. বিগত বছরগুলোতে ভারত মহাসাগরের বাইরের দিকে থাকা দেশগুলোতে চিন খুব বেশী করেই নিজেদের প্রভাব খাটিয়েছে. এই প্রসঙ্গে প্রভাব শুধু সেই সমস্ত দেশের ক্ষেত্রেই খাটানো হয় নি, যা অনেকদিন ধরেই চিনের জোটসঙ্গী হিসাবে ছিল, যেমন, পাকিস্তান ও মায়ানমার, বরং সেই সমস্ত দেশের সঙ্গেও করা হয়েছে, যারা ভারতের সঙ্গে বহুদিনের সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক আর প্রসারিত ভারতীয় বংশোদ্ভূত লোকদের বাসভূমি হিসাবে স্রেফ আত্মীয় পরিচয়ে সংযুক্ত, যেমন সিসিলি, পূর্ব আফ্রিকা ও আবারও সেই মালদ্বীপের সঙ্গেই”.

খুবই স্বাভাবিক যে, ভারত বাধ্য হয়েছে প্রত্যুত্তরে কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার. দেখার মতো প্রমাণ, যা ভারত চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বৃদ্ধি, যা ভারতেরই সামুদ্রিক সীমার খুবই কাছে শুরু হয়েছে, তার বিরুদ্ধে করেছে এই ২৩শে ডিসেম্বর “অগ্নি-৩” ব্যালিস্টিক রকেট পরীক্ষা দিয়ে, যা পারমাণবিক বোমা নিয়ে উড়ে যেতে পারে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দূরত্ব অবধি. এই প্রসঙ্গে তাই বরিস ভলখোনস্কি আবারও বলেছেন:

“কিন্তু এখানে হিসাবের মধ্যে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে যে, আধুনিক ও খুবই দ্রুত সঙ্কুচিত হয়ে আসা বিশ্বে ভারত মহাসাগর সংজ্ঞাবহ হয়ে দাঁড়াচ্ছে শুধু নিজের কারণেই নয়, বরং একটা আরও প্রসারিত এলাকার অংশ হিসাবেই, যেখানে সমগ্র বিশ্ব রাজনীতির কেন্দ্রই এবারে সরিয়ে আনা হচ্ছে, যাকে বহুল প্রচারিত স্ট্র্যাটেজিক দিক-পরিবর্তন বলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বলা হয়েছে, আর যা এবারে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাতে সরে যাচ্ছে. এর ফলে এই এলাকায় আমেরিকা ও চিনের পরস্পর বিরোধ বেড়ে চলেছে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করছে নিজেদের কাজ অন্যের হাত দিয়ে করিয়ে নেওয়ার, চিনকে এই এলাকার অন্যান্য দেশের উপরে লেলিয়ে দিয়ে. তার মানে দাঁড়াচ্ছে যে, এই এলাকা এবারে এক বিপজ্জনক রক্ত রেখার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, যার পরে শুরু হচ্ছে শান্তি ও বৃহত্ আকারের যুদ্ধের সীমানায় ভর সামলানোর খেলা”.

ভারত মহাসাগর এই বিশাল খেলাতে নিজের বিশেষ ভূমিকাই পালন করছে. এই খান দিয়েই বিশ্বের সামুদ্রিক পরিবহণের বেশীর ভাগ করা হচ্ছে, আর অংশতঃ, তার মধ্যে দিয়েই চিনকে জ্বালানী ও অন্যান্য কাঁচামাল দিয়ে সরবরাহ করার কাজ হয়ে থাকে, তাই রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ আবারও বলেছেন:

“এই খেলাতে যে একসাথে অনেক বহু অংশগ্রহণকারীর স্বার্থ একজোট হয়েছে, তার প্রমাণ ইতিহাসে প্রথমবার হওয়া ভারত-জাপান সম্মিলিত সামুদ্রিক মহড়া. এই মহড়া হয়েছে ডিসেম্বরের শেষে. জাপান – চিনের প্রধান স্ট্র্যাটেজিক বিরোধী, যারা চিনের একেবারেই কাছের প্রতিবেশী দেশ, তাদের মধ্যে, - খুবই স্বাভাবিক যে, ভারতের মতো এত সংজ্ঞাবহ ও চিনের সঙ্গে একই ভাবে বহু সমস্যা সঙ্কুল এক দেশের সমর্থন পেয়ে তারা সন্তুষ্ট হয়েছে. আর ভারতের জন্যও জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা, ঠিক একই ভাবে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার অন্যান্য দেশের সঙ্গে হওয়ার মতো বিষয়, এটা আসলে বিশ্বমানের এক রাষ্ট্র হিসাবে নিজেদের প্রমাণ করার এক সুবর্ণ সুযোগ”.

একমাত্র প্রশ্ন, যা এই সমস্ত কাজ দেখে উদয় হয়েছে – তা হল যে, এই পদ্ধতি কি সঠিক বাছা হয়েছে. নিজেদের বিশ্বমানের মর্যাদা কি সামরিক শক্তি দিয়েই প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে, অথবা অন্য রকমের সম্পর্ক তৈরীর রাস্তাও রয়েছে? আর ভাল হয় না কি একটা সবার জন্যই লাভজনক “উইন-উইন” পরিস্থিতি তৈরী করতে পারলে, এই রকমের যোগফল শূণ্যের মতো খেলায় না নেমে, যা আবার শেষে এমন এক পরিস্থিতিতেই পরিণত হতে পারে, যখন সকলেই হারতে বসবে?