এই দিক পরিবর্তনই কি শেষ? এই উত্তপ্ত অঞ্চলে আর কি ঘটনার অপেক্ষা করা যেতে পারে, যেখানে অর্থনীতি ও রাজনীতি একে অপরকে ল্যাং মারতে কোন রকমের কসুর করছে না?

সমীক্ষক ইভগেনি এরমোলায়েভের মতে এই সব প্রশ্নের উত্তরের জন্য দুটি প্রায় একই সময়ে ঘটে যাওয়া অথচ প্রক্রিয়ার দিক থেকে একেবারেই উল্টো ঘটনাকে দেখা দরকার. এর একটা হয়েছে টিউনিশিয়াতে ও ইজিপ্টে. দ্বিতীয়টি – লিবিয়া ও সিরিয়াতে. প্রথমটি শুরু হয়েছে সত্যই আচমকা, আর দ্বিতীয়কে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, আর তা খুবই সক্রিয়ভাবে, তাই ইভগেনি এরমোলায়েভ বলেছেন:

“টিউনিশিয়া ও ইজিপ্টে মুখ্য অসন্তোষের কারণ ছিল অর্থনৈতিক ও সামাজিক রাজনীতি, যা বেন আলি ও হোসনি মুবারক করেছেন. দুই দেশেই প্রশাসন অর্থনীতিকে পশ্চিমের দেওয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ছাঁট কাট করেছিল. আর এই প্রসঙ্গে উদ্ভূত সামাজিক সমস্যা থেকে নিজেদের অবশ্যম্ভাবী ভাবেই হঠিয়ে নিয়েছিলেন. জনগনের অসন্তোষ এই ধরনের বিশেষ করে যুব সমাজের বেকারত্বের স্তরে একেবারেই নিশ্চিত হতে চলেছিল”.

প্রসঙ্গতঃ, লিবিয়ার জামাহিরির ও সিরিয়ার ব্যাপারে “আরব সামাজিক পুনরুজ্জীবনের” এই সমস্ত সমস্যার তীক্ষ্ণতা অনেক নীচু স্তরেই ছিল. লিবিয়া ও সিরিয়াতে অসমাধিত সমস্যা যথেষ্টই ছিল, কিন্তু তা সমাধানের জন্য আরও বহুদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা যেতে পারত. তবুও দুটি ক্ষেত্রেই – তা যেমন লিবিয়ার প্রসঙ্গে, তেমনই সিরিয়ার ক্ষেত্রেও ঘুমিয়ে থাকা সমস্যাকে তীক্ষ্ণ করে তোলা সম্ভব হয়েছিল বাইরের থেকেই হস্তক্ষেপ করে. এর জন্য ঢালা হয়েছে পর্যাপ্ত অর্থ ও গুপ্তচর বাহিনীর শক্তি, আর লিবিয়ার ক্ষেত্রে তো একেবারেই সামরিক শক্তি পর্যন্ত.

কিন্তু তা সত্ত্বেও সব কিছুই তত মসৃণ হয় নি. টিউনিশিয়া ও ইজিপ্টে প্রশাসন বাইরের হস্তক্ষেপ ছাড়া কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ধ্বসে পড়েছিল. লিবিয়াতে ন্যাটো জোটের রকেট আক্রমণের মধ্যেও তা মাস ছয়েক প্রতিরোধ করতে পেরেছিল. সিরিয়াতে এখনও টিকে রয়েছে. আর তাও লিবিয়া ও সিরিয়াকে আঘাতের মধ্যে রেখে, পশ্চিমের পক্ষে সম্ভব হয়েছে সেই প্রশ্নের থেকে কিছু সময়ের জন্য মুক্ত হতে: টিউনিশিয়া ও ইজিপ্টে তথাকথিত “আরব বসন্তের” শুরু হওয়ার প্রাথমিক কারণ কি?

আর কারণ হল যে, উন্নতিশীল দেশগুলিকে নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কক্ষপথে জোর করে সঙ্গে নিয়ে, পশ্চিম সেই একশ বছর আগের মতই সবচেয়ে কম উন্নয়নের প্রশ্ন নিয়ে চিন্তিত. তারা স্রেফ এই সব দেশকে বাধ্য করেছে পশ্চিমের হয়ে “বিল পে” করতে. বিশ্ব জোড়া সঙ্কটের সময়ে - যা এখন চলছে – যখন এই সব “বিল” এমনিতেই খুব বেশী, তখন এটা সামাজিক বিস্ফোরণের জন্য অবশ্যম্ভাবী হয়ে দাঁড়িয়েছে.

সিরিয়া ও লিবিয়ার উপরে সমাজের মনোযোগকে ঘুরিয়ে দিয়ে পশ্চিম ও তাদের জোট সঙ্গীরা একটা কৌশলগত লাভ করতে পেরেছে. তার মধ্যে এই সমস্ত দেশে সামাজিক ভাবে জুড়ে উঠতে না পারা যুব সমাজকে পাঠিয়ে দিয়েও. কিন্তু দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনাতে তা শুধু সমস্যাকেই আরও ঘনীভূত করবে, যখন কয়েক লক্ষ সিরিয়া থেকে ফেরা জঙ্গী নিজেদের স্বদেশে ফিরে যাবে তখন, এটা একেবারেই দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট হয়ে দাঁড়াবে.

লিবিয়া ও সিরিয়া নিয়ে পশ্চিমের পরিকল্পনার সঙ্গে একমত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই এলাকার জোটসঙ্গী দেশরা নিজেদেরই এবারে আঘাত পাওয়ার জন্য সম্ভাব্য করে ফেলেছে, এই বিষয়ে একমত হয়ে বিশেষজ্ঞ ভিক্টর নাদেইন রায়েভস্কি বলেছেন:

“পশ্চিমের দিক নির্দেশ মেনে চলা দেশের মধ্যে – তুরস্ক থেকে সৌদী আরব পর্যন্ত সব দেশই রয়েছে, যাদের নিজেদেরও যথেষ্ট সমস্যা রয়েছে. তার ওপরে আবার তাদের ব্যাথার জায়গা পশ্চিমের, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের কাছে খুবই জানা. আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ ও তাদের আঞ্চলিক জোটসঙ্গীদের স্বার্থ মোটেও সব সময়ে এক হয় না”.

তাই লিবিয়া ও সিরিয়াতে ঘটনা আয়োজনের জন্য একমত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জোট সঙ্গীরা একটা নিজেদের জন্যই বিপজ্জনক খেলা শুরু করেছে. তা দিয়েই তারা পশ্চিমের হাতে তুলে দিয়েছে নিজেদের ওপরেই চাপ সৃষ্টি করার মতো বাড়তি লিভার. এবারে তাদেরকে খুবই মনোযোগ দিয়ে লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে ওয়াশিংটনের অসন্তোষ কোন ভাবেই আহ্বান না করা হয়. কিন্তু এটাতো মনে হয় না যে, সম্ভব.

একটা সময় আসবে, যখন কিছুই বাদ দেওয়া যেতে পারবে না – এই অঞ্চলে পশ্চিমের তরফ থেকে মানব অধিকার ও গণতন্ত্রের বিষয়ে আচমকা সম্পর্কের বদল নিয়ে কোন রকমের পদক্ষেপকেই. অথবা যেমন আচমকাই প্রেসে “ফাঁস” হয়ে যাওয়া যে, কি করে লিবিয়া ও সিরিয়াতে ঘটনা শুরু হয়েছিল আর কে সঠিক ভাবে তাতে নিজেদের হাতে রক্ত মেখেছে.

টিউনিশিয়া ও ইজিপ্টে ঘটনা এই কারণেও আরও মূল্যবান যে, তা আরও একবার দেখিয়ে দিয়েছে: এই ঘটনা গুলোকে তাদের নীতিগত ভাবে এক থাকাই যোগ করে নি, কারণ আরব দেশগুলোর কিছু চরম স্বৈরতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কি রকমের সামগ্রিক নীতিই বা থাকতে পারে? বরং যোগ হয়েছে শুধু বস্তুবাদী নিজস্ব স্বার্থই. কিন্তু এই সমস্ত স্বার্থ এক সময়ে হঠাত্ করেই নানা দিকে চলে যেতে পারে.