দেবযানী খোবরাগাদে যে ইতিহাসের কুশীলব হয়েছেন – সেটা মনে করিয়ে দিয়েছে যে, এই দলিল গ্রহণের অর্ধশতাব্দী পরে ভিয়েনা কনভেনশন, যা ভিত্তিমূলক ভাবেই সকলের জন্য সমান ভাবে প্রযোজ্য, তাকে নিজেদের প্রয়োজনের উপযুক্ত অস্ত্র হিসাবেই ব্যবহার করা হচ্ছে. এটা প্রথম উদাহরণ নয়, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন স্পষ্ট করেই দেখিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক আইনকে তারা নিজেদের ইচ্ছামতো ব্যবহার করতে পারে, তাতে নিজেদের রাজনৈতিক লাভকেই মুখ্য হিসাবে লক্ষ্য রেখে. অন্ততপক্ষে গত বছরের পাকিস্তানের লাহোরে স্ক্যান্ডাল হওয়া ঘটনাকে মনে করলেই যথেষ্ট হতে পারে, যখন আমেরিকার কনস্যুলেটের কর্মী রেমন্ড ডেভিস, তাক দূতাবাসের নম্বর প্লেট লাগানো গাড়ী করে যাওয়ার সময়ে দু’জন পাকিস্তানী মোটর সাইকেল আরোহীকে পিস্তল দিয়ে গুলি করেছিল. আমেরিকার লোকটির বক্তব্য অনুযায়ী সে নিজেকে বাঁচানোর জন্য এই কাজ করেছিল. কিন্তু এটা আসলে তাই ছিল কি না – তা সত্য করে এখনও জানা নেই, এই প্রসঙ্গে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“পাকিস্তানের আইন আদালতের পক্ষে সবচেয়ে বেশী যা করা সম্ভব হয়েছিল- তা হল পাকিস্তানী নাগরিকদের উপরে আক্রমণ করা অথবা তাদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করা এই আমেরিকার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করার. তারপরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে ইসলামাবাদের উপরে বিপুল পরিমাণে রাজনৈতিক চাপ দেওয়া হয়েছিল. নিজের দেশের নাগরিককে বাঁচানোর জন্য ব্যক্তিগত ভাবে পাকিস্তানে তত্কালীন মার্কিন সেনেটের পররাষ্ট্র পরিষদের প্রধান ও বর্তমানে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব জন কেরি উড়ে এসেছিলেন. আর তার পরিণামে পাকিস্তানের প্রশাসন বাধ্য হয়েছিল পিছু হঠতে – বিচার শেষ অবধি আর হয় নি. রেমন্ড ডেভিস ভালভাবেই দেশে উড়ে যেতে পেরেছিল, বলা যেতে পারে যে, জল থেকে একেবারে শুকনো ভাবেই বের হতে পেরে”.

আর দেবযানী খোবরাগাদের সঙ্গে তুলনায় এই ডেভিস এমনকি কূটনীতিবিদও ছিল না, বা তার সেই রকমের মর্যাদাও ছিল না. সে ছিল দূতাবাসের এক সাধারণ কর্মী, যে নিরাপত্তা সংক্রান্ত প্রশ্ন নিয়ে কাজকর্ম করত. তাছাড়া, জোড়া খুন- এটা এমন এক অপরাধ, যার জন্য শাস্তি হয়ে থাকে খুবই কঠোর ধরনের. কিন্তু আমেরিকার পক্ষ থেকে তখন ঘোষণা করা হয়েছিল যে, রেমন্ড ডেভিসের উপরেও কূটনীতিবিদদের উপযুক্ত অনাক্রম্যতা বিস্তার করা যেতে পারে আর আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী তাকে মুক্তি দেওয়া দরকার. সব মিলিয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তখন সেই ১৯৬৩ সালের ভিয়েনা কনভেনশনই কাজে লেগেছিল, যা এবারে ভারতীয় কূটনীতিবিদের ক্ষেত্রে তারাই উপেক্ষা করেছে.

যে কোন মূল্যে বিদেশে নিজেদের নাগরিকদের বিচার এড়ানোর জন্য চেষ্টা করে যাওয়ার সঙ্গে – আর তা শুধু কূটনীতিবিদদের জন্যই নয়, আমেরিকার প্রশাসন আরও বেশী করেই কোন রকমের সভ্যতার বালাই না করে অন্যান্য দেশের কূটনীতিবিদেরা, যারা তাদের দেশে কাজ করছেন, তাদের বিরুদ্ধে নোংরা ব্যবহার করে চলেছে. দেবযানী খোবরাগাদের স্ক্যান্ডাল ঠিক তার পরেই হয়েছে, যখন রাশিয়া ও আমেরিকার সম্পর্ককে মলিন করেছে রাশিয়ার কূটনীতিবিদদের তরফ থেকে সেখানের চিকিত্সা বীমা সংক্রান্ত বিষয়ে স্ক্যান্ডাল তৈরী করার পরে. মস্কো এই সমস্ত অভিযোগকে বলেছে একেবারেই ভিত্তিহীণ বলেছে ও আরও যোগ করেছে যে, যারা এই স্ক্যান্ডাল করেছে, তারা রাজনৈতিক বরাত অনুযায়ী কাজ করেছে.

সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে যে, কয়েক দশক ধরে মেনে আসা কূটনৈতিক অনাক্রম্যতার নীতিতে এবারে ক্ষয় ধরেছে. ভিয়েনা কনভেনশন না মানার বিষয়ে সবচেয়ে বেশী করে দেখা গেল যে, এগিয়ে রয়েছে আবারও সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র.