এই ধরনের প্রবণতা সত্যই রয়েছে কিন্তু তার প্রসারের অতি মূল্যায়ণ করার প্রয়োজন নেই, এই রকম মনে করে সমীক্ষক ইভগেনি এরমোলায়েভ বলেছেন:

“সেই সমস্ত কথাবার্তা যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্য ও নিকটপ্রাচ্য থেকে চলে নাও যায়, তবুও তারা এই এলাকা থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে, তার কারণও রয়েছে. আর এটা শুধু ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সেনাবাহিনী সরিয়ে নেওয়াই নয়. এটা আবার সিরিয়াতে বিরোধ বাড়ানোর বিষয়ে আপত্তিও, আর ইরানের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে বেশী করেই শান্তিপ্রিয় স্বর প্রয়োগ. ওয়াশিংটন স্পষ্টই খুশী নয়, যা কায়রোতে হয়েছে, তা নিয়ে – কিন্তু এই ক্ষেত্রেও ইজিপ্টের নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি তীক্ষ্ণ রাজনৈতিক ভঙ্গী ত্যাগ করা হয়েছে. বলা যেতে পারে যে, বিশ্ব নতুন করে আমেরিকাকে আবিষ্কার করছে – একেবারেই স্বল্প কিছুদিন আগের চেয়ে অনেক বেশী শান্তিপ্রিয় ও অনুত্তেজিত. বারাক ওবামা যেন কয়েক বছর দেরী করেই নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কারকে যথাযোগ্য প্রমাণ করতে চাইছেন. তা এর কারণ কি”?

কয়েকটা কারণ রয়েছে. প্রথমতঃ, আমেরিকার আর্থ-বিনিয়োগ সমস্যা কোথাও চলে যায় নি. আর খুবই দামী এই সমস্ত সামরিক অপারেশন এখন আমেরিকার বাজেটের জন্যই কোন কাজের কথা নয়. তার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল: রাষ্ট্রপতি ওবামা কিছুদিন আগেই মন্তব্য করেছেন যে, নিকটপ্রাচ্যের খনিজ তেল থেকে দেশের নির্ভরতা কমতে চলেছে. আন্তর্জাতিক জ্বালানী সংস্থার তথ্য অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে খনিজ তেলের আমদানী কম করা হয়েছে শতকরা তিরিশ ভাগ, আর গ্যাস শতকরা পনেরো ভাগ. অর্থাত্ পারস্য উপসাগরীয় এলাকা আমেরিকার জন্য এখন আর ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যতটা আগে ছিল.

আর তারই মধ্যে, সেই সব বছরগুলোতে, যতদিন আমেরিকা এই এলাকাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিপুল পরিমাণে শক্তি ও অর্থ ব্যয় করছিল, তখন অন্য এক ফ্রন্টে, পূর্বে – এশিয়ার এক কোণায় ধীরে হলেও শক্তির পুনর্বিন্যাস করা চলছিল. আর হঠাত্ করেই গত বছরে ঘোষণা করা হয় নি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনার মনোযোগ এবারে এশিয়া – প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকাতে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে. ২০২০ সালের মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখানে নিজেদের শতকরা ষাট ভাগ যুদ্ধ জাহাজ এনে ফেলবে বলে ঠিক করেছে, যাদের সঙ্গে থাকবে আঘাত হানার উপযুক্ত বিমানবাহী জাহাজের দল.

এখানে মনে করার দরকার নেই যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পূর্ণ ভাবেই নিকট ও মধ্য প্রাচ্য থেকে চলে যাচ্ছে. তারা শুধু থেকেই যাচ্ছে না, বরং একটা “শেরিফের” ভূমিকাও নিজেদের কাছে রেখে দিচ্ছে. কিন্তু এবারে মনে করা দরকার যে, তারা সেই রকমের শেরিফের মতই হবে, যে মনে করে যে, “রেড ইন্ডিয়ান দের সমস্যা শুধু তাদেরই সমস্যা “শেরিফের” সমস্যা নয়”.

অন্য রকমের একটা দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষজ্ঞ ভিক্টর নাদেইন রায়েভস্কি এই বিষয়কে দেখেছেন, তিনি বলেছেন:

“অন্য দেশের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য – খুবই স্বাভাবিক ও নিয়মিত করা ব্যাপার. বিগত কয়েক দশক ধরেই তাদের হস্তক্ষেপ করার সবচেয়ে বড় জায়গা ছিল তথাকথিত “বৃহত্ নিকট প্রাচ্য”. এখন এই রকমের একটা ধারণা তৈরী হচ্ছে যে, পরিস্থিতির বুঝি পরিবর্তন হচ্ছে – কিন্তু এটা স্রেফ প্রথম দৃষ্টিতে তাই মনে হচ্ছে”.

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী চাক হেগেলকে বাহরিনে কিছুদিনের আগের আঞ্চলিক সম্মেলনে ইরানের উপরে ওয়াশিংটনের তরফ থেকে চাপ কমানোর জন্য কিছু কড়া সমালোচনা শুনতে হয়েছে. স্থানীয় জোটসঙ্গীদের শান্ত করার জন্য হেগেল মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সব কিছুই নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে, কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই এলাকায় খুবই শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে. তার উত্তরে তাঁকে বলা হয়েছে: “আপনি আমাদের শান্ত করার চেষ্টা করবেন না, তার বদলে শুনুন আমরা কি বলছি”. এখানে মনে করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে বহু বছর ধরে ইরানকে কড়া ভাবে আটকে রেখে – তারপরে এক মুহূর্তে এই চাপ কমিয়ে দিতে পারে না. মার্কিন জোট সঙ্গীদের এই এলাকায় এবারে নিজেদের সমস্যা নিজেদের সমাধান করতে হবে, এই অবস্থায় ছেড়ে যেতে পারে না.

সুতরাং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আসলে কি অপেক্ষা করার দরকার? অবশ্যই, এই এলাকা তারা হারাতে চাইবে না. আমেরিকার কোম্পানীরা সেখানে প্রচুর বিনিয়োগ করে রেখেছে. আর নিজেদের জায়গা কাউকেই ছেড়ে দিতে তৈরী নয়. সুতরাং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই এলাকায় হস্তক্ষেপ চলতেই থাকবে. কিন্তু বোধহয় তা আগের মত এতটা খোলাখুলি ভাবে করা হবে না, বোধহয়, আমেরিকা কি রকম ভাবে একটা ইউরোপের মতই হয়ে দাঁড়াচ্ছে. তারা আগে সবসময়েই কথা, আশ্বাস ও ষড়যন্ত্র প্রয়োগ করে নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে নিতে চায়, তা না হলে, তবেই বোমা মারতে থাকে, অথবা একেবারেই চরম প্রয়োজন পড়লে অর্থ দেয়.

এখানে আগ্রহের হল যে, এই এলাকার দেশগুলোর জন্য আমরা যে রকমেরই কাজের ধারা ব্যবহার করি না কেন, তাদের সমস্ত পদ্ধতিই শেষমেষ একটা ব্যাপারেই নির্ভর করে রয়েছে: আভ্যন্তরীণ বিরোধ বাড়িয়ে দেওয়া. যত বেশী খারাপ ভাবে এই এলাকার লোকরা একে অপরের উপরে সম্পর্ক রাখবে, বাইরের শক্তিদের তত বেশী করেই নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হবে. তাই এই এলাকার লোকদের শান্তিপূর্ণ জীবনের অপেক্ষা করার কোন প্রয়োজন নেই.