এই দিনের প্রাক্কালে দিল্লী শহরের পুলিশ বিভাগ ধর্ষণ নিয়ে এক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে, যা দিল্লীতে গত বছরে হয়েছে. তার সংখ্যা এবারে দ্বিগুণের বেশী বেড়ে গিয়েছে – ২০১২ সালে ৭০৬টি থেকে, ২০১৩ সালে ১৪৯৩টি অবধি – প্রত্যেক বছরের ৩০শে নভেম্বর অবধি নেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী. দিল্লীর পুলিশ চেষ্টা করেছে এই ভাবে ব্যাপারকে উপস্থাপনা করতে যে, এই সংখ্যা আসলে অপরাধের মূল সংখ্যা বৃদ্ধির কথা বলছে না, যত না বলছে কতগুলো এই ধরনের কেস ফাইল করা হয়েছে: কারণ, আগে মহিলারা এই ধরনের ঘটনা লুকিয়ে রাখতেন, ভয় পেতেন লোক জানাজানি হওয়ার ও লজ্জার, আর এখন তাঁরা অনেক সাহসী হয়েছেন ও নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষীদের কাছে জানাচ্ছেন ঘটে যাওয়ার ঘটনার কথা, এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই ব্যাপারে একটা নির্দিষ্ট সত্যতা থাকতে পারে, কিন্তু এমনকি যদি তাও হয়, তবে দেখা যাবে যে, শুধু ভারতের রাজধানীতেই দিনে চারজন করে মহিলা হিংসার শিকার হচ্ছেন. আর সারা ভারতে কয়েকদিন আগে করা গবেষণা দেখিয়েছে যে, গড়ে প্রতি ২২মিনিটে একজন করে মহিলা ধর্ষিতা হচ্ছেন. এই প্রসঙ্গে পারিবারিক অত্যাচারের বিষয় একেবারেই হিসাবের মধ্যে নেওয়া হয় নি. সুতরাং পরিসংখ্যান, যা দিল্লীর পুলিশ জানিয়েছে, তা দুটি সিদ্ধান্তের ভিত্তি দিয়েছে. এক দিকে এই ধরনের অপরাধের প্রতি সামাজিক অসন্তোষ বৃদ্ধি পেয়েছে. আর অন্যদিকে – অপরাধের সংখ্যা কিন্তু কমে নি”.

আর যদি প্রথম ধারণাকে মনে করা হয় মহিলাদের সুরক্ষার জন্য গণ প্রচারের পরিণাম, তবে দ্বিতীয়টি ভাবতে বাধ্য করে: এই প্রচার আন্দোলন কি সত্যই উপযুক্ত রকমের ফল দিতে পেরেছে?

২০১৩ সালে দিল্লী শহরে দ্বিগুণ বেড়ে যাওয়া ধর্ষণের সঙ্গে এই একই পরিসংখ্যান দেখিয়ে দিয়েছে যে, একই সময়ে মহিলাদের উপরে কটুক্তি ও তির্যক ইঙ্গিতের পরিমান বেড়ে গিয়েছে পাঁচ গুণ – ৬২৫ থেকে ৩২৩৭টি. আর এটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে অপরাধের শিকারদের তরফ থেকে সচেতনতা বৃদ্ধির পরিণাম বলে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে. তাই আবার করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই নতুন পরিসংখ্যান প্রসঙ্গে যে প্রশ্নের উদয় হয়, তাকে এই ভাবে পেশ করা যেতে পারে: ভারতের মত বিপুল জনসংখ্যা ও নানা রকমের লোকের বাসভূমি হওয়া দেশে সবচেয়ে বেশী রকমের সামাজিক প্রতিবাদের ফলপ্রসূতা কতটুকু?

দিল্লীর রাস্তায় ধর্ষণের পরে ও সেই ছাত্রীর মৃত্যুর পরে বহু সহস্র বিক্ষুব্ধ মানুষ বের হয়েছিলেন. এই ধরনের প্রতিবাদকে সক্রিয়ভাবে দেশের সমস্ত সংবাদ মাধ্যম ও টিভিতে দেখানো হয়েছিল. কিন্তু সেই দেশে, যেখানে জনসংখ্যার একের চতুর্থাংশ নিরক্ষর ও প্রায় অর্ধেক পরিমাণ পরিবারের বাড়ীতে টিভি কিনে দেখার সাধ্যই নেই (অন্ততপক্ষে ২০১০ সালের তথ্য অনুযায়ী – ২২৩ টি পরিবারের ৯০টির অবস্থা অনুযায়ী, তাই), সেখানে এই ধরনের প্রচারের ফলপ্রসূতা নিয়ে কথা বলা আগে থেকেই অর্থহীণ. তাই দেখা যাচ্ছে যে, ভারত রয়েছে যেন একই সঙ্গে দুটো স্তরে: এই দেশ থেকে মঙ্গল গ্রহে উপগ্রহ পাঠানো হচ্ছে অভিযানে যাওয়ার জন্য, আর দেশের অর্ধেক সংখ্যক লোক বাড়ীতে একেবারেই সাধারণ সুখ সুবিধার ব্যবস্থা রাখতে পারেন না; দেশে খুবই ভাল রকমের ইঞ্জিনিয়ার ও তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক পেশাদার প্রশিক্ষণ রয়েছে অথচ বহু শত লক্ষ মানুষ রয়েছেন নিরক্ষর; বিশ্বে গড় বার্ষিক উত্পাদনের তুলনায় ভারত রয়েছে বিশ্বে দশম স্থানে আর ক্রয় ক্ষমতার পরিপ্রেক্ষিতে একেবারে তৃতীয় স্থানে, অথচ বহু কোটি মানুষের দিন গুজরান করতে হয় এক ডলারেরও কম খরচে”!

এই রকমের পরিস্থিতিতে অবাক হওয়া কি যেতে পারে যে, বহু শত সহস্র এমনকি লক্ষ লোকের বিক্ষোভেও এক ১২০ কোটি মানুষের দেশের সামাজিক মানসে কোন রকমের মূলগত পার্থক্য লক্ষ্যণীয় হয় নি? এই প্রসঙ্গে সেই ভলখোনস্কি আবারও বলেছেন:

“আর এটাই যে কোন ধরনের ক্ষণিকের গণ আন্দোলনে সফলতা নিয়ে প্রশ্নের উদ্ভব করে. এমনকি যদি বছর দুয়েক আগে হওয়া সারা ভারত জুড়ে শোরগোল তোলা দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের কথাই ধরা হয়, যা প্রবীণ গান্ধী বাদী নেতা আন্না হাজারে শুরু করেছিলেন ও যার সঙ্গে পরে আরও সহস্র লোক যোগ দিয়েছিল, তাতেও দেখতে পাওয়া যাবে যে, দিল্লী শহরে আন্না হাজারের প্রাক্তন সহকর্মীদের নির্বাচনে জয় হলেও সারা দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এই জয় দেখা যাবে না. আর দুর্নীতির স্তর, সারা দেশের সামাজিক মতামত অনুযায়ী বিগত বছরগুলোতে শুধু বেড়েই গিয়েছে”.

এটা অবশ্যই মোটেও প্রমাণ করে না যে, সামাজিক কর্মীদের এবারে হাল ছেড়ে দেওয়া দরকার ও তীক্ষ্ণ সমস্যাগুলোকে সামনে আনা বন্ধ করা দরকার. স্রেফ কথা হচ্ছে বিপুল প্রচার করা নিয়ে, যার থেকে পরিণামে খুবই কম কিছু পাওয়া যাচ্ছে, বরং সবচেয়ে নীচের তলায় দীর্ঘ সময় নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করারই দরকার রয়েছে. এই ধরনের কাজ ছাড়া আসন্ন ভবিষ্যতে সামাজিক মানসে পরিবর্তন করার কথা তোলাই যেতে পারে না বলেই মনে করেছেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ.