“রেডিও রাশিয়াকে” দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর সুদূর প্রাচ্য ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ কনস্তানতিন আসমোলভ বলেছেন যে, এই রাষ্ট্র হয় চিন অথবা রাশিয়া. এই এলাকা উত্তর কোরিয়ার উত্তর পশ্চিমে রয়েছে, তা চীনের স্জিলিন প্রদেশ ও রাশিয়ার প্রিমোরস্ক অঞ্চলের সীমান্তের কাছেই. বিশেষ করে এই এলাকায় সক্রিয় রয়েছে চিন – উত্তর কোরিয়ার প্রধান জোট সঙ্গী ও তাদের প্রধান আর্থ-বাণিজ্য সহকর্মী দেশ.

গত বছরের গরমকালে চান সন থেককে চিনের সঙ্গে একসাথে এই এলাকার উন্নয়নের জন্য আলোচনা করতে দেখা গিয়েছিল. অংশতঃ, রাজিন সনবন এলাকা ও চিনের সঙ্গে সীমান্ত এলাকায় আম্নোক্কান (ইয়ালুত্সজিয়ান)নদীর মধ্যে থাকা কিছু দ্বীপের এলাকা নিয়ে কথা হয়েছিল. তারই মধ্যে এই সপ্তাহের শুরুতে যখনই কিম চেন ঈনের চাচাকে সমস্ত রাষ্ট্রীয় পদ থেকে অপসারিত করা হয়েছিল, তখনই একটা ধারণার উদয় হয়েছিল যে, তিনিই এই সমস্ত এলাকার উন্নয়নে সবচেয়ে বেশী করে বাদ সেধেছিলেন.

বিশেষজ্ঞ কনস্তানতিন আসমোলভ উত্তর কোরিয়ার এই রাজনীতিবিদের করুণ পরিণতি নিয়ে চিনের প্রভাবের ভূমিকা সম্বন্ধে মন্তব্য করে বলেছেন:

“বোঝা যাচ্ছে না, কারণ একই সঙ্গে অনেক রকমের পরস্পর বিরোধী ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছি. আমি দেখেছি একেবারেই নানা রকমের প্রতিক্রিয়া দেওয়া হয়েছে চিনের উত্স থেকে চান সন থেককে সরিয়ে দেওয়া নিয়ে. একদল জোর দিয়ে বলেছে যে, চান খুবই বেশী রকমের চিন পন্থী রাজনীতি করছিলেন. অন্যরা বলেছে যে, চান নিজের মধ্যেই চিনের সঙ্গে বাণিজ্যের সমস্ত বিষয় আবদ্ধ করে রেখেছিলেন ও নিজেই এতে খুব বেশী করে লাভবান হয়েছিলেন. তাই চিনই নাকি চানকে সরানোর কথা বলেছে. কারণ চান এই দুই দেশের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতেন, তাই এবারে দেখতে হবে আসন্ন ভবিষ্যতে চিন কি ধরনের পদক্ষেপ নেয়. চিনের কাজ থেকেই স্পষ্ট হয়ে যাবে, তারা রাগ করেছে, নাকি উল্টো”.

তারই মধ্যে প্রাচ্য বিশারদ, সিওলের কুনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর আন্দ্রেই লানকভ সন্দেহ করছেন যে, চিন কিম চেন ঈনকে প্ররোচনা দিয়েছে চান সন থেককে সরানোর জন্য, তাই তিনি বলেছেন:

“এটা একেবারেই সত্যি নয়. চান সন থেককে যে সব অভিযোগ করা হয়েছে, তা স্পষ্টতঃই চিনের বিরুদ্ধে. অপরাধমূলক কাজকর্ম সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, তিনি দামী জাতীয় সম্পদ বিদেশী রাষ্ট্রকে বেচে দিয়েছেন. আর এই সব তিনি একমাত্র চিনকেই বেচতে পারতেন, কারণ তিনিই দেশের বহির্বাণিজ্য ক্ষেত্রে চিনের দিক দেখতেন. আর তার ওপরে চিন বাস্তবে একমাত্র ক্রেতা, যারা উত্তর কোরিয়া থেকে কাঁচামাল কিনে থাকে. যদি আমরা শুক্রবার সকালে প্রকাশিত দলিল দেখি, তবে সেখানে রয়েছে আরও বেশী করেই চিন বিরোধী আক্রমণ – চানের সিদ্ধান্ত বিদেশী রাষ্ট্রকে বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকায় জমি ভাড়া নিতে দেওয়া – এই ব্যাপারটাকে নিয়েই. এখানে কথা হয়েছে চিনকে দ্বিতীয় জাহাজঘাটা ভাড়ায় দেওয়া নিয়েও. চান সন থেককে সেই কারণেই পদচ্যুত করা হয়েছে, যে তিনি বেশী সক্রিয়ভাবেই চিনের সঙ্গে কাজ করছিলেন. তাই খুবই অবাক হতে হত যদি চিন চান সন থেককে সরানো নিয়ে লবি করত. এখন, খুব সম্ভবতঃ চিনের সঙ্গে করা এই সমস্ত চুক্তিকে আবার করে বিচার করা হবে যাতে তা উত্তর কোরিয়ার জন্য বেশী করে লাভজনক হয়”.

আর যদি পরিস্থিতি এই ভাবেই পাল্টাতে থাকে, তবে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে যে, আরও বেশী করেই কুয়াশাচ্ছন্ন হবে কিম চেন ঈনের চিন সফর, তিনি নিজেই কি সেখানে যেতে চান? এই বিষয়ে কনস্তানতিন আসমোলভ মন্তব্য করে বলেছেন:

“বোঝা যাচ্ছে না, তিনি যেতে চান কি না? কারণ অল্প কিছুদিন আগেই চিনে গিয়েছিলেন উত্তর কোরিয়ার সামরিক সদর দপ্তরের প্রধান, আর জানা নেই যে, তার ফল কি শেষ অবধি হয়েছে. নীতিগত ভাবে চিনের কিম চেন ঈনের সঙ্গে বলার মত কথা অনেক আছে, কিন্তু আপাততঃ কিম চেন ঈন চিনে যান নি. দু’বছর পার হয়ে গেছে নেতা হিসাবে অভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে, কিন্তু তিনি এখনও কোথাও যান নি. এটাকে নানা ভাবেই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে. সেটা দিয়েও যে, নিজের দাম বাড়াচ্ছেন ও তাই যেতে চান না, তেমনই বলা যায় যে, দেশ বের হওয়ার ঝুঁকিও কোন ভাবেই নিতে চান না”.

নিজের আপন চাচাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া নিয়ে একটা ধারণা এই রকম যে, কিম চেন ঈন – এবারে “পুরনো মূল নেতাদের” উপরে গুলিবর্ষণ শুরু করেছেন. তিনি প্রাক্তন প্রজন্মের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের হাত থেকে ছাড়া পেতে চাইছেন যাতে নিজের ক্ষমতাকে জোরালো করা যায়. এখান থেকেই বলা যেতে পারে যে, উত্তর কোরিয়াতে এবারে সাফাই করা হবেই. কনস্তানতিন আসমোলভ এর সঙ্গে একমত কিন্তু মনে করেন যে, তা আদর্শের কারণে ততটা হবে না, তাই বলেছেন:

“এখানে ব্যাপারটা ততটা দল বিরোধী গোষ্ঠী সংক্রান্ত নয়. কিম চেন ঈনের নীতি হল যে, নানা কাজের মধ্যে দেশের কালাবাজারকেও স্বীকৃতী দেওয়ার. তা সেই দেশে যথেষ্ট বেশী করেই বেড়ে গিয়েছে, আর দুর্নীতি হচ্ছে প্রচুর. আর যদি এই ধরনের সমান্তরাল অর্থনীতিকে আইনসিদ্ধ করতে হয় ও তার থেকে দুর্নীতির অংশকে বাদ না দেওয়া সিদ্ধান্ত হয়, তবে তা খুব সহজেই রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে নিজেদের হাতে তুলে নেবে. যদি মনে করা যায় যে, অল্প বয়সী নেতার তরফ থেকে নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট রকমের কম, কারণ তাঁর বয়স কম ও প্রশাসনের অভিজ্ঞতা তাঁর বিশেষ নেই, তবে খুবই সম্ভব যে, কিম চেন ঈন একজন মানুষ হিসাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, তাঁর দেশকে রক্ষা করবে, গণহারে গুলি করে হত্যা করলে তবেই, তাই আপাততঃ একটা ধারণা তৈরী হচ্ছে যে, চানকে আঘাত করা – এটা নিজের গোষ্ঠী তৈরীর জন্য করা আঘাত, এমনকি যত না আদর্শের কারণে, তার চেয়েও বেশী দুর্নীতির উপরে আঘাতের জন্যই. এবারে এটাকে মনে করা হবে দলের ঐক্যের উপরে আঘাতের প্রচেষ্টা বলে, একেবারে দেশপালকে রাগিয়ে দেওয়ার জন্য করার চেষ্টা বলে. আর তাই গুলি করেই হত্যা করা দরকার ছিল”.

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়াতে দেশের “দ্বিতীয় প্রধান ব্যক্তিকে” মৃত্যুদণ্ড দেওয়াতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের পক্ষ থেকে জোটসঙ্গীদের নিয়ে আলোচনা করেছে. তারা পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে, তা খেয়াল করেছে, অংশতঃ সম্ভাব্য প্ররোচনার কথা মাথায় রেখেই, আর তারই সঙ্গে দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয়ে ঘটা ঘটনার প্রভাব উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র নীতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে সেটা দেখার জন্য তাকিয়ে রয়েছে.