১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে করা অপরাধের অভিযোগে আবদুল কাদের মোল্লাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে. শুধুমাত্র আইনের দিক থেকে দেখলে এই ধরনের গুরুতর অপরাধের জন্য এমনকি ৪২ বছর পরে করা বিচারও সঙ্গত মনে হয় – কারণ মানব সমাজের বিরুদ্ধে করা অপরাধের কোন তামাদি হওয়া বিষয় নেই.

প্রসঙ্গতঃ, এমনকি এই প্রশ্নের আইনের দিকও মোটেও সম্পূর্ণ রকমের বিতর্ক মুক্ত নয়. আবদুল কাদের মোল্লাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয়েছে এক পরিবারকে খুনের অপরাধে, যাদের সদস্য সংখ্যা ছিল ছয় অথবা এগারো, তাও করা হয়েছে একমাত্র সাক্ষীর কাছ থেকে পাওয়া জবানবন্দি থেকে, যার সেই অপরাধ সংঘটনের সময়ে বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর, যে মহিলা তার দেওয়া জবানবন্দি বলতে গিয়েই বহুবার গুলিয়ে ফেলেছে আর এমনকি একদিন বলেছিল যে, সে সেই অপরাধ সংঘটনের সময়ে জায়গায় ছিল না, এই প্রসঙ্গে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“তার ওপরে একেবারে তথাকথিত আন্তর্জাতিক ফৌজদারী ট্রাইব্যুনাল (যা আসলে স্পষ্টই স্রেফ বাংলাদেশের) ২০১০ সালে তৈরী হওয়ার সময় থেকেই বহু পর্যবেক্ষক সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন যে, এই ট্রাইব্যুনাল আইনের কাঠামোর মধ্যেই আটকে থাকবে কি না. আর ট্রাইব্যুনালের কাজ কারবারে শুধু এই সন্দেহই দৃঢ় হয়েছিল: বিচারের সময়ে শুধু বিরোধী দলের প্রতিনিধিদেরই কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিল – প্রধানতঃ জামাত-এ-ইসলামি দলের লোকদের, কিন্তু তাদের সঙ্গে দেশের প্রধান বিরোধী দলের লোকদেরও. বর্তমানে ১০ জনের শাস্তি ঘোষণা হয়েছে, তাদের মধ্যে আবদুল কাদের মোল্লা ছাড়া চার জনের জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে”.

বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ – ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান চালিকা শক্তি ও তারা জোর দিয়ে বলেছে যে, দেশে যুদ্ধের সময়ে তিরিশ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছেন, দু লক্ষ মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল. নিরপেক্ষ গবেষকরা নিহতদের সংখ্যা কম করে বলে থাকেন – তিন থেকে পাঁচ লক্ষ, কিন্তু এই ধরনের সংখ্যাও ভয়ঙ্কর. তার ওপরে বেশীর ভাগ খবরেই ক্ষতিগ্রস্তদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেই সমস্ত অপরাধের পরিপ্রেক্ষিতে, যা পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও স্থানীয় ঐস্লামিক ও পাকিস্তানের থেকে আলাদা হতে না চাওয়া রাজাকার লোকরা করেছিল, অথচ এই সব খবরে কখনও বলা হয় নি যে, গৃহযুদ্ধের সময়ে অনিবার্য ভাবেই দুই পক্ষের তরফ থেকেই হিংসার কথা ওঠে, আর সেই ক্ষেত্রে বাইরের শক্তির হস্তক্ষেপ (এই ক্ষেত্রে ভারতীয় সেনাবাহিনীর যোগদানের ফলে)শুধু হিংসারই বৃদ্ধি হয়ে থাকে, তাই বরিস ভলখোনস্কি আবারও বলেছেন:

“প্রসঙ্গতঃ, যদি একপাশে আইনের বিষয়কে সরিয়ে রাখা হয়, তবে একটা কথা বলতেই হবে যে, ফাঁসী দেওয়ার সময়ে আবদুল কাদের মোল্লাকে হঠাত্ করেই বেছে নেওয়া হয় নি. ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ পালন করতে চলেছে দেশের উত্সব- বিজয় দিবস. ৪২ বছর আগে এই দিনেই দেশ পাকিস্তানের থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল. আর, বোঝাই যাচ্ছে যে, দেশের ক্ষমতাসীন দল তৈরী হয়েছে এই ফাঁসীকে তাদের পক্ষের লোকদের আগ্রহ বৃদ্ধি করার জন্যই – আর সেই ধরনের লোকের সংখ্যাও কম নয়, ঢাকায় গতকাল সন্ধ্যায় বহু শত লোকই ঐস্লামিক নেতার মৃত্যুদণ্ড নিয়ে হর্ষ প্রকাশ করতে বের হয়েছিলেন”.

ঐস্লামিকেরা নিজেরা এবারে ভয় দেখিয়েছে যে, আবদুল কাদের মোল্লার প্রত্যেক ফোঁটা রক্তের জন্য সরকার জবাব দেবে, আর ১৫ই ডিসেম্বরে দেশজোড়া হরতাল ডেকেছে – বিজয় দিবসের প্রাক্কালে. ঐস্লামিকদের পক্ষের লোকরাও রাস্তায় বের হয়েছিল, আর পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গত রাতে কম করে হলেও তিনজন নিহত হয়েছে. এই প্রতিবাদ যতদিন ধরে চলছে, সেই সময়ের মধ্যে সারা দেশে, ইতিমধ্যেই একশ জনেরও বেশী মানুষ নিহত হয়েছে, তাই আবার করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই সব কিছুই হচ্ছে দেশে সর্বজনীন নির্বাচনের প্রস্তুতির সময়ে. জামাত-এ-ইসলামি দল সেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না, আর তাদের জোটসঙ্গী ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ঘোষণা করেছে ভোট বয়কট করার. যদি এই প্রক্রিয়া কড়া গণতান্ত্রিক নিয়মে হত, তবে সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, সামাজিক মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলের জয়ের সম্ভাবনা খুবই কম. এই ক্ষেত্রে দেশে উত্তেজনা বৃদ্ধিতে লাভ হতে পারে শুধু ক্ষমতাসীন দলেরই”.

ঐস্লামিকদের নেতার মৃত্যুদণ্ড এবারে প্রতিবাদের আগুনে আরও বেশী করেই ঘি ঢালবে. তারা মোটেও শান্তিপ্রিয় হবে না ও আরও বেশী করেই মানুষ হতাহত হওয়ার কারণ হবে. আর এটাই একটা কারণ জুটিয়ে দেবে সরকারের পক্ষ থেকে দেশে জরুরী অবস্থা ঘোষণা করার, নির্বাচন বাতিল করার, সমস্ত বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার আর নিজেদের ক্ষমতায় অনির্দিষ্ট কালের জন্যই বহাল রাখার.