এটা সত্যি যে, রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রীর ইরান সফর অনেকদিন আগে থেকেই পরিকল্পিত ছিল ও তা সরকারি ভাবে নভেম্বরে স্বাক্ষরিত ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক পরিকল্পনা সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে সমঝোতার সঙ্গে অথবা আসন্ন জানুয়ারী মাসে সিরিয়ার সঙ্কট নিয়ে জেনেভাতে হতে যাওয়া সম্মেলনের সঙ্গে কোন সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াই তৈরী হয়েছিল. কিন্তু বাস্তবে এই সফরকে মনে করা যেতে পারে রাষ্ট্রপতি রোহানির পররাষ্ট্র নীতির জন্য এক জোরালো সমর্থন বলেই, যা বিশ্বের বাকী দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধের পথ পরিহার করার জন্য নেওয়া হয়েছে. এই সফর আরও একবার দেখিয়ে দিয়েছে যে, রাশিয়ার কূটনীতি সমস্ত কিছুই করবে, যাতে এত কষ্ট করে পাওয়া প্রাথমিক ফলাফল, যা ইরানের পারমাণবিক সমস্যাকে ও সিরিয়া সঙ্কটকে নিয়ে রয়েছে, তা রক্ষা করা সম্ভব হয়.

সিরিয়ার সমস্যা নিয়ে রাশিয়া খুবই জোর দিয়ে বলছে যে, “জেনেভা -২” আলোচনায় ইরানের থাকা দরকার. সিরিয়ার পরিস্থিতির উপরে ইরানের প্রভাব খুবই বেশী রকমের. “আমরা রক্তপাত বন্ধ করার পক্ষে কথা বলছি, যাতে সিরিয়ার লোকরা বাইরের থেকে কোন রকমের প্রভাবে না পড়ে নিজেরাই নিজেদের দেশের ভবিষ্যত নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হন”, বলেছেন রুশ মন্ত্রী. একই সময়ে সের্গেই লাভরভের কথামতো, “বিদেশের ক্রীড়নকরা পারে ও তাদের পক্ষ থেকে শান্তি প্রক্রিয়াতে সহায়তা করাও উচিত্. এই বৃত্তে ইরানের ও যোগ দেওয়া দরকার আর আমি মনে করি যে, নীতিগত ভাবেই গুরুত্বপূর্ণ হল “জেনেভা- ২” সম্মেলনে ইরানকে আমন্ত্রণ জানানো”, লাভরভ এই রকমই বিশ্বাস করেন.

তেহরানে আলাদা করে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়েছে ইরানের পারমাণবিক সমস্যা. রাশিয়ার পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান সের্গেই লাভরভের ইরানের সহকর্মী জাভাদ জারিফের সঙ্গে আলোচনায় আরও এবার দেখানো হয়েছে যে, রাশিয়া যেমন ইরানের পক্ষ থেকে তেমনই “ছয় মধ্যস্থতাকারী” পক্ষের তরফ থেকেও জেনেভা সমঝোতার খুঁটিয়ে পালন করার স্বপক্ষে. আলোচনার পরে সের্গেই লাভরভ বলেছেন: “মুখ্য হল সব কিছুই করা দরকার, যা নিয়ে আমরা আগেই সমঝোতা করেছি, এই দলিলে যা লেখা হয়েছে তাকে প্রসারিত ভাবে বা কম করে দেখানোর চেষ্টা করার দরকার নেই”.

এই প্রসঙ্গে রাজনীতিবিদ ও ইরানের পররাষ্ট্র নীতি সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ ইরিনা ফিওদরভা বলেছেন:

“কোন সন্দেহই নেই যে জেনেভা সমঝোতা পালন করা মধ্যে সম্ভাবনা তৈরী হতে পারে ইরানের পারমাণবিক পরিকল্পনা নিয়ে এক চূড়ান্ত চুক্তি করার. এটা ইরানের বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে ফিরে আসার শুরু করতে পারে ইরাকে, সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যে ও সিরিয়ার পরিস্থিতিকে এক স্থিতিশীল করার কারণ হিসাবে. আর মস্কো ঠিক করেছে এটার জন্য সমস্ত শক্তি দিয়ে সহায়তা করার জন্য. এই ধরনের প্রত্যাবর্তন নিজের দিক থেকেই খুবই ভাল পরিস্থিতি তৈরী করবে রাশিয়া ও ইরানের যোগাযোগের ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার সমস্ত দিকেই সক্রিয়তা বৃদ্ধি হওয়ার জন্যেও”.

রাশিয়া- ইরানের সম্পর্ক ও তার ভবিষ্যত সম্ভাবনা তেহরানে এই সফরের আলোচনার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়েছে. দুই পক্ষই সমঝোতায় পৌঁছেছে যে, নিয়মিত ভাবে রাজনৈতিক পরামর্শ ও আন্তর্প্রশাসনিক আর্থ-বাণিজ্য ও বৈজ্ঞানিক- প্রযুক্তি পরিষদের কাজ দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার জন্য চালিয়ে যাওয়ার. প্রসঙ্গতঃ এই পরিষদ চলে যাওয়া বছরে এক বহু সম্ভাবনাময় দলিল গ্রহণ করেছে, এটা এক প্রোটোকল, যা ঠিক করে দিয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার দিক গুলোকে, তাতে পারমাণবিক শক্তি থেকে মহাকাশ সমেত স্বাস্থ্য সংরক্ষণ ও পর্যটনের বিষয়ে সহযোগিতাও রয়েছে.

আলোচনার সময়ে ইরানের পক্ষ থেকে তোলা হয়েছিল সেই দেশে জেনিথ-রকেট ব্যবস্থা এস-৩০০ সরবরাহের কথাও, জোর দেওয়া হয়েছিল রাশিয়া থেকে ইরানে এই ব্যবস্থা সরবরাহ করার জন্য. জানাই রয়েছে যে, মস্কোর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই ধরনের অস্ত্র ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরানে সরবরাহ করার উপযুক্ত অস্ত্র সামগ্রীর তালিকায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে. কিন্তু বর্তমানে তেহরানের পারমাণবিক নীতি একটা আশার সঞ্চার করেছে যে, রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে – আর একই সঙ্গে তা বহু প্রশ্নের সমাধান করবে. উল্লেখ যোগ্য যে, সফরের সময়ে সের্গেই লাভরভ বিশেষ করে উল্লেখ করেছেন কিছুদিন আগে রাশিয়ার পক্ষ থেকে যিনি সামরিক-শিল্প ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করছেন, সেই উপপ্রধান মন্ত্রী দিমিত্রি রগোজিনের সঙ্গে ইরানের লোকদের আলোচনার ভাল ফলাফলের কথা.

এখানে মনে করা যেতে পারে যে, ইরান বিরোধী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হলে, মস্কো ও তেহরানের সহযোগিতা নতুন করে সম্পূর্ণ ভাবেই শুরু হবে. আর এটা শুধু সামরিক-প্রযুক্তি ক্ষেত্রকেই স্পর্শ করে না, বরং সমস্ত আর্থ-বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বলা চলে. অর্থাত্ রাশিয়া-ইরানের ভবিষ্যত সম্পর্ক এই ক্ষেত্রে তেহরানেরই হাতে.