জানা গিয়েছে যে, রাষ্ট্রসঙ্ঘ এবারে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার কাজ কারবার নিয়ে নিজেদের তদন্ত শুরু করছে. আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “দ্য গার্ডিয়ান” পত্রিকার সাংবাদিকদের সমর্থনে, যাদের আক্ষরিক অর্থে যেমন লন্ডনে, তেমনই ওয়াশিংটনে জীবন নষ্ট করে দেওয়া চেষ্টা হচ্ছে, “ওয়াশিংটন পোস্ট” পত্রিকার সমীক্ষক ও তদন্ত নির্ভর সাংবাদিকতার প্রাণপুরুষ কার্ল ব্রেনশ্টাইন মন্তব্য করেছেন. ইনি সেই ব্যক্তি, যিনি বব উড-ওয়ার্ডকে সঙ্গে নিয়ে গত শতকের সত্তরের দশকে নিক্সনের সময়ে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির খবর জনসমক্ষে তুলে ধরেছিলেন. বারাক ওবামার জন্য এই ধরনের মন্তব্যের সংজ্ঞা এতটাই খারাপ যে, এর চেয়ে খারাপ কিছু ভেবে বার করাও কঠিন. তখন রিচার্ড নিক্সনকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল, কারণ তা না হলে, তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল অনাস্থা প্রস্তাবের চরম লজ্জা.

জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার ঢাকার নীচে পাঁচশো কোটি মানুষ – এটা অভূতপূর্ব এক তথ্য উদঘাটন. এই ধরনের পরিমাণ মনে হয় এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত ইউটোপিয়া বিরোধী উপন্যাস “১৯৮৪”র লেখক ব্রিটেনের জর্জ অরওয়েলের জন্যও, যদি আজ তিনি বেঁচে থাকতেন, তবে খুব সম্ভবতঃ এমন একটা ঘটনা হত যে, তিনি হয়ত নতুন ইউটোপিয়া বিরোধী উপন্যাস “২০১৪” লিখে ফেলতেন. অন্ততপক্ষে এই ধরনের গ্রহ পর্যায়ে গুপ্তচর বৃত্তি আগে এমনকি থার্ড রেইখ, শ্তাজি অথবা কেজিবির পক্ষে স্বপ্নেও কল্পনা করা সম্ভব হত না.

আমেরিকা বিভাগের “অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল” নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষা প্রকল্পের ডিরেক্টর জেকে জনসন ঘোষণা করেছেন যে, “এর পরে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস তাদের ছুটি থেকে ফিরবে ও উত্সবের বিপুল খাওয়াদাওয়ার পরে কোমায় থাকা অবস্থা থেকে সজ্ঞানে ফিরবে, তখন তাদের পক্ষে মন্দ হবে না, সঙ্গে সঙ্গেই নজরদারি করা নিয়ে সমস্ত রকমের রাষ্ট্রীয় গুপ্তচর বৃত্তির পরিকল্পনার জন্য নিষেধাজ্ঞা মূলক আইন ও সংশোধন করার ব্যবস্থা করা”.

লন্ডনে এই সপ্তাহেই সেই ধরনের একটা ঘটনা ঘটেছে, যা সেই অরওয়েলের “১৯৮৪” উপন্যাস থেকেই নেওয়া বলে মনে হয়েছিল. “দ্য গার্ডিয়ান” কাগজের প্রধান সম্পাদক অ্যালান রাসব্রিজারকে ডেকে আনা হয়েছিল হাউস অফ কমন্সের বিশেষ পরিষদে জিজ্ঞাসাবাদ ও আক্ষরিক অর্থে তাঁর পক্ষ থেকে সংযুক্ত রাজতন্ত্রের প্রতি আনুগত্য কতটা তা জানার জন্য. পরিষদের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দেওয়া যে, “গার্ডিয়ান” কাগজের প্রকাশিত খবরে গ্রেট ব্রিটেনের নিরাপত্তার কোনও ক্ষতি হয়েছে কিনা.

রাসব্রিজারকে “জিজ্ঞাসাবাদ” করার ভিডিও সঙ্গে সঙ্গেই “ইউ টিউবে” হিট হয়ে গেছে. এটা অরওয়েলের হাতে পড়লে, তিনি ঠিকই জানতে পারতেন সেই “বড় ভাইয়ের (Big Brother)” চরিত্র কাকে দেখে লিখতে হবে. এমনকি ব্যাপারটা এতদূর অবধি গড়িয়েছে যে, একজন কনজারভেটিভ পার্টির সদস্য রাসব্রিজারকে অভিযোগ করেছেন যে, তিনি নিজের দেশকে ভালবাসেন না. যার উত্তরে গার্ডিয়ান কাগজের সম্পাদক ঠিক এই কথাই বলেছেন:

“আমরা গণতান্ত্রিক সমাজে বাস করি. বেশীর ভাগ মানুষ, যারা এই বিষয়ের উপরে কাজ করেছেন (স্নোডেনের দেওয়া তথ্য প্রকাশ) – তারা ব্রিটেনের লোক, যারা এই দেশে থাকেন ও তাদের পরিবার সমেত এই দেশকে খুবই ভালবাসেন. আমার জন্য আপনাদের এই প্রশ্ন নিয়ে অবস্থানই খুব আশ্চর্যজনক. হ্যাঁ, আমরা দেশপ্রেমী. অন্য অনেক কিছুর সঙ্গে, আমরা আমাদের দেশের গণতন্ত্রের, স্বাধীন সংবাদ মাধ্যমের ও সেই রকমের বাস্তব পরিস্থিতির প্রকৃতির সম্পর্কেও দেশ প্রেমিকদের মতই মনোভাব প্রকাশ করে থাকি, যেখানে এই দেশের প্রত্যেকেই এই ধরনের বিষয় নিয়ে আলোচনা ও খবর প্রকাশ করার সম্ভাবনা রাখে (দেশের নাগরিকদের উপরে গণহারে নজরদারি করা নিয়ে)”.

রাসব্রিজার যোগ করেছেন যে, গুপ্তচরদের কাজ অবশ্যই নজরদারি করা. কিন্তু তাদের কোন ভাবেই নিজেদের থেকে গুপ্তচর বৃত্তি করার আইন আর নিয়ম তৈরী করতে দেওয়া যেতে পারে না. আর সেই সবের ভিত্তিতে বহু কোটি মানুষের উপরে নজরদারি করতে দেওয়া.

রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার ও সন্ত্রাস বিষয়ে প্রবন্ধকার বেন এম্মেরসন নিজের বিশেষ তদন্ত শুরু করেছেন. এই বিখ্যাত ব্রিটেনের আইনজীবি বলেছেন যে, তিনি “জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার ব্যাপারকে” এক্স-রে করে দেখবেন ও তাদের ব্রিটেনের সমান স্তরের সংস্থা প্রশাসনিক যোগাযোগের কেন্দ্র “জিসিএইচকিউ” এই তদন্তের থেকে রেহাই পাবে না. এম্মেরসন ঠিক করেছেন যে, তিনি বার করবেন আমেরিকা ও গ্রেট ব্রিটেন কি রকম পরিমাণে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিয়ম কানুন ভেঙে সারা বিশ্ব জুড়ে, ৩৫টি দেশের মানুষ ও দেশ নেতাদের উপরে নজরদারি করেছে. ২০১৪ সালের হেমন্তে এই নিয়ে রিপোর্ট ও পরামর্শ তৈরী হয়ে যাবে.

এম্মেরসন আবার তাঁর আগে করা নানা রকমের প্রবন্ধ, যা তিনি সিআইএ সংস্থার ইউরোপের গোপন জেল নিয়ে, পেন্টাগনের গুয়ান্তানামো বন্দী শিবির নিয়ে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে বেআইনি ভাবে ড্রোন বিমান ব্যবহার নিয়ে ও তা দিয়ে নিরীহ জনগনকে তথাকথিত “সন্ত্রাসবাদী” বলে হত্যা করা নিয়ে লিখেছেন, তার জন্যই বিখ্যাত. এই সমস্ত রিপোর্ট উপযুক্ত রকমের সাড়া ফেলে নি, শুধুমাত্র সেই কারণে যে, তা লেখা হয়েছে শুকনো আইনের ভাষাতে. যদি এম্মেরসন কিছুটা বেশী লেখক ও কম অংশে আইনজীবি হ’তেন, তবে তাঁর কাজকর্মের ফল হতে পারত বিস্ফোরিত বোমার মতই. হতে পারে যে, আগামী সময়ে প্রকাশিত হতে চলা রাষ্ট্রসঙ্ঘের জন্য তাঁর নতুন রিপোর্ট সেই রকমেরই কিছু একটা হতে চলেছে.