ম্যান্ডেলা শেষদিকে অনেকদিন ধরেই রোগে ভুগছিলেন, জুন মাসে তাঁকে হাসপাতালে রাখা হয়েছিল ফুসফুসের সংক্রমণে বাড়াবাড়ি হওয়ার জন্যেই. বলা হয়ে থাকে যে, তাঁর এই রোগ ছিল সরাসরি সেই যক্ষা রোগেরই ফল, যা দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে কেপ অফ গুড হোপের কাছে রব্বেন দ্বীপে জেলে থাকার সময়ে হয়েছিল. যদি তাঁর সমস্ত জেলবাসের যোগফল দেখা হয়, তবে পাওয়া যাবে মোট ৩১ বছর: আধুনিক কোন রাষ্ট্রপতির জীবনীতে এত দীর্ঘদিন ধরে “জেলের বিশ্ববিদ্যালয়ে” থাকার বিবরণ নেই.

তিনি আফ্রিকার জাতীয় কংগ্রেসের নেতা ছিলেন, তিনি এই দলের উমকোনটো না সিজভে (জাতির বর্শা) সামরিক গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন. ১৯৬৪ সাল থেকে তিনি রব্বেন দ্বীপে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে বন্দী ছিলেন, কারণ বর্ণবিদ্বেষী প্রশাসনের অবসানের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন বলেই. তাঁকে ১৯৯০ সালেই শুধু ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল. আদালতে ম্যান্ডেলা ঘোষণা করেছিলেন যে, তাঁকে বিচার করা হচ্ছে শুধু দক্ষিণ আফ্রিকাতে গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে অবিচল থাকার জন্য, যেখানে সমস্ত বর্ণের মানুষই শান্তি ও ঐক্যতানে থাকতে পারত. এই কথা বলা যায় না যে, দক্ষিণ আফ্রিকা এক এই ধরনের আদর্শ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে. কিন্তু অন্ততপক্ষে বর্ণবিদ্বেষী প্রশাসনের অবসান অবশ্যই হয়েছে.

আজকের আফ্রিকাতে নেলসন ম্যান্ডেলার সঙ্গে তুলনার যোগ্য কোন রাজনৈতিক নেতার নাম করা যায় না, এই রকম মনে করে আফ্রিকা বিশেষজ্ঞ আপোল্লন দাভিদসোন বলেছেন:

“নেলসন রোলিহলাহলা ম্যান্ডেলা, মহাত্মা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মতই যুদ্ধের বিরুদ্ধে মত দিয়েছেন, তিনি ছিলেন জাতীয় শান্তির পক্ষে. আশি ও নব্বইয়ের দশকে, আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে, দক্ষিণ আফ্রিকা, প্রায় সমস্ত রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের কাছেই মনে হয়েছিল যে এক ভয়ঙ্কর গৃহযুদ্ধের সামনে এসে পড়েছে, যা হতে যাচ্ছিল সাদা ও কালো মানুষদের মধ্যে. কিন্তু তা হয় নি. এমনকি কোন বড় রকমের ধ্বংসযজ্ঞও হয় নি. দক্ষিণ আফ্রিকাতে রক্তনদী বয়ে যায় নি”.

১৯৯৩ সালে ম্যান্ডেলা নোবেল শান্তি পুরষ্কার পেয়েছিলেন, আর ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার রাষ্ট্রপতি.

এক সময়ে ম্যান্ডেলা নির্জোট আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন. নিজের আইনের শিক্ষা তিনি বিভিন্ন জেলে বন্দী থাকা অবস্থাতেই পেয়েছিলেন, একই সঙ্গে দূর থেকে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়াশোনা করে. তিনি একই সঙ্গে বিশ্বের পঞ্চাশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত সদস্যও ছিলেন. বিশ্বের বহু শহরেই তাঁর উদ্দেশ্যে স্মৃতিসৌধ রয়েছে, তাঁর নামে নামাঙ্কিত হয়েছে রাস্তা, চত্বর, ষ্টেডিয়াম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান. তিনি মোটেও কোন সাধারণ পরিবারের সন্তান ছিলেন না: ম্যান্ডেলা ছিলেন তেম্পু প্রজাতির নেতার জ্যেষ্ঠ পুত্র. প্রসঙ্গতঃ, এটা তাঁকে কোন রকমের বিশেষ সুবিধা দেয় নি, যা সেই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকাতে ছিল শুধু সংখ্যালঘু শ্বেত গাত্রবর্ণের মানুষদেরই.

নেলসন ম্যান্ডেলা শুধু আফ্রিকার জীবনে প্রভাব ফেলেন নি, বরং সারা বিশ্বের জীবনেই ফেলেছেন. এই রকম মনে করে রুশ বিজ্ঞান একাডেমীর আফ্রিকার দেশগুলোর ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক আনাতোলি সাভাতেয়েভ বলেছেন:

“বর্তমানের বিশ্বে নেলসন ম্যান্ডেলা একজন সবচেয়ে স্বনামধন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব. তাঁর সংজ্ঞা শুধু সেই রাজনৈতিক ভূমিকাকে দিয়েই নির্ণয় করা যায়না, যা তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের জীবনে পালন করেছেন. তাঁর বিশেষত্ব ছিল নিজস্ব নীতিগত প্রশ্নের ক্ষেত্রে. তিনি নানা বর্ণের ও সামাজিক গোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যে নীতির প্রসঙ্গকেই ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন”.

এই কথা বলা যাতে পারে না যে, সমগ্র দক্ষিণ আফ্রিকার প্রত্যেক ব্যক্তিই ম্যান্ডেলার প্রয়াণে শোক করবে. সেখানের অনেক সাদা চামড়ার মানুষই তাঁকে ও সমস্ত আফ্রিকা জাতীয় কংগ্রেসকে মনে করেছিল সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী বলেই. কিন্তু কালো চামড়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষদের জন্য ম্যান্ডেলা প্রায় ঈশ্বরের মতই ছিলেন, একজন বিবেকের পথ নির্দেশক ও দাসত্ব থেকে মুক্তির প্রাণপুরুষ.

ম্যান্ডেলার ব্যক্তিগত জীবন মোটেও মেঘমুক্ত ছিল না. তাঁর প্রথম স্ত্রী এভেলিনা প্রয়াত হয়েছেন ২০০৪ সালে. দ্বিতীয় স্ত্রী উইনিকে ১৯৯১ সালে হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করার জন্য ছ’বছরের জন্য কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল. তাঁর বড় ছেলে মাকগাহো ২০০৫ সালে এইডস রোগে মারা গিয়েছেন. ছোট তেম্বেকিলে গাড়ী দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন. একই ভাবে তাঁর প্রপৌত্রী ২০১০ সালে মারা যান. ম্যান্ডেলার তিন কণ্যা রয়ে গিয়েছেন. তৃতীয় ও শেষবার তিনি বিবাহ করেছিলেন মোজাম্বিকের নেতা সামোরা মাশেলের বিধবা স্ত্রী গ্রেস মাশেলকে.