সব শুরু হয়েছিল তার থেকে, যখন এই গত সপ্তাহের শেষে ভারতে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী ও বিরোধী বিজেপি গোষ্ঠীর নেতা নরেন্দ্রে মোদী ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারাকে আবার করে বিবেচনার কথা বলেছেন, যা জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে একটা বিশেষ রাজ্যের মর্যাদা দিয়ে রেখেছে. সেই ১৯৪৭ সালেই তখন কার কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী শেখ মহম্মদ আবদুল্লা ও ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু চুক্তি করেছিলেন যে, এই ধারাকে সংবিধানের অংশ করার জন্য, তখন মনে করা হয়েছিল যে, এটা সাময়িক ধারা, যা এই রাজ্যকে সমস্ত রকমের ক্ষেত্রে শুধু প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র নীতি, আর্থিক ও যোগাযোগ ক্ষেত্র ছাড়া স্বয়ং শাসনের সুবিধা দেবে. বিজেপি অনেকদিন আগে থেকেই কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার বিরুদ্ধে বক্তব্য বলেছে, তারা মনে করে যে, এই মর্যাদাই প্রজাতন্ত্রের অখণ্ডতার ভিত্তির বিরুদ্ধে. কাশ্মীরকে একটি আলাদা রাজ্যের থেকে “সুপার রাজ্যে” পরিণত করা নিয়ে মোদীর ঘোষণা স্পষ্ট করেই দেখিয়ে দিয়েছে যে, তিনি কোন পথ অনুসরণ করবেন, যদি তাঁর দল সর্বজনীন লোকসভা নির্বাচনে ২০১৪ সালের বসন্তে বিজয়ী হয়. এই কথা মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“নরেন্দ্র মোদীর আহ্বান ভারতের একমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের বর্তমানের মুখ্যমন্ত্রী ও শেখ মহম্মদ আবদুল্লার পৌত্র ওমর আবদুল্লার খুবই তীক্ষ্ণ প্রতিক্রিয়ার কারণ হয়েছে. আর তার দিন দুয়েক পরে এই একই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ – আর এটাকে মোটেও স্রেফ একই সময়ে ঘটা ঘটনা বলে মনে করা যেতে পারে না. তিনি ঘোষণা করেছেন যে, “কাশ্মীর সেই রকমের একটা স্ফুলিঙ্গে পরিণত হতে পারে, যা থেকে চতুর্থবার দুই পারমাণবিক শক্তিধর দেশ ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ লেগে যেতে পারে””.

এই ঘোষণাও ভারতে লক্ষ্য না করে ছেড়ে দেওয়া হয় নি. এরই উত্তরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ ঘোষণা উল্লেখ করেছেন যে, “পাকিস্তান কোন সময়েই ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারবে না – অন্ততপক্ষে তাঁর জীবদ্দশায় তো নয়ই”.

এই অগ্নিতে ঘৃতাহুতি করেছে আবার “দ্য হিন্দু” সংবাদপত্র, তারা বৃহস্পতিবারে পাকিস্তানের সামরিক রণনীতি থেকে কিছুটা উদ্ধৃতি দিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, যুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অসমঞ্জস উত্তরই দেওয়া হতে পারে. তাই ভলখোনস্কি আবারও বলেছেন:

“বোধহয়, এই ধরনের যুযুধান হুঙ্কারের, অন্ততপক্ষে সেই অংশ, যা ভারতের রাজনীতিবিদরা ব্যবহার করছেন, তা প্রাক্ নির্বাচনী পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে. নরেন্দ্র মোদী মনে হয় না যে, ভারতীয় মুসলিম সমাজের পক্ষ থেকে কোন রকমের উল্লেখযোগ্য অংশ ভোট হিসাবে পেতে চলেছেন, তাই চেষ্টা করছেন ভারতীয় ধর্মীয় অর্থে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশী ভোট পাওয়ার জন্য আহ্বান করতে”.

নওয়াজ শরীফের ঘোষণা নিয়ে যা বলা যেতে পারে আর ভারতে জানা হয়ে যাওয়া পাকিস্তানের সামরিক রণনীতি নিয়েও যা বলা যায়, তা হল যে গত ৬৬ বছর ধরেই ভারত ও পাকিস্তানের আলাদা রাষ্ট্র হিসাবে থাকার সময়ে এই দুই দেশ তিনবার সম্পূর্ণ রকমের যুদ্ধের পরিস্থিতির মধ্যে ছিল – তার ওপরে আবার দুই বার যুদ্ধ হয়েছে কাশ্মীরের জন্য. কিন্তু এখানে নীতিগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হল যে, এর আগের যুদ্ধ করা হয়েছে অন্য পরিস্থিতিতে, যখন কোন এক পক্ষের কাছেও পারমাণবিক অস্ত্র ছিল না. কিন্তু ১৯৮৮ সালের পর থেকে পরিস্থিতি একেবারেই অন্য রকমের হয়ে গিয়েছে, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“যদি মনে করা হয় যে, পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ দিকেই এগোবে, তবে একেবারেই বোঝা যাচ্ছে যে, সাধারণ অস্ত্র ব্যবহার করে যুদ্ধ হলে, পাকিস্তানের সামরিক ও অর্থনৈতিক ভাবে অনেক এগিয়ে থাকা ভারতের বিরুদ্ধে জেতার কোনও সুযোগ রয়েছে. সুতরাং পাকিস্তান সেই পারমাণবিক অস্ত্রের দিকেই হাত বাড়াবে, তারা সেটা লুকাচ্ছেনও না, বিশেষ করে যদি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বেঁচে থাকার বিষয়ে তাদের জন্য কোন রকমের বিপদের উত্পত্তি হয়. আর এটাই শুধু পাকিস্তানের নয়, বরং ভারতের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাকেও কমিয়ে দেয় – অন্ততপক্ষে তার জনসংখ্যার অনেকখানি অংশের জন্য ও তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতার জন্য”.

এই ধরনের চিত্রনাট্য বিশেষজ্ঞরা হিসাবের মধ্যে এনেছেন ১৯৮৮ সালে পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার অব্যবহিত পরেই আর তা কোন রকমেরই সন্তোষজনক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে দেয় নি. সবচেয়ে ভয়ানক হল যে, স্থানীয় একটা বিরোধের মধ্যে বিশ্বের বৃহত্ রাষ্ট্রদের জুটে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে: চিন আসবে পাকিস্তানকে সাহায্য করার জন্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও তখন অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকবে না, আর বিশ্ব সমাজ কোন রকমের শান্তির শর্ত ভেবে ওঠার আগেই এই যুদ্ধের আগুনে সারা বিশ্বই জ্বলবে, কারও পক্ষে সম্ভব হবে না এই প্রতিদ্বন্দ্বীদের থামানো বা নিজেদের শান্ত করার.

এই ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু একটা উপায় বাকী রয়েছে: তীক্ষ্ণ মন্তব্য করা বন্ধ করা, এই ব্যাপারেই বরিস ভলখোনস্কি এবারে অবশেষে বুঝতে পেরেছেন. কাশ্মীরের সমস্যা সমাধানের জন্য একমাত্র পথ আর তা প্যারাডক্স মনে হলেও ঠিক যে, কাশ্মীর সমস্যার কথাই কিছুদিনের জন্য ভুলে থাকা. শুধুমাত্র অর্থনীতিতে ও মানবিক ক্ষেত্রে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে সীমান্ত সমস্যার বিষয়ে কোন বিশেষ মনোযোগ না দিয়ে একটা পারস্পরিক ভরসার বাতাবরণ তৈরী করা, যা আশা করা যেতে পারে যে, কখনও সুদূর ভবিষ্যতে এই পুরনো হয়ে যাওয়া সমস্যার সমাধানের জন্য ফিরে আসার সুযোগ করে দেবে.