ভারতের টেলিভিশন যে জনমত সংগ্রহ করেছে, তার ভিত্তিতে জনসংখ্যার ভিত্তিতে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর দিল্লীর বিধানসভার মোট ৭০টি আসনে দেখা যাচ্ছে যে, আম আদমী পার্টি ১৮ থেকে ২৫টি আসন পেতে চলেছে. বাকী জায়গা আশা করা হচ্ছে যে, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা দল ভাগ করে নেবে.

অন্য একটি জনমত গ্রহণের ফল অনুযায়ী – যা আম আদমী দল নিজেরা বরাত দিয়েছিল, তাতে দেখা যাচ্ছে যে, তারা আগামী বিধানসভায় ৩৮টি থেকে ৫০টি আসন পেতে চলেছে.

যে কোন ক্ষেত্রেই এক বছর আগে তৈরী হওয়া দলের জন্য এই রকমের সংখ্যা খুবই মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো. কিন্তু এই দল কি সর্বজনীন লোকসভা নির্বাচনে এই ধরনের ফল দেখাতে পারবে, যা দিল্লীর ফলাফলের সঙ্গে কোন ভাবে তুলনা করা যেতে পারে? এখানে মনে রাখা দরকার কয়েকটা বাস্তব পরিস্থিতি, উল্লেখ করেছেন রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি, তিনি বলেছেন:

“প্রথম হল যে, ২০১২ সালের নভেম্বরে নথিভুক্ত হওয়া আম আদমী পার্টি সেই পরিস্থিতির ফলেই উদয় হয়েছে, যখন সমাজের একটা বড় অংশ (প্রথমতঃ বুদ্ধিজীবি, সংবাদ মাধ্যমের লোক ও ব্যবসায়ী মহলের মাথারা) দেশের দুর্নীতিগ্রস্ত পরিবেশকে আর মেনে নিতে চাইছেন না. কিন্তু এখানে মনে রাখতে হবে যে, এই ধনের মানসিকতা রয়েছে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই শহরের মধ্যবিত্ত শ্রেনীর, যাদের সংখ্যা সেই ধরনের বৃহত্ শহর, যেমন দিল্লীতে সারা দেশের তুলনায় বহুল পরিমাণে. কিন্তু গ্রামাঞ্চলে, যেখানে এখনও পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রভাব বেশী, সেখানে আগের মতই দুর্নীতির প্রকাশকে মেনে নেওয়া হচ্ছে সাধারণের জীবনের এক অঙ্গাঙ্গী অংশ বলেই”.

দ্বিতীয়তঃ এর আগেও বিশ্বের অনেক দেশের অভিজ্ঞতাই দেখিয়ে দিয়েছে যে, সই সমস্ত রাজনৈতিক নেতারা যারা ক্ষমতার শীর্ষে উঠতে চাইছেন সবচেয়ে ভাল সব স্লোগানের ভিত্তিতে, তারাই ক্ষমতায় পৌঁছে খুবই বেশী করে সেই সমস্ত আদর্শের কথা ভুলে যাচ্ছেন, যা এই কদিন আগেও নিজেরা তুলে ধরতে চেয়েছেন আর প্রায়ই একই ধরনের দুর্নীতিগ্রস্ত লোকে পরিণত হচ্ছেন, যাদের বিরুদ্ধে তারা নিজেরা লড়াই করেছেন. এখান থেকেই - বহু জনপ্রিয় রাজনৈতিক প্রবাহের ধারা শুকিয়ে যাওয়া ঘটেছে. তার ওপরে ভারতীয় সমাজের সমস্ত ক্ষেত্রেই দুর্নীতি এতই গভীরে শাখা ছড়িয়েছে যে, তা সবচেয়ে বেশী রকমের প্রচার করেও শেষ করা সম্ভব নয়. প্রাক্ নির্বাচনী সময়ে দুর্নীতি বিরোধী ভাল, কিন্তু তা মোটেও যথেষ্ট হবে না, যদি আম আদমী পার্টি নির্বাচনে জয় লাভ করে.

তৃতীয়তঃ, “পুরনো” দলগুলোর বিরুদ্ধে কথা বলে ও অনেক ক্ষেত্রেই ন্যায্য ভাবে তাদের দুর্নীতি সংক্রান্ত অপকর্মের কথা তুলে, আম আদমী পার্টি বাস্তবে, অন্য কোন রকমের পরিকল্পনার কথা বলছে না, একমাত্র “বিরুদ্ধে লড়াই” করা ছাড়া. একই সময়ে “পুরনো” দলগুলো – তাদের সমস্ত রকমের খুঁত থাকা স্বত্ত্বেও – প্রত্যেক দিনের অসংখ্য রকমের কাজকর্মের অভিজ্ঞতায় পুষ্ট – সেই ধরনের অভিজ্ঞতা, যা স্পষ্টতঃই এই আম আদমী পার্টির নেই. তাই খুবই সন্দেহজনক যে, এই দলের জনপ্রিয়তা এমনকি একটা বড় শহরের মাত্রাতেও থাকবে. তার ওপরে, দিল্লী শহরে অবিসম্বাদিত বিজয় এমনকি এই দলের জন্য পরাজয়ের কারণও হতে পারে, তাই ভলখোনস্কি আবারও বলেছেন:

“শেষমেষ, দুর্নীতি বিরোধী বর্শার ফলক মনে হয়েছে যে, ক্ষমতাসীন দলের দিকেও লক্ষ্য করে তোলা হয়েছে, অর্থাত্ প্রাথমিক ভাবে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে. কিন্তু প্যারাডক্স হল যে, সেই জনপ্রিয়তা, যা আজ এই দল কুড়িয়েছে, তা সেই দলের হয়েই কাজ করছে, যাদের বিরুদ্ধে তারা অস্ত্র ধরেছে. কারণটা সহজ: “দুর্নীতি বিরোধী ঢেউ” তুলে আম আদমী পার্টি বিরোধীদের শক্তিকেই খণ্ড করে দিচ্ছে, যা ভারতীয় জনতা পার্টির পক্ষে যেতে পারত”.

সেই কারণেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে: যত বেশী জয় হবে এই দলের, ততই বেশী করে সম্ভাবনা থাকবে বর্তমানের ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতায় টিকে থাকার. আর ক্ষমতার বদল না হতে পারা খুবই বেশী করে দুর্নীতির জন্য একটা চমত্কার রয়ে যাওয়ার জায়গা হচ্ছে, যার বিরুদ্ধে এই “আম আদমী পার্টি” লড়াই করছে.