আনুষ্ঠানিকভাবে ঐ গীর্জাটির নাম – পবিত্র কুমারী মেরির চাদরের সম্মানার্থে গীর্জা, কিন্তু সেই ষোড়শ শতক থেকেই তদ্গত ভাসিলির নামটা ঐ গীর্জার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে. ভাসিলি ছিল মস্কোর ভিক্ষুক, যে ঐ গীর্জায় ওঠার সিঁড়িতে ভিক্ষা করতো. অনেকে তাকে পবিত্র বিস্ময়কর সাধক ও ভবিষ্যদ্বক্তা বলে গণ্য করতো. নগরবাসীরা তার জীবদ্দশায় এবং মরণোত্তর কালেও তাকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতো. ধরা হয় যে, ভাসিলি দুটো সবচেয়ে বড় অগ্নিকান্ডের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন – মস্কোয় এবং নোভগোরদে.

তদ্গত ভাসিলি ক্যাথেড্রাল শুধুমাত্র রুশী স্থাপত্যশিল্পের অননুকরণীয় নিদর্শনই নয়, রুশী অস্ত্রের মহিমারও প্রতীক. পোস্তনিক ইয়াকভলেভের নেতৃত্বে রুশী রাজমিস্ত্রীরা ঐ গীর্জা নির্মাণ করেছিল কাজানের খানদের রুশ ভূখন্ড থেকে বিতাড়ন করা উপলক্ষ্যে. গীর্জার নির্মাণকাজ চলেছিল ১৫৫৫ সাল থেকে ১৫৬১ সাল পর্যন্ত. দেওয়াল গাঁথার জন্য সে যুগের সর্বাধুনিক সরঞ্জাম – ইট দিয়ে. ওর উচ্চতা ছিল ৬০ মিটার – সেই সময়ে ওটাই ছিল মস্কোয় সবচেয়ে উঁচু ভবন. ঐ গীর্জার স্থাপত্য এতই চোখধাঁধাঁনো এবং এত সব দুর্মুল্য রত্নে কারুকার্য করা, যে নগরবাসীরা শুরু থেকেই ঐ গীর্জাকে ভালোবেসে ফেলেছিল. তারা ঐ গীর্জার নামকরণ করেছিল ভূস্বর্গ বলে. এরকম লোকোগাথাও প্রচলিত ছিল, যে ক্ষিপ্ত স্বভাবের জার ইভান দ্য টেরিবল নাকি মুখ্য স্থপতির চোখ কানা করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন, যাতে সে আর কোথাও কখনো ওরকম স্থাপত্য নির্মাণ করতে না পারে.

কত কিই না সহ্য করতে হয়েছে ঐ ক্যাথেড্রালটিকে. ঐ ভবনটি একাধিকবার পুড়েছে, ওখানে লুটপাট হয়েছে. ১৮১২ সালে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন মস্কো দখল করার পরে ঐ ক্যাথেড্রালটিকে উড়িয়ে দেওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু ফরাসিরা তখন সময়ে কুলিয়ে উঠতে পারেনি. তখন ফরাসিরা রুশী সৈনিকদের তাড়া খেয়ে মস্কোর উপকন্ঠ ছেড়ে পালিয়ে বেঁচেছিল. গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে আবার তদ্গত ভাসিলি ক্যাথেড্রালকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, তবে সেটা করেছিল বিদেশী শত্রুরা নয়, নিজেদেরই লোকেরা – বলশেভিকরা. তারা জোর দিয়ে বলছিল, যে ঐ ক্যাথেড্রালটি নাকি রেড স্কোয়ার দিয়ে উত্সবের প্যারেডের সময় অবাধ চলাচলে বাধার সৃষ্টি করে. কিন্তু তাসত্বেও গীর্জাটি অক্ষত থাকলো. কিভাবে ? সেই আমলে শয়ে শয়ে গীর্জা বলশেভিকরা ধ্বংস করছিল. এমনকি ক্রেমলিনের ভেতরেও পুরাকালের দুটি খ্রীশ্চান মঠকে ও কয়েকটি অপরূপ গীর্জাকে সেই সময় ধুলিসাত্ করা হয়েছিল. তাহলে কি করে ঐ গীর্জাটিকে বর্বর ধ্বংসের হাত থেকে তখন বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল, সেটা আজও কেউ জানে না. এ সম্মন্ধে কয়েকটি মত প্রচলিত আছে.

১৯৩৬ সালে নাকি সেই যুগের সুবিদিত স্থপতি পেওতর বারানোভস্কিকে ক্রেমলিনে ডেকে পাঠিয়ে তদ্গত ভাসিলি ক্যাথেড্রালকে রেড স্কোয়ারের বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করার বাজেট চাওয়া হয়েছিল. বারানোভস্কি উত্তরে বলেছিলেন, যে এটা পাগলামো এবং যদি বাস্তবিকই ঐ ক্যাথেড্রালটিকে ধ্বংস করা হয়, তাহলে তিনি আত্মহত্যা করবেন. তখন ক্যাথেড্রালটিকে ছোঁয়া না হলেও ঐ ‘দুর্বিনীত’ স্থপতিকে কারাগারের অন্ধকুপে নিক্ষেপ করা হয়েছিল.

আরও একটা মত প্রচলিত আছে. বলা হয়, যে স্তালিনের ঘনিষ্ঠ সুহৃদ ও পুরাকালীন স্থাপত্যের পরম শত্রু লাজার কাগানোভিচ নাকি স্তালিনের সামনে নতুন, আধুনিক ও তার একান্ত আকাঙ্খিত রেড স্কোয়ারের মডেলের উপস্থাপনা করেছিলেন. তিনি সর্বতোভাবে স্তালিনের কাছে নাকি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন, যে ঐ ক্যাথেড্রাল গীর্জাটি প্যারেডের সময় মানুষের পদযাত্রা ও সাঁজোয়া গাড়িগুলোর যাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে. ঐ জায়গায় কাগানোভিচ নাকি বলেছিলেন – “আর যদি এটাকে নিশ্চিহ্ন করা হয়...” এই বলে তিনি নাকি ভাবী রেড স্কোয়ারের নক্সা স্তালিনের সামনে উপস্থিত করেছিলেন ঐ ক্যাথেড্রালটিকে ব্যতীরেকে. স্তালিন নাকি কয়েক মুহুর্ত ঐ মডেলটির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলেছিলেন – “লাজার, সবকিছু আবার তাদের নিজেদের জায়গায় রাখ”. কি করে তদ্গত ভাসিলি গীর্জা ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেল – সেই সম্পর্কে মস্কোয় এরকম জনশ্রুতি তখন প্রচলিত ছিল. যাই হোক না কেন, তদ্গত ভাসিলি ক্যাথেড্রালকে আমাদের কাল পর্যন্ত অক্ষত রাখা গেছে. সারা বিশ্বের মানুষ ঐ ক্যাথেড্রাল গীর্জাটির ছবি দেখেই চিনতে পারে. ঐ মন্দির আজ রাশিয়ার অন্যতম প্রতীক.