জবাবে গ্রিগোরি পতোত্স্কি বলছেন – এমন কোনো রুশী নেই, যে ভারতকে ভালোবাসে না. সেই সোভিয়েত আমলেই আমাদের ভারতীয় শিল্প, সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসার, জগদ্বিখ্যাত ভারতীয় মনীষিদের চিন্তাভাবনার সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল. তাদেরই অন্যতম – স্বামী বিবেকানন্দ. “যদি আপনি ভারতবর্ষকে জানতে চান, তবে বিবেকানন্দের রচনা পড়ুন” – কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই অভিব্যক্তি আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে. ১০ বছর আগে আমার ভারত ভ্রমণ করার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম ভারতীয় অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের ক্রমবর্ধমান গতিবেগ, এবং একইসঙ্গে নিজস্ব ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের প্রতি যত্নশীল মনোভাব. বিবেকানন্দের মতে, আধ্যাত্মিক পরম সত্যের নিরন্তর সন্ধান, ন্যায় ও দয়া ভিত্তিক নৈতিক মূলনীতি যেমন আধ্যাত্নিক, তেমনই আর্থ-সামাজিক সমস্যা সংকুলানে ব্যবহার করা যেতে পারে. এবং এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে আধুনিক বিশ্বের উদ্দেশ্যে প্রেরিত তাঁর বার্তার সারমর্ম ও তাত্পর্য্য. ভারতে পরম শ্রদ্ধেয় দার্শনিক, চিন্তাবিদ, ধর্মগুরু ও সমাজসেবী স্বামী বিবেকানন্দের ভাবমূর্তিকে ফুটিয়ে তোলার স্বপ্ন আমার বহুদিনের, তবে অপেক্ষাকৃত সম্প্রতিকালে আমি এই কাজে হাত দেওয়ার সাহস সঞ্চয় করেছি – বললেন গ্রিগোরি পতোত্স্কি.

২০১৩ সালে ভারতবর্ষে, রাশিয়া সহ পৃথিবীর বহু দেশে স্বামী বিবেকানন্দের ১৫০-তম জন্মজয়ন্তী উদযাপিত হয়েছিল. গ্রিগোরি পতোত্স্কি ছিলেন মস্কোয় ঐ উত্সব উদযাপনের অন্যতম যোগদানকারী. রাশিয়ার ভাস্কর ব্যাখ্যা করে বলছেন – “ঠিক তখনই ভারতীয় পক্ষ আমাকে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিমূর্তি নির্মাণ করার প্রস্তাব দিয়েছিল. আমি মগ্ন হয়ে এই কাজ করেছি, আমি চেয়েছিলাম এই মহিমাণ্বিত ও চরিত্রবান চিন্তাবিদের আসল ভাবমূর্তি ফুটিয়ে তুলতে. স্বামীজি সার্বজনীন ধর্মের পথনির্দেশ দিয়েছিলেন, বাস্তব জীবনে যা হচ্ছে নিঃস্বার্থে মানুষের সেবা, দানশীলতা ও সমবেদনার আদর্শ. আমি যারপরনাই আনন্দিত এই জন্য যে, আমার শিল্পকর্ম সসন্তোষে এবং কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করা হয়েছে”.

রুশী ভারতত্ত্ববিদ দমিত্রি চেলীশেভ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে, রাশিয়ায় বিবেকানন্দের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যের প্রতি আগ্রহ বহুবছরের. স্বামী বিবেকানন্দের অনুরাগী ছিলেন তাঁর সমসাময়িক লেভ তলস্তোয়. “সোভিয়েত আমলে আমাদের দেশে স্বামী বিবেকানন্দের সমাজ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল. নতুন রাশিয়ায় ‘লাদোমির’ প্রকাশনালয় স্বামী বিবেকানন্দের ‘ব্যবহারিক বেদান্ত, নির্বাচিত রচনাবলী’ প্রকাশ করেছিল এবং আমার সৌভাগ্য হয়েছিল ঐ গ্রন্থের রুশী ভাষায় অনুবাদের কাজে অংশগ্রহণ করার. ঐ সংস্করণটি নিমেষের মধ্যে বিক্রি হয়ে যায় এবং বেস্টসেলারের আসন অধিকার করে. যদিও স্বামীজির চিন্তাধারা রুশী মৃত্তিকায় সম্পূর্ণরূপে স্থানান্তরিত করা অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা, ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ধারণা আমাদের আজকের দিনের বাস্তবতার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য” – উল্লেখ করছেন দমিত্রি চেলীশেভ. 

“তাঁর অনন্য ও আকর্ষণীয় প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা ব্যবস্থা বহু সুবিদিত রুশী শিক্ষাবিদদের প্রভাবিত করেছে. যেমন, সুখোম্লিনস্কি ও তার বর্তমান অনুগামীদের. এই সিস্টেমে জোর দেওয়া হয় সততা, নীতিবোধ, দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক সাদায্যদান, দয়াশীলতা, সমবেদনা, প্রাপ্র জ্ঞান সমাজের মঙ্গলের কাজে ব্যবহার করার পারঙ্গমতার উপর. তাই বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, ভারতবর্ষে প্রচন্ড সম্মানীয় স্বামী বিবেকানন্দের রেখে যাওয়া ঐতিহ্যের শরণাপন্ন হন রাশিয়ায় বিবিধক্ষেত্রে সৃষ্টিশীল ব্যক্তিত্বরা”.

মস্কোয় ভারতীয় রাষ্ট্রদূতাবাসের অন্তর্গত সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিমূর্তি উপস্থাপনার শোভাবর্ধন করলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান. সেটা ছিল স্বামীজিকে নৈবেদ্য নিবেদন সেই সব রুশবাসীদের তরফ থেকে, যারা ভারত ও তার শিল্প, সংস্কৃতির সমঝদার ও গুণগ্রাহী.

রুশী ভাস্কর গ্রিগোরি পতোত্স্কি নির্মিত স্বামী বিবেকানন্দের ব্রোঞ্জের স্মৃতিমূর্তিটির ফোটো আপনারা দেখতে পারেন আমাদের সাইটে.