তারই মধ্যে, আফগানিস্তানে পশ্চিমের সৈন্য দলের উপস্থিতি ও তার সঙ্গে মাদক উত্পাদনের বৃদ্ধির সম্পর্ক এমনিতেই একটা জানার আগ্রহ তৈরী করে দেয়. এখানে নানা ধরনের ধারণা তৈরী হতেই পারে, তারই একটা নিয়ে বলেছেন আমাদের সমীক্ষক ইভগেনি এরমোলায়েভ, তিনি বলেছেন:

“যদি বিশ্বের মানচিত্রে মাদক দ্রব্য প্রসারের একটা পথের প্রসার আঁকা হয় আর তারই সঙ্গে আঁকা হয় অন্য একটা মানচিত্রে সন্ত্রাসের প্রসারের পথ, আর তারপরে দুটো মানচিত্রকে একটার উপরে একটা হিসাবে চাপানো হয়, তবে দেখা যাবে এক আশ্চর্য রকমের মিল. প্রসঙ্গতঃ, এতে অবাক হওয়ার মতো কিছুই নেই, শুধু প্রথমের চমকটুকু ছাড়া. “আল-কায়দা” দলের স্রষ্টা ওসামা বেন লাদেন ও আল-জওয়াহিরি একেবারে শুরু থেকেই নিজেদের সন্ত্রাসের জালে মাদক মাফিয়াদের জড়িয়ে নিয়েছিল. যদিও বা আফগানিস্তানের তালিবরা একসময়ে ঝুঁকি নিয়েই সবটা না হলেও অনেকটাই এই মাদক উত্পাদনের উপরে লাগাম দিয়েছিল, তার পরেই সেই দেশে উপস্থিত হয়েছিল আমেরিকার লোকরা আর ঠিক তারপরেই এই মাদক ব্যবসায়ের পুনঃ প্রতিষ্ঠা হয়ে গিয়েছিল, আর তা থেমে থাকে নি, বরং বেড়ে গিয়েছে বহু গুণেই. আর “আল-কায়দা” দলের কাছে আবার অর্থ প্রবাহ শুরু হয়েছিল নদীর স্রোতের মতই”.

বিশ্বে দ্বিতীয় সর্ব বৃহত্ মাদক রপ্তানী কারক দেশ রয়েছে মধ্য আমেরিকায়, যারা প্রধানতঃ কোকেইন রপ্তানী করে থাকে. বিগত সময়ে দেখা গিয়েছে যে, কোকেইনের প্রবাহ এবারে মহাসমুদ্র পার হয়ে পশ্চিম আফ্রিকাতে এসে পৌঁছচ্ছে আর তারপরে স্থলপথে মাগ্রিবের দেশগুলো হয়ে সাহারা মরুভূমি পার হয়ে ইউরোপে এসে পড়ছে. “আল-কায়দা” এখানেও নিজেদের জায়গা পেয়েছে. সেই দলের জঙ্গীরা সেই ঐস্লামিক মাগ্রিবের দেশগুলোতে মাদকের ক্যারাভান পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মরুভূমি পথে ও তার পরিমাণের উপরে নিয়ন্ত্রণও রাখছে. একটা হিসাব রয়েছে, যা অনুযায়ী এই এলাকায় মাদক পাচার থেকে যা আয় হচ্ছে, তা সেই গাদ্দাফির শাসনের সময়ে লিবিয়া থেকে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোকে যত অর্থ সাহায্য দেওয়া হত তারই সমান. তবে এবারে অর্থ পড়ছে অন্যদের হাতে, আর তা মোটেও আগের থেকে কম নয় শুধু সেই অর্থ ব্যবহারের লক্ষ্য পরিবর্তন হয়েছে. অনেক রকমের ধারণা রয়েছে মালি দেশের সদ্য হয়ে যাওয়া গৃহযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে, যেখানে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে লড়াইয়ের অজুহাতে আসলে স্থানীয় মাফিয়া ও প্রজাতিদের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগি হয়েছে.

একটা সন্দেহ রয়েছে যে, পশ্চিমের খুবই প্রভাবশালী লোকরা মাদক পাচারের বিষয়ে গোপন ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করে থাকে, এটা অনেকদিনই হল যে শোনা যাচ্ছে – তবে কোন সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় করে উপস্থিত করা সম্ভব হয় নি, এই কথা উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ ভিক্টর নাদেইন-রায়েভস্কি মন্তব্য করেছেন যে, তাঁর মতে পশ্চিমের এখানে দোষ অন্য বিষয়ে: এই সমস্যা নিয়ে সম্পূর্ণ রকমের ঔদাসীন্য দেখানোতে, তাই তিনি বলেছেন:

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিয়ে যা বলা যেতে পারে, তা হল যে, তাদের এই ধরনের নিরুত্সাহ হওয়ার কারণ একেবারে ওপরেই দেখতে পাওয়া যাচ্ছে. আফগানিস্তান থেকে মাদক মহাসমুদ্র পার হয়ে যাচ্ছে না. তা মূলতঃ এই এলাকার দেশগুলোতেই এসে পড়ছে. তার মধ্যে যেমন রাশিয়া ও ইউরোপ রয়েছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে না যে, তাদের অন্যদের স্বার্থ রক্ষার কোন প্রয়োজন পড়েছে. তার ওপরে আবার সেই সব মুসলিম দেশগুলোর জন্য, যাদের দেশের লোকরা আফগানিস্তানের মাদক থেকেই এবারে আসক্ত হয়ে পড়ছে”.

প্রসঙ্গতঃ, এখানে অন্য একটা কারণকেও দেখা যেতে পারে. জানা রয়েছে যে, আফগানিস্তানের মাদক ব্যবসায়ের রাজারা শুধু আর শুধুমাত্র সেই আফগানিস্তানেই ঘাঁটি গেড়ে বসে নেই. এই দেশ – শুধু মাদক উত্পাদনের একটা কারখানা, আর সেখানে মাদকের প্রাথমিক পরিশোধনের কাজই হয়ে থাকে. ব্যবসা কিন্তু ছড়িয়ে আছে সারা বিশ্ব জুড়েই.

তাই বলা যেতে পারে যে, আমেরিকার সেনাবাহিনী আসার সঙ্গে আফগানিস্তান এবারে সত্যিই বিশ্বের অর্থনীতির সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে, যা ঠিক সেই আমেরিকাই আশ্বাস দিয়েছিল. কিন্তু শুধু একটা ভাবেই – এক বিপুল ভাবে লাভজনক বিষাক্ত জিনিষের রপ্তানীকারক হিসাবে. এটাতে অবশ্য অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই. কারণ শুধুমাত্র লাভ হয় এমন একটা ব্যবস্থায়, যে কোন রকমের খুব বেশী রকমের লাভ হতে পারে এমন ব্যবসা নিশ্চয় করেই প্রচুর গতিপথ খুঁজে পেয়ে যাবে, যা সেটাকে টিকে থাকার ও উন্নতি করার সুযোগ করে দেবেই.

সেই পশ্চিমেই, যারা এখন বুনো ধনতন্ত্রের অবস্থা পার হয়ে এসেছে, সেখানে মনে হয় একটা লোক-দেখানো মাদক পাচারের সঙ্গে লড়াই করা হচ্ছে – যদিও তার থেকে কোন বিশেষ ফল পাওয়া যাচ্ছে না. আর আফগানিস্তান বিশ্বের ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় – একেবারেই নতুন খেলোয়াড়. আগে – নাজিবুল্লার সময়ে যেমন, তেমনই মোজাহেদদের সময়েও, এমনকি তালিবদের সময়েও আফগানিস্তান এই বিশ্ব জোড়া ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল না, অন্ততপক্ষে সম্পূর্ণ ভাবে. এখন সেই দেশ এই ব্যবস্থার একেবারে কুক্ষিগত হয়েছে – আর তা এই ব্যবস্থাকে কি আর দিতে পারে? সেখানে খনিজ তেল থাকলে তারা সেই তেলই দিত. কিন্তু সেখানে কোন খনিজ তেল নেই. তার ফলে আফগানিস্তান বিশ্বের অপরাধের বাজারে রপ্তানী করছে মাদক দ্রব্য – আর সেটা হচ্ছে সেখানে থাকা আমেরিকার সেনাবাহিনীর প্রায় নিরুত্তাপ নজরের মধ্যে দিয়েই.

এই ভয়ানক বিপদের সঙ্গে আফগানিস্তানের লোকরা নিজেরাই শুধু মোকাবিলা করতে পারে. আমেরিকার লোকরা এই ব্যাপারে তাদের কোনই কাজে লাগবে না, বিগত দশকের বেশী সময় ধরে ঘটা ইতিহাস আমাদের এই কথাই প্রমাণ করে দিয়েছে.