বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে এর আয়ু এখনো অনেককাল. যদি কোনোকিছু স্টেশনটির আয়ুর পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা হচ্ছে আবর্জনা.

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে মহাকাশ স্টশনটিকে ক্রমশঃই বেশি ঘনঘন নিজেদের কক্ষপথে বুলেটের গতিতে ছুটতে থাকা আবর্জনার পথ থেকে মোড় ঘোরাতে হচ্ছে. আবর্জনার আয়তন টেনিস বলের মাপ থেকে শুরু করে যাত্রীবাহী বাসের মাপের হতে পারে. আবর্জনার বড় খন্ডগুলির ওজন ৬ টন পর্যন্ত হতে পারে, যখন ছোট টুকরোগুলির ওজন মাত্র কয়েক গ্রামও হতে পারে. বড়মাপের আবর্জনার খন্ডগুলির সাথে ধাক্কা লাগলে চেন-রিএ্যাকশনের উদ্ভব হতে পারে বলে অনেকের আশঙ্কা. রুশী বিজ্ঞান অ্যাকাডেমির অন্তর্ভুক্ত মহাকাশ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিনিধি য়ুরি জাইত্সেভ মনে করেন, যে পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবনতি ঘটলে বাধ্য হয়ে ভুপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮০০ কি.মি. উচ্চতায় অবস্থিত ও সবচেয়ে বেশি ব্যবহার্য কক্ষপথগুলিতে কাজকর্ম করা বন্ধ করতে হবে. –

ঘটনাধারা সেইদিকেই এগোতে চলেছে, যদি না মহাকাশে জঞ্জাল ফেলা বন্ধ করা ও আবর্জনা সাফাই করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়. এটা শুধু পৃথিবীর নিকটবর্তী কক্ষপথগুলিই নয়, দূরবর্তী কক্ষপথগুলির জন্যেও প্রযোজ্য.

একসারি বিশেষজ্ঞের মতে ধাক্কা খেয়ে স্যাটেলাইটগুলি হাজার হাজার খন্ডে ভেঙে পড়বে এবং সেগুলি আবার নতুন নতুন সংঘর্ষের সৃষ্টি করবে. তবে অন্যদিকে ‘মহাকাশবিদ্যার খবরাখবর’ নামক পত্রিকার সম্পাদক ইগর আফানাসিয়েভ এতখানি নৈরাশ্যবাদী নন. তিনি বলছেন –

সেই অর্থে চেন-রিএ্যাকশন ঘটতে পারে না. কৃত্রিম উপগ্রহগুলির যে সব ভাঙা খন্ড অন্যান্য স্যাটেলাইটের সাথে যখন ধাক্কা খায়, তখন তারা বিশাল মেঘের উত্পত্তি ঘটায় ও তারা সম্পূর্ণ অন্যরকম আচরণ করে. ৮০০ কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত কক্ষপথে পাঠানো যন্ত্রপাতি ও উপগ্রহের সংখ্যা হয় স্থির অঙ্কে গিয়ে পৌঁছেছে, নয়তো তাদের সংখ্যা ক্রমশঃ কমছে. কারণ, অধিকাংশ আধুনিক যন্ত্রপাতিতে বিশাল অন্তর্নিহিত সামর্থ্য নিহিত রয়েছে এবং আগের মতো অত ঘনঘন তাদের বদল করার কোনো প্রয়োজন নেই. অধিকাংশ যন্ত্রপাতি, যেগুলো নীচের দিকের কক্ষপথগুলিতে চক্কর মারছে, তারা সাধারণতঃ স্বেচ্ছায় কক্ষপথ ছেড়ে গিয়ে বায়ুমন্ডলে জ্বলে পুড়ে যায়. যে সব বড় যন্ত্রের ইঞ্জিন সিস্টেম রয়েছে, তারা নিজেদের গতিবিধির রুট সংশোধন করতে পারে. এমন ডাটা বেস আছে, যার দৌলতে সংঘর্ষের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব এবং কক্ষপথ সংশোধন করে অনেকক্ষেত্রে সংঘর্ষ এড়ানো যায়.

চালকবাহিত মহাকাশযানগুলি এবং দুর্মূল্য মহাজাগতিক যন্ত্রপাতিগুলিকে কোনোভাবে সংঘর্ষের বিপদ থেকে রক্ষা করার জন্য বিজ্ঞানীরা মহাকাশের আবর্জনার গতিবিধির ওপর মনোযোগ সহকারে নজর রাখেন এবং অঙ্ক কষে তাদের গতিবিধির রুট নির্ণয় করেন. কিন্তু তারা শুধুমাত্র ১৫ শতাংশ গতিশীল বস্তু ‘প্রত্যক্ষ করতে’ পারেন. তার মানে, মহাকাশের জঞ্জালের দিকে একাগ্র নজরদারি তেমন কার্যকরী নয়.

এদিকে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা তাদের নিজস্ব সমাধান সূত্র প্রস্তাব করছেন. যেমন, জাপানের বিজ্ঞানীরা কক্ষপথগুলি সাফ করতে চাইছেন বিশালাকার ধাতব জাল দিয়ে. তারা বিশেষ ধরনের কৃত্রিম উপগ্রহের বোর্ডে করে ঐ জাল কক্ষপথে পৌঁছে দেবেন. জালটি হবে কয়েক কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এবং বিশেষ ম্যানিপুলেটরের সাহায্যে কক্ষপথে তার পাক খুলে ছড়িয়ে দেওয়া হবে সেটাকে. যখন জালটিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জঞ্জাল জমা হবে, তখন সেটি জঞ্জালসুদ্ধ পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে নেমে এসে পুড়ে খাক হয়ে যাবে.

আমেরিকানরা নিকটবর্তী মহাকাশে উওলফ্রামের কণা দিয়ে ধুলোর মেঘ তৈরী করার প্রস্তাব দিচ্ছে. ঐ মেঘ ছোট ছোট খন্ডগুলির গতি মন্দীভুত করে নিজের পেছনে টেনে নেবে. এই প্রকল্পের রচয়িতাদের করা হিসাব অনুযায়ী, মহাকাশকে পুরোপুরি জঞ্জালমুক্ত করতে ২৫ বছর সময় লাগবে. রাশিয়ার বিজ্ঞানীরা বেশি বাস্তববাদী এবং তারা এমন চালকবাহী মহাকাশযান বানানোর জন্য প্রস্তুত, যা কক্ষপথে জমাদারের কাজও সফলভাবে করতে পারবে.

তবে প্রস্তাবিত সব প্রকল্পগুলির অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মনে সংশয় আছে. ফলশ্রুতিতে, মহাকাশে আবর্জনার পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েই চলবে. এবং ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কর্মরত মহাকাশযাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়বে. তবে আবর্জনার সমস্যা মানবজাতির মহাকাশ অভিযান গুটিয়ে নেওয়ার কোনো কারণ হতে পারে না. শুধু দরকার সীমিত রসদ হিসাব করে খরচ করার, ঠিক যেভাবে আমরা এখন এই কাজটি করছি আমাদের পৃথিবী গ্রহে.