সিরিয়ার অস্ত্র সিরিয়ার বাইরেই নষ্ট করতে হবে বলেই রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থার সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল. কিন্তু নিজেদের দেশে এই ধরনের বিষাক্ত জিনিষ নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না. আলবানিয়া, জার্মানী, নরওয়ে ইতিমধ্যেই এই ধরনের প্রস্তাব অস্বীকার করেছে. তখন এই সংস্থার বৈঠকে অন্য একটি উপায়ের কথা বলা হয়েছে: নিরপেক্ষ সমুদ্রে এটা নষ্ট করা হলে কেমন হয়. তার জন্য দুটো পথ রয়েছে. প্রথম – রাসায়নিক অস্ত্র স্রেফ ডুবিয়ে দেওয়া, এই কথা উল্লেখ করে সামরিক পর্যবেক্ষক ও “স্বাধীন সামরিক পর্যালোচনা” জার্নালের সম্পাদক ভিক্টর লিতোভকিন বলেছেন:

“ডুবিয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা মানব সমাজের রয়েছে. ১৯৪৫-১৯৪৬ সালে হিটলারের জার্মানীকে ধ্বংস করে দেওয়ার পরে রয়ে গিয়েছিল প্রায় দেড় লক্ষ টন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ. তখন বিজয়ী রাষ্ট্রগুলো – মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত দেশ, ফ্রান্স, গ্রেট ব্রিটেন – এই “সম্পদ” নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছিল ও তা বাল্টিক সমুদ্রে ও উত্তরের সাগরে কাট্টেগাট ও স্কাগের্রাক প্রণালীর জলে ডুবিয়ে দিয়েছিল. তার ওপরে আবার এক পক্ষ তা সরাসরি বজরা বা জাহাজ শুদ্ধ ডুবিয়ে দিয়েছিল, অন্য পক্ষ স্রেফ জাহাজের উপর থেকে জলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল. এই সবই গত সত্তর বছরে সমুদ্রের তলায় বালিতে ও আগাছায় ঢেকে গিয়েছে. আর আজ এক প্রশ্নের উদয় হয়েছে – সেগুলো কি জলের তলা থেকে তোলা হবে কি না? রসায়ন বিদ্যায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, ততক্ষণ খারাপ জিনিষে হাত লাগিয়ে দরকার নেই, যতক্ষণ তা বিনা ঝঞ্ঝাটে পড়ে রয়েছে”.

দ্বিতীয় পথ – সিরিয়া থেকে রাসায়নিক বস্তু বিশেষ বজরা করে অথবা কোন পাটাতনে চাপিয়ে নিয়ে নিরপেক্ষ জলসীমায় নিয়ে গিয়ে আগুন জ্বালিয়ে দিলেই চলবে. জাপান নিজেদের রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে এই রকমই করেছিল, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে চিনের এলাকায় পড়ে ছিল. একই ধরনের অভিজ্ঞতা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও রয়েছে, শুধু আমেরিকার লোকরা রাসায়নিক অস্ত্র নষ্ট করার কাজ ভাসমান অবস্থায় করে নি, তার করেছে প্রবাল দ্বীপে, এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে সামরিক বিশেষজ্ঞ ভিক্টর লিতোভকিন বলেছেন:

“মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হাওয়াই দ্বীপপূঞ্জের থেকে অল্প দূরে জনস্টন অ্যাটলে, যেখানে এক সময়ে নিজেদের পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা করেছিল, সেখানে রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করেছিল. এই অ্যাটলের চারপাশে কোন জনবসতি নেই, তাই এটা ছিল যথেষ্ট নিরাপদ উপায়. কোন নিরপেক্ষ জলসীমায় বজরা করে নিয়ে গিয়ে রাসায়নিক অস্ত্র জ্বালিয়ে দেওয়াও যেতে পারে. কিন্তু জ্বালিয়ে দেওয়া উপায়কে বলা যেতে পারে বর্বরদের মতো কাজ. কারণ রাসায়নিক অস্ত্র থেকে উপযোগী পদার্থ বের করে নেওয়া যেতে পারে, যা পরে ব্যবহার করা যেতে পারে, নীতিগত ভাবে (সিরিয়ার অস্ত্র নিয়ে) এটা করা যেতেই পারে”.

আর তাও জলে নষ্ট করে ফেলার বিরুদ্ধে কথা বলার অনেক লোক রয়েছেন. প্রাথমিক ভাবে পরিবেশগত নিরাপত্তার কথা ভেবেই. সিরিয়া থেকে প্রশান্ত মহাসাগরের কোন একটা ঐতিহ্যবাহী “জঞ্জাল” ফেলার জায়গায় নিয়ে যাওয়াটা- অনেক দূর পড়ে ও অনেক সময়ও লাগে, তার মধ্যে আবার বহু দেশের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে সমঝোতা করতে হবে, যাদের জলসীমা দিয়ে জাহাজ যাবে, আবার তার ওপরে সশস্ত্র প্রহরা দিয়ে. ভূমধ্য সাগর এমনিতেই মানুষের দৈনন্দিন জঞ্জাল ও কল কারখানা থেকে ফেলা আবর্জনায় খুবই নোংরা. সেখানে শুধু “রাসায়নিক” অস্ত্র ফেলাই বাকী রয়েছে, এই কথা উল্লেখ করে প্রাক্তন ভাইস অ্যাডমিরাল ও রাশিয়া প্রশাসনের জলের নীচে বিশেষ ধরনের কাজ কর্মের জন্য নিযুক্ত পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি তেঙ্গিজ বরিসভ বলেছেন:

“কেউই কোন রকমের বিপর্যয় হওয়ার ঝুঁকিকে বাদ দিতে পারে না. সেই রকমের কিছু একটা হয়ে গেলে পরিবেশ দূষিত হয়ে যাবে. আর নিরপেক্ষ জলসীমায় কোন একটা দিকে একটু সরে গেলেই, কারও না কারও দেশের জলসীমা পড়বেই. একই রকম ভাবে এক সময়ে ভাবা হয়েছিল পৃথিবীর কাছের কক্ষপথে পারমাণবিক বর্জ্য পদার্থ নিয়ে যাওয়া হবে ও তারপরে উন্মুক্ত মহাকাশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে. প্রথমে মনে হয়েছিল এটা ভাল উপায়, পরে স্পষ্ট হয়েছিল যে, যদি মহাকাশ যানের যাত্রা শুরু হওয়ার সময়ে কোন দুর্ঘটনা ঘটে, তবে একই সঙ্গে বিশাল এলাকা দূষিত হয়ে যাবে. আর এই ধারণা থেকে তাই নিরস্ত হওয়া গিয়েছে”.

সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে ঠিক কি করা হবে, তা নিয়ে রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ সংস্থার আলোচনার জন্য বাস্তবে প্রায় সময়ই বাকী নেই. ১৭ই ডিসেম্বরের মধ্যে এই সংস্থাকে সিরিয়ার সামরিক রাসায়নিক অস্ত্র নিয়ে পরিকল্পনা পেশ করতে হবে. তার মধ্যে আবার সমস্ত কিছুই এই দেশের এলাকা থেকে ৫ই ফেব্রুয়ারীর মধ্যে নিয়ে যেতে হবে, আর ধ্বংস করে ফেলতে হবে ২০১৪ সালের ৩০শে জুনের মধ্যে.