নুন ও পিঁয়াজের দাম দেশের শেয়ার বাজারের সূচকের সঙ্গেই ভারতীয় অর্থনীতির খুবই গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর এই সমস্ত সূচক এখন যদি না ঝড়ের সঙ্কেত দিয়ে থাকে, তবুও খারাপ আবহাওয়ার ইঙ্গিত যে দিয়েছে, তা ঠিক.

রুপিয়ার বিনিময় মূল্য বাস্তবে প্রত্যেক দিনই নতুন করে ঐতিহাসিক ন্যূনতম দামের রেকর্ড তৈরী করছে. এশিয়াতে এখন ভারতীয় টাকা উন্নতিশীল দেশগুলোর মধ্যে একটি সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রায় পরিণত হয়েছে. দেশ নিজেকে একটা ফাঁদে ঠেলে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে: চলতি কারবারের ভাণ্ডারে ঘাটতি, যা ভারত এখন বেশী করেই রপ্তানীর জায়গায় আমদানী করছে বলে তৈরী হয়েছে, তা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করেছে.

আগষ্ট মাসের শেষে ভারতের অর্থমন্ত্রী পি. চিদাম্বরম একটি দশটি কর্মসূচী সমেত পরিকল্পনা প্রকাশ করেছিলেন, যা দেশের গড় বার্ষিক উত্পাদনের শতকরা ৫, ১ শতাংশ বাজেট ঘাটতি কমানোর জন্য করা হয়েছিল ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকেও পুনরুজ্জীবিত করবে বলে মনে করা হয়েছিল. তিনি একই সঙ্গে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, চলতি আর্থিক বছরে অর্থাত্ যা শেষ হতে চলেছে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে, তাতে বাজেট ঘাটতিকে গড় বার্ষিক উত্পাদনের শতকরা ৪, ৮ ভাগের বেশী করতে দেবেন না ও বিনিয়োগ এবং শিল্পের উন্নতির জন্য ব্যবস্থাগুলোকে দ্রুত কার্যকর করা হবে. চিদাম্বরম বিদেশী মূলধনকে আকর্ষণ করতে চেয়েছেন আর তার জন্য বিশেষ ধরনের বণ্ড প্রকাশের কথাও বলেছেন, যা বিদেশে থাকা ভারতীয়দের জন্য করা হচ্ছে.

কিন্তু এই পরিকল্পনাও সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের খুব একটা আকর্ষণ করে নি. ভারতীয় সম্প্রদায়ের লোকরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খুবই দ্রুত দাম পড়ে যাওয়া শেয়ারেই নিজেদের অর্থ বিনিয়োগ করা পছন্দ করেছেন, যা দেশের জন্য এত প্রয়োজনীয় বিদেশী মূলধন বেরিয়ে যাওয়াকেই বেশী চাঙ্গা করেছে. বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা আরও বেশী করেই হয়েছে, যখন দেশের পার্লামেন্ট খাদ্য নিরাপত্তা বিল সমর্থন করেছে, যার ফলে দেশের সবচেয়ে গরীব মানুষদের জন্য সস্তায় খাদ্য বস্তু দেওয়া হবে. কিন্তু এটা দেশের বাজেটের থেকে এত প্রয়োজনীয় দু হাজার একশ কোটি ডলার সমান অর্থ নিয়ে নেবে, যার ফলে মন্ত্রীসভার পক্ষ থেকে করা বাজেট ঘাটতি বাড়তে না দেওয়ার আশ্বাসকেই সন্দেহ জনক করে তুলেছে. কিছু বিশ্লেষক এই দলিলের নাম দিয়েছেন “সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের অস্ত্র” বলে.

বর্তমানের পরিস্থিতিকে খারাপ করেছে ইউরোপীয় সঙ্ঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের খনিজ তেলের উপরে নিষেধাজ্ঞা – যার ফলে ভারত, যারা ইরানের থেকে তেল আমদানীর বিষয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ, তাদের বাধ্য হতে হচ্ছে সেই দেশ থেকে আমদানী করা তেলের শতকরা ৫৫ ভাগ ডলারে ও ৪৫ ভাগ টাকায় দাম দিতে ও তাই বিনিময় মূল্যের পার্থক্যের জন্য প্রত্যেক দিন ২৫ লক্ষ ডলার ক্ষতি স্বীকার করতে.

এই সব ছাড়াও মুম্বাই ও বঙ্গ দেশে কারখানার বাড়ীঘর ভেঙে পড়ার কারণে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে আন্দোলনের ঢেউ ওঠা শুরু হয়েছে. জামা কাপড়ের ব্যবসায় বিশ্বের অতিকায় কোম্পানী রিভার আইল্যান্ড ও এইচ অ্যান্ড এম, যারা ভারতের খোলা বাজারে নিজেদের ব্যবসা চালু করার বিষয়ে প্রথম সারির কোম্পানীদের মধ্যে ছিল, তারা বাধ্য হয়েছে ভেঙে পড়া কারখানার শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে ও অসন্তুষ্ট শ্রমিকদের ভাতা দিতে গিয়ে আদালতে হাজির হতে ও বহু লক্ষ টাকা ব্যয় করতে. এমন একটা অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যখন বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ভারতীয় বাজার স্রেফ শ্বাসরোধ করে দিচ্ছে, তাদের স্থানীয় প্রশাসনের বদলে আঞ্চলিক সমস্যা সমাধান করার বিষয়ে সামনে ঠেলে দিয়ে. আর তারই মধ্যে দেশের বিনিময় মুদ্রার বাজারের ঘাটতি প্রত্যেক দিনের সঙ্গেই আরও বেড়ে চলেছে.

সুতরাং টাকার দাম বাড়ার কথা আপাততঃ হচ্ছে না, আর খাবার জিনিষের দামও সমস্ত রকমের রেকর্ড ব্রেক করে চলেছে. বিহারের নুনের দাম বেড়ে যাওয়ার ঘটনার জন্য বিরোধী বিজেপি জোট ইতিমধ্যেই দেশের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে দায়ী করেছে, তারা ঘোষণা করেছে যে, দেশের সরকারই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের ভাণ্ডার তৈরী করে দিতে বাধ্য.

সুতরাং নুন ও পিঁয়াজের দামকে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ভাবে এক গুরুত্বপূর্ণ সূচক বলে দেখারই শুধু দরকার নেই, বরং বলা যেতে পারে এক রকমের রেটিং, যা রাজনৈতিক দলগুলোর আছে. আর ২০১৪ সালে নির্বাচনের পরে ক্রমাগত ভাবে বেড়ে চলা খাদ্যবস্তুর সঙ্কট এমনকি জয়ী দলের জন্যও খুবই গুরুতর এক পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে.