মনমোহন সিংহ ছাড়া, এই রাষ্ট্রপ্রধানদের সাক্ষাত্কারে অংশ নিচ্ছেন না কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিভেন হার্পার, যিনি কয়েক সপ্তাহ আগেই শ্রীলঙ্কায় আসার ব্যাপারে অস্বীকার করেছেন আর মরিসাসের প্রধানমন্ত্রী নাভিন রামগুলাম, যিনি এই সামিট বয়কটের সাথে আক্ষরিক অর্থে দিন দুয়েক আগে যোগ দিয়েছেন.

এখানে বলা ঠিক হবে না যে, মনমোহন সিংহের পক্ষে কলম্বো না যেতে চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব একটা সহজ কাজ হয়েছে. ভারতের দুটি নেতৃস্থানীয় তামিল দলই – এআইডিএমকে ও ডিএমকে – অনেকদিন ধরেই ভারত সরকারের কাছ থেকে এই সিদ্ধান্ত আদায় করতে চেয়েছিল. তার ওপরে আবার তারা দাবী করেছিল এই সামিট সম্পূর্ণ ভাবে বয়কট করার জন্য, মনমোহন সিংহ তাদের দাবীর কাছে নতি স্বীকার করলেও সামিটে অংশগ্রহণ করা থেকে পুরোপুরি পিছিয়ে আসেন নি, তিনি দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সলমন খুরশিদকে শ্রীলঙ্কায় পাঠিয়েছেন. এই প্রসঙ্গেও বরিস ভলখোনস্কি মন্তব্য করে বলেছেন:

“ভারতের শ্রীলঙ্কার সাথে সম্পর্ক কখনই সাধারণ ছিল না. এমনকি ব্যাপারটা শুধু শ্রীলঙ্কার সংখ্যালঘু তামিল সম্প্রদায়ের অধিকারে প্রশ্নেই নয়, বরং বেশ কিছু এখনও অসমাধিত সীমান্ত সংক্রান্ত প্রশ্ন নিয়েও, যে কারণে নিয়মিত ভাবেই ভারতীয় জেলেরা (আবারও সেই – তামিল জেলেরা) শ্রীলঙ্কার সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে, যা সেখানের সামরিক বাহিনীর লোকরা মনে করে নিজেদের সীমান্ত অন্তর্বর্তী জলসীমার অংশ”.

এই সামিটে মনমোহন সিংহের অংশ নিতে না চাওয়া কোন সন্দেহ নেই যে, প্রধানতঃ ভারতের ভেতরেরই খুবই জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে জড়িত. ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রাক্ নির্বাচনী পরিস্থিতি মোটেও ভাল না, বরং নরম করে বলা যেতে পারে যে, সঙ্কটজনক, আর এই পরিস্থিতিতে তাঁর খুবই প্রয়োজন এত বড় এক রাজ্য তামিলনাডুর লোকদের কাছ থেকে সামাজিক মতামতে সমর্থন পাওয়া ও নেতৃস্থানীয় তামিল রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকেও ভরসা পাওয়ার.

কিন্তু এই কৌশলগত পদক্ষেপের সাফল্যে মোটেও গ্যারান্টি দেওয়া যায় না. কংগ্রেসের ইউপিএ জোটের শরিক ডিএমকে নিজের রাজ্যেই অনেকখানি ক্ষমতা হারিয়েছে ও এআইডিএমকে দল এখন “থার্ড ফ্রন্ট” তৈরীর বিষয়ে হাত বাড়িয়ে বসে রয়েছে. আর মনে তো হয় না যে, কংগ্রেসের সঙ্গে কোন কোয়ালিশনে যাবে, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“কিন্তু অনেক বেশী গুরুতর মনে হচ্ছে এই পদক্ষেপের স্ট্র্যাটেজিক পরিণতিকে. সেই শ্রীলঙ্কাতেই এই পদক্ষেপকে গ্রহণ করা হয়েছে খুবই নেতিবাচক ভাবে ও তা শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জটিল করেই দিতে পারে. তার ওপরে শ্রীলঙ্কার সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলী লোকরা নিজেদের ক্ষোভ শ্রীলঙ্কার সংখ্যালঘু তামিলদের উপরেই উগরে দিতে পারে, যা একটানা ২৬ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের পরে শান্তি প্রক্রিয়াকে তার শুরুর অধ্যায়েই আরও কঠিন করে তুলতে পারে. এই ভাবেই শ্রীলঙ্কার সামিট বয়কট করার ফলে সেখানের তামিলদের অবস্থা আরও খারাপই হতে পারে.

ভারত অন্য এক দিকেও গুরুতর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে. বিগত বছরগুলোতে শ্রীলঙ্কাতে লক্ষ্যণীয় ভাবেই চিনের উপস্থিতি দেখা গিয়েছে. চিনের ও পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সামরিক সাহায্যের ফলেই এই দেশের সরকারি ফৌজ “তামিল টাইগারদের” হারিয়ে জয়ী হতে পেরেছে ২০০৯ সালের মে মাসে. আর তারপরে এই দেশে চিনের অবস্থান আরও মজবুত হয়েছে. বেজিং শ্রীলঙ্কাকে নিজেদের “মুক্তামালা” নীতিতে এক মূল্যবান শরিক বলেই মনে করে, যা তারা করতে চেয়েছে সামুদ্রিক বাণিজ্য পথে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় করার জন্য ও খনিজ তেল আর অন্যান্য কার্বন যৌগ নিকটপ্রাচ্য ও পূর্ব আফ্রিকা থেকে আনার পথকে বিপদমুক্ত করার জন্য. এছাড়া ভারতকেও সমুদ্র এলাকায় চারদিকে থেকে ঘিরে ধরার জন্য. ভারতের প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই রকমের অমিত্র সুলভ ব্যবহার শ্রীলঙ্কাকে আরও বেশী করেই চিনের সঙ্গে জোট গঠনে উদ্যোগী করতে পারে”.

এই ভাবেই তামিল রাজনীতিবিদদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করা শুধু ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে আসন্ন নির্বাচনের আগে কোন রকমের কৌশলগত লাভ তো করতে দেবেই না, বরং আরও বেশী করেই আগামী বছর গুলোর জন্য ভারতের স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানকে জটিল করে তুলতেই পারে বলে মনে করেন এই রুশ বিশেষজ্ঞ.