“ঠাণ্ডা যুদ্ধের” আরও এক সন্তান – এই ভাবেই এই ব্যবস্থার নাম দেওয়া যেতে পারে. যা তৈরী করা হয়েছিল আমেরিকার “স্পেস – শাটল্” এর প্রত্যুত্তরে, কারণ সেটা থেকে মস্কো শহরের উপরে মহাকাশের কক্ষপথ থেকেই পরমাণু বোমা ফেলা যেতে পারত. “বুরান” সেই কারণেই তৈরী করা হয়েছিল, যাতে দুটি অতি শক্তিধর দেশের পারস্পরিক ভাবে ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতায় ভারসাম্য রাখা যায়. এই কথা রেডিও রাশিয়াকে উল্লেখ করে রাশিয়ার মহাকাশ বিজ্ঞান একাডেমীর একাডেমিক আলেকজান্ডার ঝিলিয়েজনিয়াকভ বলেছেন:

““বুরান” তৈরী করা হয়েছিল সামরিক প্রয়োজনে খুবই ভারী মহাকাশ স্টেশন হিসাবে. সেই সব বছরগুলোতে মহাসমুদ্রের অপর পারে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক প্রতিরক্ষা উদ্যোগ বা “স্টার ওয়ার্স” উদ্যোগের প্রত্যুত্তরে এটা ছিল আমাদের দেশের একটা নিজস্ব ধরনের প্রচেষ্টা. আর যাতে একেবারেই নিজেদের প্রতিরক্ষার অভাব বোধ না হয়, তাই যদি আমেরিকার লোকরা মহাকাশে নিজেদের সামরিক আঘাত হানার ব্যবস্থাকে নিয়ে যায়, সেই কারণেই “বুরান” তৈরী করা হয়েছিল, সেটার প্রয়োজন হয়েছিল প্রত্যাঘাত করার জন্যেই”.

কিন্তু যখন বুরান উড়ানের জন্য প্রস্তুত হয়েছিল, তখন বিশ্বে পরিস্থিতি পাল্টে গিয়েছিল, মস্কো ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের মধ্যে একটা শৈথিল্য এসেছিল. এই ধরনের পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর লোকরা বহুবার মহাকাশে পাঠানোর উপযুক্ত ব্যবস্থার থেকে নিজেদের মনোযোগ সরিয়ে নিয়েছিলেন, আর অসামরিক মহাকাশ বিজ্ঞানের জন্য “বুরান” দেখা গিয়েছিল সাধ্যাতীত বলেই, তাই এই কথা উল্লেখ করে “মহাকাশ বিজ্ঞানের খবর” (“নোভস্তি কসমোনাভতিকি”) জার্নালের প্রধান সম্পাদক ইগর মারিনিন বলেছেন:

“পরবর্তী কালে যে “বুরান” আর ব্যবহার করা হয় নি, তার কারণ ছিল “বুরান” ও তা নিয়ে উড়ে যাওয়ার রকেটের উপযুক্ত প্রয়োজনীয় ওজন ও জ্বালানী নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিমাণে শক্তি ও ক্ষমতার অভাব পড়েছিল. রকেট – “এনার্জি” (“এনেরগিয়া”) রকেট “বুরান” ছাড়াই মহাকাশে ১০০ টন পর্যন্ত ওজনের উপগ্রহ পৌঁছে দিয়ে আসতে পারত. সেই ধরনের উপগ্রহ তৈরী করতে হয় দশ বছরেরও বেশী সময় ধরে আর “এনেরগিয়া” প্রতি মাসে কয়েকবার করে পাঠানোর উপযুক্ত ছিল. এমনকি “বুরান” পারত মহাকাশে ত্রিশ টন ওজনের উপগ্রহ পৌঁছে দিতে, কিন্তু সেই ধরনের উপগ্রহ কোথায় তখন পাওয়া যেতে পারত, তা জানা ছিল না”.

তার পরে নিজেদের বহুবার মহাকাশে উড়ে যাওয়ার ব্যবস্থা থেকে আমেরিকার লোকরাও পিছিয়ে গিয়েছিল. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে “স্পেস- শাটল্” ব্যবস্থাকে দেখাতে চাওয়া হয়েছিল একেবারেই সবচেয়ে সস্তা ও ভরসাযোগ্য উপায়, যাতে মহাকাশে প্রয়োজনীয় ওজন পৌঁছে দেওয়া যায়, কিন্তু তা কাজের সময়ে দেখা গিয়েছিল, খুবই দামী ও খুবই কম ব্যবহারযোগ্য.

“বুরানের” ভাগ্যও ছিল খারাপ. নিজের প্রথম ও একমাত্র উড়ান শেষ করার পরেই, তা পৃথিবীতেই রয়ে গিয়েছিল. কিন্তু সেই বৈজ্ঞানিক ক্ষমতা, যা “বুরান” তৈরীর সময়ে পাওয়া সম্ভব হয়েছিল, সেই সমস্ত আবিষ্কার ও সৃষ্টি, যা তাদের উপযুক্ত সময়ের আগেই তৈরী করা সম্ভব হয়েছে, তা অবশ্যই আমাদের দেশের মহাকাশ বিজ্ঞানে নিজেদের ব্যবহারের উপযুক্ত জায়গা করে নেবে, এই ধরনের বিশ্বাস নিয়ে একাডেমিক আলেকজান্ডার ঝিলিয়েজনিয়াকভ বলেছেন:

“অনেক কিছুই, যা তখন করা সম্ভব হয়েছিল, তা সময়ের সঙ্গে প্রয়োজন পড়বে. আমরা চাইব, যেন এটা তাড়াতাড়িই হয়. ভবিষ্যতে মহাকাশ যান তৈরীর সময়ে নিশ্চয়ই “বুরান” তৈরীর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো হবে. সেটা কতটা হবে – তা একমাত্র ভবিষ্যতই বলে দেবে. কিন্তু এই সমস্ত আবিষ্কার ও ক্ষমতা কখনই নষ্ট হবে না”.

আমরা এটাকে আরও মনে রাখব আমাদের ঐতিহাসিক বিগত সময়ের অবদান বলেই নয়, বরং মহাকাশ বিজ্ঞানের নতুন ধরনের প্রযুক্তির এক পথের দিশারী হিসাবেই, যোগ করে বলেছেন আলেকজান্ডার ঝিলিয়েজনিয়াকভ.