সম্পূর্ণ রকমের খোলা নয় এমন সব প্রশাসনের, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসা ও এমনকি ইতালির মাফিয়াদেরও এবারে সাবধান হতে হবে: জুলিয়ান আসাঞ্জের ফাঁস করে দেওয়া সাইট উইকিলিক্স এবারে বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করেছে. বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, আর যাতে এই ধরনের সাইট না বাড়ে, এবারে তাই সরকারি সংস্থাগুলোকে আরও বেশী করেই উন্মুক্ত হতে হবে ও বাক স্বাধীনতাকে ইন্টারনেটে শ্বাসরোধ করার চেষ্টা পরিহার করতে হবে. তা না হলে ইন্টারনেট সমাজের কাছ থেকে শুধু স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াই পেতে হবে.

উন্মুক্ত সমাজ ও প্রশাসনের মধ্যে দড়ি টানাটানি ছিল, আছে আর বোধহয় ভবিষ্যতে থাকবেও, এই কথা “রেডিও রাশিয়াকে” বলেছেন রাজনীতিবিদ আলেকজান্ডার গুসেভ. যে কোন প্রশাসনেরই অবশ্য খোলা ও গোপনীয় তথ্য আছে, যা একেবারেই স্বাভাবিক ও ন্যায্য. তার মধ্যে তফাত শুধু গোপনীয়তার পরিমানের. প্রায়ই এই ধরনের গোপনীয়তা একটু বাড়িয়ে করা হয়ে থাকে, এই রকম মনে করে তিনি বলেছেন:

“প্রশাসন সবসময়েই চেষ্টা করে থাকে যাতে নিজেদের তথ্যের নিরাপত্তা বজায় রাখা যায়. এটা কি ধরনের পদক্ষেপ হতে পারে? এটা হতে পারে সাইট বন্ধ করে দেওয়া. এটা হতে পারে সেই সমস্ত লোকদের সঙ্গে লড়াই, যারা খুবই সক্রিয়ভাবে নিজেরা কাজ করতে চায়. এটা হতে পারে নানারকমের বাধা ও পরিশোধনের ব্যবস্থা করা, যাতে লোকে তথ্যের একটা নির্দিষ্ট অংশ না পায়. এটা অতিরিক্ত রকমের গোপনীয়তা রক্ষা ও খুবই বেশী করে বন্ধ থাকা. অবশ্যই প্রশাসন হাত জোড়া করে বসে থাকবে না”.

বিশ্ব জোড়া ইন্টারনেটের জালের শেষ পাওয়ার মধ্যে – ইতালির সাইট মাফিয়ালিক্স জুটেছে. নভেম্বর মাসের শুরুতে তা ইতালির ও ইংরাজী ভাষায় আত্মপ্রকাশ করেছে. এটা এক রকমের বৈদ্যুতিন লেটারবক্স যাতে মাফিয়ার শিকার হওয়া লোকরা তাদের নিজেদের অভিযোগ ও বেনামে সাক্ষ্য, অপরাধ সম্বন্ধে খবর দিতে পারে, আর একই সময়ে সাংবাদিকদের করা তদন্ত সম্বন্ধেও খবর রাখার জায়গা. বলা দরকার যে, এই সাইট যারা বানিয়েছে – তাদের খুবই সাহস আছে, কারণ একটা বিষয় হল প্রশাসনের কাজ কারবার নিয়ে গোপন খবর ফাঁস করে দেওয়া, আর একেবারেই অন্য বিষয় হল মাফিয়াদের সম্বন্ধে খবর দিতে যাওয়া. শেষোক্ত লোকরা কখনই নিজেদের যারা ক্ষতি করেছে, তাদের সম্বন্ধে আদালতে অভিযোগ করতে যাবে না. তা ধুয়ে দিয়েছে আজ অবধি সাধারণতঃ রক্ত দিয়েই. এই সাইট যারা চালাচ্ছে ও তৈরী করেছে, তাদের সংখ্যা মাত্র দশজন. তারা নিরাপত্তা নিয়েও ব্যবস্থা নিয়েছে: এই সাইটে ঢোকা এমনভাবে কোড তৈরী করে করা যে, কে এটা নিয়ন্ত্রণ করছে, তা নাকি জানাই সম্ভব নয়. এখানে যারা সাইটের “অতিথি”, তারাও বেনামে ঢুকতে পারে ও তাদের ঠিকানা এখানে নথিভুক্ত করা হয় না. বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন যে, এই সাইট ভেঙে ফেলা – এটা স্রেফ সময়ের ব্যাপার.

২০১১ সালের জানুয়ারী মাস থেকে ইন্টারনেট ক্ষেত্রে উইকিলিক্স সাইটের মতো একটা একই রকমের সাইট উদ্ভব হয়েছে, ফাঁস করে দেওয়ার সাইট ওপেনলিক্স. তা উদয় হয়েছে বাস্তবে উইকিলিক্স ভেঙে গিয়েই. একদল বিশারদ যারা আসাঞ্জের উইকিলিক্স সাইট ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছেন সেই সাইট চালানোর সঙ্গে একমত না হতে পেরে, তারাই এই ওপেনলিক্স সাইট বানিয়েছেন – বলা যেতে উইকিলিক্স শুধু কিছুটা নরম করে. সেখানে কোন গোপন দলিল প্রকাশ করা হয় না, বরং এটা একটা মঞ্চ, যাতে ব্যবহারকারীরা নিজেদের তথ্য নিয়ে নাম প্রকাশ না করেই দেওয়া নেওয়া করতে পারেন.

নিজেদের প্রশাসনের সব ধাপের, তা সে কেন্দ্রীয় সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, নাগরিক পরিষেবা অথবা ব্যবসায়ের কাজকর্মে অসন্তুষ্ট মানুষদের “হুইসল” বাজানোর সাইট তৈরীর একটা ধূম পড়ে যাওয়া আসলে অন্যভাবে প্রমাণ করে দেয় যে এই সব কাঠামো খুব বেশী করেই নিজেদের বন্ধ হয়ে থাকা ও গোপনীয়তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাইছে. তার ওপরে যারা ফাঁস করে দিচ্ছে, তাদের জন্যও আইন সম্মত ভাবে কোন সুরক্ষার বন্দোবস্ত নেই. এই বছরেই সরকারি, ব্যবসায়ী অথবা পৌর সভার মতো সব সংস্থায় বহু শত লোক দুর্নীতির, চুরির অথবা ক্ষমতার অপব্যবহারের খবর ফাঁস করে দেওয়ার জন্য যেখানে তারা কাজ করতেন, সেই কাজ থেকে ছাঁটাই হয়ে গিয়েছেন.

কিছু রুশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে, সরকারি খবর ফাঁস করে দেওয়ার বিষয়ে সাবধানেই কাজ করা দরকার. এখানে এক ধরনের সমঝোতা করার দরকার রয়েছে, কারণ মোটেও সমস্ত রকমের খবর প্রকাশ করার দরকার নেই. এই কথা “রেডিও রাশিয়াকে” উল্লেখ করে বিখ্যাত রুশ রাজনীতিবিদ সের্গেই মিখিয়েভ বলেছেন:

“একটিও রাষ্ট্র যেমন অতীতে, তেমনই এখন আর ভবিষ্যতেও বিভিন্ন রকমের গোপন তথ্য ছাড়া টিকতে পারে না. একেবারে সমস্ত খবর উন্মুক্ত করে দেওয়াও বিপজ্জনক হতে পারে. তথ্য, যা প্রশাসনের পকেট থেকে তুলে নেওয়া হচ্ছে, তা যে কেউই ব্যবহার করতে পারে. এই বিশ্বে ভাল লোকের মত অনেক খারাপ লোকও আছে. তারা এই ধরনের খবর একেবারেই ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যবহার করছে না আর করবেও না. এখানে ভারসাম্য আর এক ধরনের সমঝোতার প্রয়োজন আছে”.

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তাতে খুবই অবাক হওয়ার মতো খবর দিয়েছে. দেখা গিয়েছে যে, ইউরোপীয় সঙ্ঘের ২৭টি দেশের মধ্যে শুধু চারটি দেশেই কর্তাদের পিছনে লাগা থেকে রেহাই পাওয়ার মতো কার্যকরী আইন রয়েছে. যদি সেই ধরনের আইন সর্বত্র ও সফল ভাবে কাজ করত, তাহলে ট্রান্সপারেন্সি বিশেষজ্ঞরা বিশ্বাস করেন যে, অনেক দুর্নীতি সংক্রান্ত স্ক্যান্ডাল ও প্রযুক্তি জনিত দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হত. আর তার মানে হল যে, বহু শত কোটি অর্থ ও বহু শত লোকের প্রাণও রক্ষা করা সম্ভব হত.