এক সময়ে মোদীকে আমেরিকায় প্রবেশের ভিসা দিতে অস্বীকার করা হয়েছিল ২০০২ সালে তাঁর রাজ্য গুজরাটে মুসলমানদের উপরে দাঙ্গা করার সময়ে যোগাযোগের সন্দেহে. আজ কিন্তু ওবামা প্রশাসন ও তাঁর বিরোধী রিপাব্লিকান দলের লোকরা বুঝতে দিচ্ছেন যে, সমস্যা আসলে অনুপস্থিত, আর যদি মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচিত হন, তবুও দুই দেশের সম্পর্ক এখনকার মতই ঘনিষ্ঠ থাকবে. কিন্তু সরকারি মুখপাত্ররা যাই বলুন না কেন, ভারতের প্রশাসনে বিজেপি দলের আবির্ভাব হলে, ওয়াশিংটনের “ভারতীয় রাজনীতিতে” নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হতেই পারে, এই রকম মনে করে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“বিরোধী দল জনতা পার্টির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদী এখন মোটেও আমেরিকার নিষিদ্ধ ব্যক্তিদের তালিকায় নেই, বরং তিনি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক পছন্দের অতিথি হয়েছেন. আমেরিকার রাজনীতিবিদরা তৈরী আছেন তাঁর সঙ্গে কাজ করার জন্য, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের উপরে অপেক্ষা না করেই, এই কথা ঘোষণা করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে রিপাব্লিকান পার্টির সদস্যা কেটি ম্যাকমরিস রজার্স. তিনি মার্কিন সেনেটে প্রভাবশালী রিপাব্লিকান কনফারেনসের প্রধান. তিনি ঘোষণা করেছেন যে, “আমি আপনাকে ভারতীয় জনতা পার্টির পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য বাছাই হওয়ার জন্য অভিনন্দন জানাতে চাই” আর মোদীকে ভারতীয় বিরোধী দলের নেতা হিসাবে ভিডিও আলাপে আমেরিকার কংগ্রেস সদস্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের প্রতিনিধিদের প্রতি বক্তব্য জানাতে আহ্বান করেছেন”.

এই প্রসঙ্গে তোমিন আবার বলেছেন:

“বিশেষ করে মনোযোগ দেওয়ার বিষয়ে ইঙ্গিত, যা দিয়ে আজ মোদীকে আমেরিকার রাজনীতিবিদরা ঘিরে ধরেছেন – তা একটা সুদূর লক্ষ্য করেই পদক্ষেপ, সবার আগে, এই ধরনের ইঙ্গিত করা হয়েছে একটা ভুল ধারণাকে ঢাকা দিতে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রয়েছে যখন থেকে মোদীকে সেই সমস্ত লোকদের তালিকায় রাখা হয়েছে, যাঁদের আমেরিকায় ঢোকা নিষেধ. মোদীকে আগে দেওয়া মার্কিন ভিসা প্রত্যাহার করা হয়েছিল ইমিগ্রেশন ও ন্যাশনালটি অ্যাক্ট প্রয়োগ করে, যে আইন আমেরিকায় প্রবেশ আটকানোর জন্য ব্যবহার করা হয় সেই সব বিদেশী রাজনীতিবিদদের দেশে প্রবেশ করা নিয়ে, যাদের নামে মানুষের অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ রয়েছে”.

যদিও মোদীর সেই সময়ে হিন্দু ও মুসলমানদের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় সরাসরি যোগাযোগের প্রমাণ এখনও করা সম্ভব হয় নি, তবুও আজ অবধি সেই সময়ে মোদীর নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে কিছু দ্বর্থ্যবোধক ধারণা রয়েই গিয়েছে.

এই ধরনের ব্যাপারের উপরে জোর দেওয়া নিয়েই কয়েকদিন আগে বিজেপির এক নেতা শত্রুঘ্ন সিনহার বক্তব্য শোনা গিয়েছে. তিনি জোর দিয়েই বলেছেন যে, মোদী নির্বাচিত হলে ওয়াশিংটন বাধ্য হবে তাঁকে ভিসা দিতে, “কারণ সেই ধরনের পরিস্থিতির কথা ভাবাই যায় না, যখন অন্য দেশের প্রধানমন্ত্রীকে ওয়াশিংটন ভিসা দিতে অস্বীকার করেছে”. এই প্রসঙ্গে শত্রুঘ্ন সিনহার বক্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে যে, তাঁর দল “আমেরিকার প্রতি সমস্ত রকমের শ্রদ্ধা ও মর্যাদা বোধ থাকা স্বত্ত্বেও তাদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত না হতেও পারে”.

নিজের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি ওবামার প্রশাসন তাঁর এক “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক” প্রতিনিধিকে দিয়ে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমকে শান্ত করেছেন যে, সংবাদ মাধ্যমেই মোদীকে আমেরিকার ভিসা দেওয়ার প্রসঙ্গকে অহেতুক ফুলিয়ে তোলা হয়েছে, বাস্তবে আমেরিকায় আসা নিয়ে মোদীর কোন অসুবিধাই নেই.

সব দেখে শুনে মনে হয়েছে যে, সেই রকমই হতে চলেছে. বাস্তবে, কোন ভাবেই চিন্তা করা যায় না যে, বিশ্বের “সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষের গণতন্ত্রের” দেশের নেতা বিশ্বের “নেতৃত্ব দেওয়া গণতন্ত্রে” প্রবেশের অধিকার রাখবেন না. সেই ধরনের চিত্রনাট্য একেবারেই আশ্চর্যজনক লাগবে. কিন্তু বিজেপি দলের ভেটেরান শত্রুঘ্ন সিনহা শুধুশুধুই ইঙ্গিত করেন নি যে, নরেন্দ্র মোদী আমেরিকা যাওয়ার ইচ্ছা নি য়ে খুব একটা আগ্রহী নন, আর বিজেপি দল ওয়াশিংটনের সাথে বহু প্রশ্নের ক্ষেত্রেই একমত না হওয়ার অধিকার নিজেদের হাতেই বজায় রাখছে, তাই আবার করে সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“আজকে ওয়াশিংটনের সরকারি মুখপাত্ররা যাই বলুন না কেন, বিজেপি কিন্তু ভারতের চিরন্তন মূল্যবোধের দোহাই দিয়ে আমেরিকা ও তাদের রাজনীতির প্রতি সমালোচনাই করেছে. এর উদাহরণ যথেষ্টই রয়েছে. সিরিয়া সঙ্কটের সব থেকে জোরে জ্বলে ওঠার সময়ে বিজেপি ও বামপন্থী বিরোধী দলেরা মনমোহন সিংহের সরকারকে প্রাথমিক ভাবে ওবামার নীতি হিসাবে গৃহীত সিরিয়াতে সামরিক অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে যথেষ্ট কড়া অবস্থান না নেওয়ার জন্য অনেক সমালোচনা করেছে”.

আরও একটি উদাহরণ হতে পারে ২০১০ সালে জ্বলে ওঠা এক অভূতপূর্ব স্ক্যান্ডাল, যা হয়েছিল মনমোহন সিংহের সরকারের পরিকল্পিত নীতি অনুযায়ী দেশের বাজারে আমেরিকার থেকে আনা জিনের স্তরে পরিবর্তিত মনস্যান্টো কোম্পানীর বেগুন বিক্রী করা নিয়ে. এর প্রতিবাদে তখন বিজ্ঞানী, চাষী, বেসরকারি জন সহায়ক সংস্থার প্রতিনিধিরা ও বিজেপি দল একজোট হয়েছিল. তাদের মতে এই নতুন খাবার ভারতের বহু লক্ষ মানুষের জন্য মৃত্যুর সমান হয়ে দাঁড়াবে আর বিরোধী পক্ষ সরকারকে দোষ দিয়েছিল যে, সরকার ভারতের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থে তৈরী হয়েছে বিক্রী করে দিতে.

এই ভাবেই, ভারতের প্রশাসনে নরেন্দ্রে মোদীর উদয় হলে ওয়াশিংটনের ভারত সংক্রান্ত রাজনীতিতে নতুন করে সমস্যা যোগ হয়ে যেতে পারে. মোদীকে শুধু একটা দেশে ঢোকার ভিসা দিয়ে আমেরিকা এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না.