আমেরিকার ড্রোন বিমান থেকে আঘাত, যা পাকিস্তানের এলাকায় লক্ষ্য করে করা হয়েছে, তা অনেকদিন আগে থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে মুখ্য সম্পর্ক খারাপের কারণ হয়েছে. মে মাসের নির্বাচনে নওয়াজ শরীফের বিজয়ের পরে ও বিশেষ করে তাঁর এই বছরের অক্টোবর মাসে ওয়াশিংটন সফরের পরে মনে হয়েছিল যে, দুই পক্ষই একে অপরের দিকে এগিয়ে আসতে তৈরী হয়েছে. সরকারি ভাবে পাকিস্তানের সরকার এমনকি ঘোষণাও করেছিল যে, আগে এই ধরনের আঘাতের ফলে দেশের নিরীহ মানুষদের নিহত হওয়ার সংখ্যা বাড়িয়ে বলা হয়েছে, আর আসলে অনেক কম সংখ্যায় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন.

আর ঠিক তখনই নতুন করে আঘাত হানা হয়েছে. ১লা নভেম্বর পাকিস্তানের তালিবান দলের নেতা হাকিমুল্লা মেহসুদ নিহত হয়েছে. এই ঘটনার প্রভাব প্রায় সেই রকমেরই হয়েছে, যা ২০১১ সালের মে মাসে ওসামা বেন লাদেনের আমেরিকার ড্রোন আঘাতে নিহত হওয়ার পরে হয়েছিল – বেশীর ভাগ পাকিস্তানের লোকদের ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে. এমনকি বিরোধী দল নেতা ও এক প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ইমরান খান দাবী করেছিলেন দেশের ভিতর দিয়ে “দক্ষিণের পথে” আফগানিস্তানে থাকা ন্যাটো জোটের সৈন্যদের জন্য রসদ যাওয়া বন্ধ করে দেওয়ার, যা আগেও ২০১১ সালে একবার করা হয়েছে, সেই আমেরিকার তরফ থেকে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর উপরে ড্রোন বিমান আঘাত হানার পরে, তাই ভলখোনস্কি বলেছেন:

“পরিস্থিতি আসলেই খুব পরস্পর বিপরীত ও তার কোনই একমাত্র সমাধান নেই. ওসামা বেন লাদেন ও হাকিমুল্লা মেহসুদ যে দুজনেই সন্ত্রাসবাদী – তা নিয়ে কোনও বিতর্ক চলতে পারে না. কিন্তু আমেরিকার সেনা বাহিনীও এখানে একই ভাবে তাদের সঙ্গে কোন রকমের মান মর্যাদার অপেক্ষা না করে সন্ত্রাসের পথেই তাদের হত্যা করেছে, তার ওপরে পাকিস্তান যে, সন্ত্রাসবাদীদের হলেও একটা সার্বভৌম রাষ্ট্র, সেটাকেও ওয়াশিংটনে আর পাত্তা দেওয়া হয় না, যদিও আমেরিকা এখনও সেখানের প্রশাসনকে মনে করে নিজেদের শরিক বলেই”.

মেহসুদের মৃত্যু আরও একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে. যতদিন সে জীবিত ছিল, ততদিন চেষ্টা হচ্ছিল দেশে নওয়াজ শরীফের দলের সঙ্গে তাদের দলের একটা বোঝাপড়া করে নিয়ে আপাতঃ শান্তি ও কল্যাণের ব্যবস্থা করার. কিন্তু সে মারা যাওয়ার পরে এই ধরনের আশার গুড়ে বালিই হয়েছে. এবারে সেই দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছে আরও ভয়ঙ্কর এক সন্ত্রাসবাদী রেডিও মোল্লা ফজলুল্লা, যার শুধু এই প্রশাসনের সঙ্গে কোন রকমের শান্তি আলোচনার বসার ইচ্ছাই যে শুধু নেই, তা নয়, সে আবার বহু শত, এমনকি হতে পারে, বহু সহস্র নিরীহ মানুষের হত্যাকারী, যাকে সেই আরব দুনিয়া থেকেই অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য দেওয়া হয়েছে. প্রসঙ্গতঃ এই আরব দুনিয়াও সেই আমেরিকারই বন্ধু, যারা সিরিয়া ও মধ্য প্রাচ্যে যুদ্ধের মূল অর্থ জোগান দিয়ে চলেছে. এই ফজলুল্লার হাত থেকে মালালা ইউসুফজাই নামের ছোট্ট মেয়েটিও রেহাই পায় নি, তার দোষ ছিল যে, সে পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকা জুড়ে এই তালিবদের মধ্যযুগীয় নৃশংস শাসনের নামে অত্যাচারের সময়ে মেয়েদের পড়াশোনার অধিকার সম্বন্ধে একটি ব্লগে লিখেছিল. ফজলুল্লার লোকরা তাকে খুন করতেই চেয়েছিল.

আর এবারে সন্ত্রাসবাদীদের মূল অর্থের জোগানদার নাসিরুদ্দীন হাক্কানির মৃত্যু, যাদের দলও সেই তেহরিক-এ-তালিবান পাকিস্তান দলের সঙ্গে যুক্ত. সেই মৃত্যুও হয়েছে খুবই অস্পষ্ট এক পরিস্থিতিতে – সঠিক করে হত্যার জায়গাই জানা যাচ্ছে না: কেউ বলছে ইসলামাবাদে, আবার কেউ বলছে প্রজাতি অধিকৃত এলাকায় অথবা আফগানিস্তানে. তাই ভলখোনস্কি যোগ করে বলেছেন:

“সে যাই হোক না কেন, এই হত্যা জাতীয় শান্তি প্রক্রিয়াকে পাকিস্তানে আরও কমই সম্ভাব্য করে দিয়েছে. তাই প্রশ্নের উদয় হয়: কার জন্য এটা দরকার? এটা স্পষ্ট যে, এর থেকে সমান ভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পাকিস্তানের নিরীহ মানুষ ও মুসলিম লীগের সরকার. এবারে পাকিস্তানের মানুষরা আরও আতঙ্কিত হবে কোথায় আবার কখন সন্ত্রাসের ঢেউ উঠবে অথবা আকাশ থেকে ড্রোন বিমানের আঘাত নেমে আসবে তা নিয়ে, আর সরকার বুঝতে পারবে না, কি করে দেশের লোকদের মন জয় করা সম্ভব হয় আর একই সঙ্গে নিজেদের জন্য একমাত্র অর্থের উত্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেও সন্তুষ্ট রাখা সম্ভব হবে”.

এই পরিস্থিতি শুধু সেই দিকেই নিয়ে যাচ্ছে, যখন নওয়াজ শরীফের প্রশাসনের পক্ষ সম্ভব হবে না কোন রকমের আত্মনির্ভর রাজনীতি করার অথবা কোন স্ট্র্যাটেজিক নীতি নিয়ে চলার.