১৫ থেকে ১৭ই নভেম্বর কলম্বো শহরে হতে যাওয়া কমনওয়েলথ সামিট যতই এগিয়ে আসছে, ততই বেশী করে ঘটনার ঘনঘটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, যা এই সামিটের জন্য তৈরী করা চিত্রনাট্য অনুযায়ী একেবারেই হচ্ছে না. যখন এক মাস আগে কমনওয়েলথ সামিট বয়কটের কথা কানাডার প্রধানমন্ত্রী স্টিভেন হার্পার বলেছিলেন, তখন মনে হয়ে থাকতে পারে যে, তাঁর অবস্থান একক রাজনৈতিক ইঙ্গিত বলেই.

কিন্তু সামিটের একেবারে হাতে গোনা দিন আগেই শ্রীলঙ্কার সরকার তাঁদের আত্ম মর্যাদার উপরে আরও বেশী গুরুতর এক আঘাতই পেয়েছে. কলম্বো না যাওয়া নিয়ে নিজের সিদ্ধান্তের কথা শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি মাহিন্দা রাজপক্ষেকে জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ. আবার তার ওপরে ভারত – এটা দক্ষিণ এশিয়ার এক নেতৃস্থানীয় বৃহত্ রাষ্ট্র ও অনেক ক্ষেত্রেই এই বিশাল এলাকায় তারাই রাজনৈতিক আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে. আর যদিও কানাডার প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে আলাদা ভাবে অর্থাত্ শ্রীলঙ্কার সরকারকে খোলাখুলি ভাবেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ করার বদলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শুধু চুপ করেই থেকেছেন, তবুও একজন রাজনীতিবিদ অথবা বিশেষজ্ঞও প্রমাণ করতে চাইবেন না যে, মনমোহন সিংহ কলম্বো যাচ্ছেন না, স্রেফ অন্যান্য অসুবিধার জন্যই, কোন রাজনৈতিক কারণে নয়. এই রকম মনে করে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“দিল্লী ও কলম্বোর সম্পর্ক বেশ কিছু দশক ধরেই নিজেদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানারকমের উত্থান ও পতন দেখেছে, কিন্তু আজ তা অনেক ক্ষেত্রেই মনে করিয়ে দিয়েছে দুই বধিরের আলোচনাকে. দিল্লী স্পষ্টতঃই এই দ্বীপে দীর্ঘদিন ধরে চলা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিষয়ে স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত না হওয়াতে মোটেও কোন রকমের উত্সাহ প্রকাশ করছে না, এমনকি শ্রীলঙ্কায় বর্তমানে সংখ্যালঘু তামিলদের পরিস্থিতি নিয়েও কিছু আনন্দিত হওয়ার মতো খুঁজে পাচ্ছে না”.

দিল্লী শ্রীলঙ্কার সরকারকে আহ্বান করেছে “তামিল সমস্যাকে” শেষ হয়ে যাওয়া বলে মনে না করতে. কারণ সেই দেশের উত্তর পূর্ব এলাকায়, যেখানে বেশী করেই তামিল সংখ্যালঘুরা রয়েছেন, সেখানে আরও বেশী করে স্বয়ং শাসনের সুযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া আজও সম্পন্ন হয় নি. আর এটা আবার সেই ক্ষেত্রে যে, প্রায় পঁচিশ বছর আগে সেই ১৯৮৭ সালে তামিল- সিংহলী বিরোধের সবচেয়ে বেশী করে জ্বলে ওঠার দিনগুলোতে স্বাক্ষরিত হওয়া তথাকথিত “কলম্বো চুক্তি” – যা ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে হয়েছিল – তাতে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছিল যে, তামিল অধ্যুষিত এলাকা গুলোতে প্রাদেশিক সভা তৈরী করতে দিতে হবে, তাই এই প্রসঙ্গে সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“এই দ্বীপে জাতীয় শান্তির সমস্যা সমাধানের জন্য দুই দেশের অবস্থানকে কাছে আনার জন্য সেখানের উত্তর পূর্বের এলাকা গুলোকে, যেখানে সংখ্যালঘু তামিলরাই আছেন, সেখানে বেশী করেই স্বয়ং শাসনের সুযোগ দেওয়ার প্রচেষ্টা একের পর এক বারই শেষ হয়েছে অসফল ভাবেই. শেষ এই ধরনের চেষ্টা হয়েছে এই বছরের গ্রীষ্মে. কলম্বো সফরে গিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় নিরাপত্তা পরামর্শদাতা শিবশঙ্কর মেনন শ্রীলঙ্কার সরকারকে আহ্বান করেছিলেন এই দ্বীপের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে নিজেদের দায়িত্ব না এড়িয়ে যাওয়ার জন্য. কিন্তু শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি মাহিন্দা রাজপক্ষে তখন ভারতের পরামর্শদাতাকে তাঁর পক্ষ থেকে খুবই ভদ্র ভাবে আপত্তি জানিয়েছিলেন. তিনি “ভারতের বড় ভাইকে” বুঝতে দিয়েছিলেন যে, সেখানে টাইগারদের উপরে বিজয়ের পরে জাতীয় শান্তির প্রশ্নে সমাধানের নীতি শুধু তিনি ও একমাত্র তিনি নিজেই নির্ণয় করবেন. কিন্তু তাহলে কি অবাক হওয়ার দরকার আছে যে, কমনওয়েলথ সামিটে কলম্বো শহরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ থাকছেন না বলে”?

শ্রীলঙ্কার জন্য আরও একটি অপ্রিয় চমক হতে চলেছে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের অবস্থান. তিনি তাঁর ভারতীয় সহকর্মীর চেয়ে আলাদা হয়েই কলম্বো যাচ্ছেন, কিন্তু ইতিমধ্যেই সাবধান করে দিয়েছেন যে, তিনি সেখানে “তামিল টাইগারদের” সঙ্গে “যুদ্ধের মূল্য” নিয়ে সেখানের সরকারের অপ্রিয় প্রসঙ্গ উত্তোলন করতে চলেছেন.

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর অবস্থা বোধগম্য. এই দ্বীপে ২৬ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক ভাবে তদন্তের বিষয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার সরকারের সহযোগিতা করতে না চাওয়া সমালোচনার ভিত্তি হয়েছে. রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব বান কী মুনের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, এই বিরোধের বলি হয়েছে চল্লিশ হাজারেরও বেশী মানুষ. কিন্তু এই বলির জন্য কে ও কবে দায়ভার নিতে বাধ্য হবে, আর কোনদিনও কি শ্রীলঙ্কাতে “ঐতিহাসিক বিচার” হবে – তা এখনও অস্পষ্টই থেকে যাচ্ছে.