আপাততঃ যখন বিশেষজ্ঞরা আতঙ্কের দামামা বাজাচ্ছেন, আর রাজনৈতিক নেতারা এর মধ্যেও নিজেদের রাজনৈতিক মূলধন খুঁজে পেতে চাইছেন, তখন মহেঞ্জোদরো দ্রুত গতিতেই ধ্বংস হয়ে যেতে চলেছে. হারিয়ে যাচ্ছে বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন, যা খুব সম্ভবতঃ, তারই প্রমাণ যে, আমাদের মানব জাতির ইতিহাস নিয়ে ধারণা খুব কম করে বললেও সম্পূর্ণ নয়.

সেখানের একসারি বাস্তব বিষয়কেই আজকের বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করে উঠতে পারছেন না. এটাই ভিত্তি দিয়েছে একদল গবেষককে মনে করার যে, মহেঞ্জোদরো খুব সম্ভবতঃ হিরোশিমা ও নাগাসাকির মতই পারমাণবিক বিস্ফোরণ থেকে ধ্বংস হয়েছিল. শুধু মহেঞ্জোদরো বিপর্যয় হয়েছিল বিংশ শতাব্দীতে নয়, বরং আজ থেকে হাজার পাঁচেক বছর আগেই...

যখন ১৯২২ সালে প্রত্নতত্ববিদরা মহেঞ্জোদরো খুঁজে পেয়েছিলেন, তখন তাঁদের জন্য খুব একটা কম রহস্য অপেক্ষা করে চিল না. সেখানের সব বাড়ীর দেওয়াল ও গ্র্যানাইট পাথর ঢাকা ছিল এক কাঁচের মতোই দেখতে আস্তরণ দিয়ে. এই ধরনের আস্তরণ তৈরী হয়ে থাকে শুধু মুহূর্ত কালের মধ্যে তাপমাত্রা প্রবল ভাবেই বেড়ে গেলে. গ্র্যানাইট পাথরের গলে যাওয়ার তাপমাত্রা দেড় হাজার ডিগ্রী, যা গলিত লাভার চেয়ে দেড়গুণ বেশী গরম. এমনকি আমাদের উচ্চ প্রযুক্তির যুগেও এই ধরনের তাপমাত্রা পাওয়া যেতে পারে হয় নাপাম বোমা ব্যবহার করে অথবা পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ফলে.

সেখান থেকে শহরের মধ্যে পাওয়া ৪৪জন মানুষের কঙ্কাল নিয়ে গবেষণা করে বিজ্ঞানীরা উপনীত হয়েছেন এমন এক ধারণায় যে, তাদের মৃত্যু হয়েছে একই সময়ে. তার ওপরে আবার এই সব লোকরা কোন স্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি করে ছিল না, দেখে মনে হয়েছে যে, তারা যেন কিছু একটা থেকে রক্ষা পেতে চাইছে. কিন্তু গবেষকদের সত্যিকারের চমক লেগেছিল, বুঝতে পেরে যে, এই লোকরা কোন অগ্নিকাণ্ড বা আঘাত থেকে নিহত হন নি, বরং এক বিপুল পরিমাণে হওয়া তেজস্ক্রিয় বিকীরণ থেকেই তাদের মৃত্যু হয়েছিল. সেই বিকীরণের মাত্রা হিরোশিমা ও নাগাসাকির লোকদের পাওয়া বিকীরণের চেয়ে বেশ কয়েকগুণ বেশীই ছিল.

সন্দেহ বাতিক লোকরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, এটা কোন খুবই বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড হতে পারে, যা একেবারেই বিরল ধরনের, যেমন বজ্রপাত থেকে আগুন অথবা কোন উল্কা পতনের ফলে.কিন্তু কোন বজ্রের শক্তি, কোন অগ্নিকাণ্ড, এমনকি যদি তা কয়েকদিন ধরেও হয়ে থাকে, তবে এত তাপমাত্রা তা দিতে পারে না, যাতে কিনা গ্র্যানাইট গলে যাবে. তার ওপরে আবার সম্পূর্ণ ভাবে রয়ে যাওয়া মানুষের কঙ্কালে কোন রকমের পুড়ে যাওয়ার চিহ্ন দেখতে পাওয়া যায় নি. মাটির রাসায়নিক বিশ্লেষণ বিচার করে দেখা গিয়েছে যে, এখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছিল মুহূর্তের মধ্যেই ও তা রয়ে গিয়েছিল মিনিট পাঁচেক.

মহেঞ্জোদরো – মৃতদের উপত্যকা – এই ভাবেই সিন্ধি ভাষায় এই জায়গার নামকরণ করা হয়েছিল. এখন আগ্রহের বিষয় হল যে, এই শহরকে এই বিপর্যয়ের আগে কি নামে ডাকা হত?

প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্য ও মহাকাব্যে খুব একটা কম রহস্যময় এক অস্ত্র নিয়ে বর্ণনা দেখতে পাওয়া যায় না. তা বিভিন্ন নামেই রয়েছে: “বজ্র”, “ইন্দ্রের অগ্নি”, “বিষ্ণুর তীর”, “ব্রহ্মার দণ্ড”. কিন্তু অস্ত্রের বর্ণনা বিভিন্ন রচনায় একই রকমের: “দশ সহস্র সূর্যের মত উজ্জ্বল এক বিস্ফোরণ”, “এক অগ্নিশিখা, যার কোন ধোঁয়া নেই”. প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতের সপ্তম সর্গে বলা হয়েছে যে, যারা এই বিস্ফোরণের হাত থেকে জলে ডুব দিয়ে প্রাণে রক্ষা পেয়েছিল – তারা পরে নখ ও কেশ হারিয়েছিল. খাদ্য সেই মুহূর্তেই নষ্ট হয়েছিল, আর আকাশ এর পরে বেশ কয়েক বছর ঢাকা পড়ে গিয়েছিল কালো মেঘে. মনে হয়েছে যে, এই সমস্ত স্মৃতি সাহিত্যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বর্ণনাই করা হয়েছে. পারমাণবিক বিস্ফোরণ খুবই উজ্জ্বল আলো ছড়ায়, আর আগুন থাকে কোন রকমের ধোঁয়া ছাড়াই. চুল ও নখ হারানো – এটা তেজস্ক্রিয়তা জনিত রোগের এক শেষ অধ্যায়. তেজস্ক্রিয় বিকীরণের শিকার হওয়া খাদ্য আর ব্যবহার যোগ্য থাকে না. তেজস্ক্রিয় বিকীরণের ফলে যে ধুলো বাতাসে ওড়ে, তা বিস্ফোরণের শক্তিতে আকাশের উঁচুতে উঠে, তারপরে মেঘ তৈরী করতে পারে, যা সূর্যের আলোকেও অনেক বছর ধরেই ঢেকে রাখতে পারে. বৈজ্ঞানিক রচনায় এটাকেই আজ বলা হয়ে থাকে “পারমাণবিক শীত”.

ডক্টর জে. রবার্ট ওপেনহাইমার, পারমাণবিক বোমার এক স্রষ্টা, “মহাভারতের” বর্ণনার সঙ্গে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের মিল দেখে আশ্চর্য হয়েছিলেন. প্রথমবার পরীক্ষার সময়ে তিনি এমনকি এই প্রাচীন ভারতীয় মহাকাব্য মহাভারতের বর্ণনা মুখস্থ বলতে শুর করেছিলেন: “যদি সহস্র সূর্য একত্রে বিস্ফোরিত হয় মহাকাশে, তবেই এই উজ্জ্বল আলোকের সঙ্গে তার কোন মিল খুঁজে পাওয়া যেতে পারে. আমিই এবারে বিশ্বের সমস্ত শক্তি পেয়েছি, আমিই এবারে বিশ্বের ধ্বংসকারী হয়েছি”.

এখনও সেই বিতর্কের কোন শেষ নেই যে, প্রাচীন ভারতীয়রা পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের সাক্ষী হয়েছিল. তবে একটা বিষয়ই স্পষ্ট: আমরা খুবই ভিত্তি মূলক বাস্তব উদাহরণ সামনেই দেখতে পাচ্ছি, যা এক অসম্ভব শক্তিশালী বিস্ফোরণের সৃষ্টি করেছিল, যা এক প্রাচীন সভ্যতাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল. আজ বলা যেতে পারছে না যে, এটাই ছিল পারমাণবিক বিস্ফোরণ. কিন্তু অন্যদিক থেকে উল্টো প্রমাণের জন্য কোন ব্যাখ্যাও আজ নেই.

যাতে ভবিষ্যতে আজকের গবেষকদের যে বিষয় ভাবিয়ে তুলেছে, তা নিয়ে কোন উত্তর খুঁজে পেতে হয়, তবে কম করে হলেও এই বিরল স্মৃতি বিজড়িত জায়গার ধ্বংস হয়ে যাওয়াকে রোধ করা দরকার.