“জেনেভা-২” যাঁরা ভেবে বের করেছেন, তাঁদের ধারণা অনুযায়ী রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া “জেনেভা- ২” সম্মেলনে রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের তিন স্থায়ী সদস্য দেশ (গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স ও চিন) অংশ নেবে, আর তারই সঙ্গে সিরিয়ার এই এলাকার প্রতিবেশী দেশরাও. কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘ, রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবারও এই সম্মেলনের দিনক্ষণ স্থির করে উঠতে পারে নি. পর্যবেক্ষকদের জন্য এই ধরনের মোড় ফেরা মোটেও আশ্চর্যজনক নয়.

রাশিয়া দামাস্কাসের পক্ষ থেকে এই সম্মেলনে সামিল হওয়ার বিষয়ে সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে – তার ওপরে সেটা আবার কোন রকমের আগাম শর্ত ব্যতিরেকেই. আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছুতেই সিরিয়ার বিরোধী পক্ষকে আলোচনার টেবিলে বসাতে সক্ষম হচ্ছে না. সিরিয়ার বিরোধীদের সেই দেশের ভেতরে সবচেয়ে মুখ্য গোষ্ঠী – সিরিয়ার স্বাধীন বাহিনী – এটা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর একটা না জোড়া লাগা জোট, যারা বিভিন্ন বিদেশী পৃষ্ঠপোষকদের সাহায্যের উপরে নির্ভর করে রয়েছে. তাদের কোন কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপরে নির্ভরতা – এটা স্রেফ আপাতঃ একটা ব্যাপার মাত্র. তাদের অনেকের জন্যেই কোন রকমের শান্তির দরকার নেই, এই কথা উল্লেখ করে রাজনীতিবিদ মিখাইল ত্রইতস্কি বলেছেন:

“জঙ্গীদের জন্যে শান্তি স্থাপনের আরও একটা অর্থ হল যে, বাশার আসাদের প্রশাসনকে মেনে নেওয়া ও ক্ষমতা দখলের লড়াই থেকে বিরত হওয়া. এটা তাদের একেবারেই দরকার নেই, তার ওপরে আবার সেই কারণেই যে, তাদের মধ্যে অনেকেই এই রকমের সশস্ত্র যুদ্ধ চলা থেকে নিজেদের জন্য অনেক রকমের লাভ আদায় করে নিচ্ছে”.

অন্য একটা কঠিন বিষয় হল – আরবের রাজতন্ত্রদের জন্য ও বাস্তবে তাদের বাধ্য সিরিয়ার বিদ্রোহীরা জেনেভা শহরে ইরানের প্রতিনিধিদলকে দেখতে চাইছে না – এই এলাকায় দামাস্কাসের প্রধান সহযোগী দেশকেই. বিরোধীদের প্রতিনিধিরা ঘোষণা করেছে যে, তারা “জেনেভা- ২” সম্মেলনে যোগ দেবে না, যদি সেখানে তেহরানের প্রতিনিধিদল থাকে.

কিন্তু ইরান ছাড়া এই আলোচনার প্রক্রিয়ার কোন অর্থও হয় না, এই রকম মনে করে মধ্য এশিয়া ও নিকটপ্রাচ্যের সমস্যা সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ সিমিওন বাগদাসারভ বলেছেন:

“ইরান খুবই গুরুতর ভাবে সিরিয়ার ঘটনার উপরে প্রভাব ফেলেছে, তাদের পক্ষ থেকে সিরিয়ার নেতৃত্বকে সামরিক প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিক সহায়তা দিয়েছে. যদি সেই সিরিয়ার বিরোধী পক্ষের ঘোষণাকেই মানতে হয়, তবে সিরিয়াতে ইরানের পক্ষ থেকে ষাট হাজার সৈন্য যুদ্ধ করছে. তাছাড়া, ইরান খুবই সক্রিয় ভাবে নিজেদের শিয়া সহযোগীদের উপরে ইরাকে প্রভাব ফেলছে. তাই ইরানের পক্ষ থেকে সমর্থন ছাড়া সিরিয়ার সমস্যা নিয়ে আলোচনা স্রেফ অর্থহীণ হয়ে যাবে”.

সব দেখে শুনে মনে হয়েছে এটাতেই “জেনেভা-২” এর যারা বিরোধী, তাদের ধান্ধা লুকিয়ে রয়েছে. কেন তারা এই রকম করছে – তা কম বেশী করে বোঝা যাচ্ছে. আরব রাজতন্ত্রগুলো গত দু’বছর ধরে সব কিছুই করেছিল, যাতে অন্যের হাত দিয়ে সিরিয়া প্রশাসনকে ধ্বসিয়ে দেওয়া যায়. এই লক্ষ্যে পৌঁছনো তাদের পক্ষে সম্ভব হয় নি. বাশার আসাদের প্রশাসনের লোকদের সঙ্গে একই টেবিলে আলোচনায় বসে নিজেদের হার স্বীকার করে নেওয়া, তাদের এখন আত্মগরিমা থেকেই সম্ভবপর মনে হচ্ছে না. আর সব দেখে শুনে মনে হচ্ছে যে, এখানে নিজেদের জন্য তারা একমাত্র বের হওয়ার পথ দেখতে পাচ্ছে: এই সঙ্কটকেই আরও বেশী করে জ্বালিয়ে তুলে, যাতে রাজনৈতিক ভাবে নিয়ন্ত্রণের সমস্ত উপায়কেই নস্যাত করা সম্ভব হয়. এটাই এখন তারা করছে আর এই দিয়েই তারা ওয়াশিংটনকে খুবই অসুবিধার মধ্যে ফেলে রেখেছে.

তাদের হিসাব, দেখাই যাচ্ছে যে, ওয়াশিংটন এই এলাকায় নিজেদের প্রধান জোটসঙ্গীদের সঙ্গে আলাদা হতে চাইবে না, এই ধারণার উপরেই ভিত্তি করে হয়েছে. ওয়াশিংটনও সত্যিই কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছে না ও আপাততঃ সময় পিছিয়ে দিচ্ছে. এখান থেকেই “জেনেভা-২” সম্মেলনে ইরানকে আসতে না দেওয়ার ব্যাপারে যুক্তিহীন সমর্থন এসেছে. কিন্তু অন্তহীণ ভাবে এই বিরতিকে ওয়াশিংটন নিজেদের মর্যাদার উল্লেখযোগ্য জলাঞ্জলি না দিয়ে প্রলম্বিত করতে পারবে না. আর যাতে এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য হোয়াইট হাউস এবারে কারও একটা মর্যাদার উপরে আচমকা আঘাত হানতেই পারে. আর, প্রসঙ্গতঃ, এই ধরনের ক্ষেত্রে, সাধারণতঃ সবচেয়ে নড়বড়ে পরিস্থিতিতে থেকে যায়, সেই সমস্ত ছোট জোট সঙ্গীরাই, যারা তাদের বড় ভাইকে এই ধরনের অসুবিধার পরিস্থিতিতে ফেলেছে.