বারাক ওবামা – রাজনৈতিক ভাবে সঠিক থাকার এক মূর্তিমান উদাহরণ, লিবারেল ভাবে ভাবিত হওয়া আমেরিকার লোকদের নিজেদের নেতা কি রকমের হওয়া উচিত্ তার এক প্রকৃষ্ট প্রতিরূপ. এক শ্যামলা বরণ, ঘোর সংসারী ও দারুণ প্রশিক্ষিত ও উজ্জ্বল রাজনৈতিক উন্নতির প্রতিভূ. তাঁর নিজেরই কথায় – একজন খ্রীষ্ট ধর্মে বিশ্বাসী, যাঁর পূর্বপুরুষরা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাস করতেন. আবার তার উপরে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী. এক কথায় সম্পূর্ণ রকমের ভদ্রলোক উচিত গুণাবলীর সমন্বয় যা এত বিভিন্ন রকমের ও এতই রাজনৈতিক ভাবে দাবী থাকা আমেরিকাকে দীর্ঘ সময় ধরে সঠিক শাসনের জন্য একান্তই প্রয়োজন.

বারাক ওবামাকে তাঁর নতুন মেয়াদ নতুন “বিপদই” নিয়ে এসেছে. মনে হতে পারত যে, একেবারেই অসফল হওয়া ও আন্তর্জাতিক অধিকার সংক্রান্ত নীতি নস্যাত করে দেওয়া ইরাক ও আফগানিস্তানের অপারেশন শেষ করানোতে তাঁর রাজনৈতিক পয়েন্ট বাড়ারই কথা ছিল. কিন্তু সেখানেই সমস্যা হয়েছে. বারাক ওবামার দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতিত্বের মেয়াদের সময়ে আন্তর্জাতিক কাজ কারবারের দিকটিকে রাশিয়ার বিজ্ঞান একাডেমীর পরামর্শদাতা ভিলেন ইভানভ বিশ্লেষণ করে বলেছেন:

“এখানে তাঁর কিছু নিয়ে প্রশংসা পাওয়ার উপায় নেই. সিরিয়া নিয়ে যা হয়েছে, তা দেখিয়ে দিয়েছে যে, তিনি শান্তি স্থাপনের আশ্বাস থেকে বহু দূরে রয়েছেন, যা এক সময়ে নোবেল কমিটিকে উদ্যত করেছিল তাঁকে এই প্রসঙ্গে পুরস্কৃত করার জন্য. আন্তর্জাতিক ভাবে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিফল প্রচেষ্টা বলে দিচ্ছে যে, এই রাজনীতি কম করে হলেও অদূরদর্শী”.

এখানে বারাক ওবামার, যাঁকে কয়েকদিন আগে “ফোর্বস” জার্নালের মতানুযায়ী রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন দ্বিতীয় স্থানে হঠিয়ে দিয়েছেন বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী লোকেদের রেটিংয়ে, তাঁর এই রুশ সহকর্মীকেই “ধন্যবাদ” জানানোর কথা. কারণ বাস্তবে, সেই পুতিনের উদ্যোগেই সিরিয়াতে রাসায়নিক অস্ত্র নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে, যা এই দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের একটা বিকল্প হতে পেরেছে ও ওবামার পক্ষে সম্ভব হয়েছে, বলা যেতে পারে অনিবার্য ভাবেই ডেমোক্র্যাট ও রিপাব্লিকানদের মধ্যে একটা চরম বিরোধ বন্ধ করার. আর এটাই একটা সম্পূর্ণ মাপের রাজনৈতিক সঙ্কটে পরিণত হতে পারত, যার তথাকথিত পরিণতি হতে পারত বিপর্যয়কর.

এক সার্বভৌম দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে মার্কিন হস্তক্ষেপের সম্বন্ধে বহু লোকের মতানুযায়ী সেই পরিণতিকে মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে. এখানে কথা হচ্ছে গত হেমন্তে লিবিয়ার বেনগাজী শহরে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টোফার স্টিভেন্সের হত্যাকাণ্ড. এই নাটকীয় বাস্তব আর তারই সঙ্গে বস্টন শহরের সন্ত্রাসবাদী কাণ্ড, একেবারে খুলে ধরেছে মার্কিন গুপ্তচর বাহিনীর বাস্তব জীবনের ক্ষেত্রে নিষ্ফলতাকে, কোন ভার্চুয়াল জীবনে নয়.

আর সেই আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমেরিকার নেতার জন্য অপেক্ষা করেছিল খুবই অপ্রিয় চমক. খুবই অসফল বাজেট-বিনিয়োগ নীতি, যা সেই আগের মতই নির্ভর করে রয়েছে কোন রকমের ভিত্তি ছাড়াই একটা অনিয়ন্ত্রিত রকমের ডলারের সংখ্যা বৃদ্ধিতে, এমনিতেই অসম্ভব রকমের বেশী রাষ্ট্রীয় ঋণকে আরও ফাঁপিয়ে তোলাতে (১৭ লক্ষ কোটি ডলারেরও বেশী), তা এই দেশকে একটা দেউলিয়া হওয়ার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে ও সাময়িক ভাবে বহু রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে বন্ধ হতে বাধ্য করেছে, আর তারই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আর বহু দূরের সমস্ত দেশের জন্যই সবচেয়ে গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়েছে. সামাজিক খরচ কমিয়ে ফেলা, আমেরিকার লোকদের তরফ থেকে নিজেদের ভবিষ্যতের বিষয়ে আর আশ্বস্ত হতে না পারা, বেকারত্ব, দেশের বিভিন্ন শহরে প্রায়ই গণহত্যা বেড়ে যাওয়া, যা এই অর্থনৈতিক উন্নতির হার কমে যাওয়ার ফলেই হচ্ছে বলে মনে হয়, তা এই রকমের একেবারেই অশান্ত পরিপ্রেক্ষিতকে আরও অশান্তই করেছে.

আর এই ধরনের একটা নেতিবাচক পটভূমিতে যেন শূণ্য আকাশে বজ্রপাতের মতো প্রাক্তন গুপ্তচর সংস্থার কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেনকে নিয়ে স্ক্যান্ডাল শুরু হয়েছে, যে নিজের সহকর্মীদের গোপন কারবার ফাঁস করে দিয়েছে, যারা কিনা বেআইনি ভাবে আড়ি পাতছিল সারা বিশ্ব জুড়েই, আর তাদের মধ্যে অন্য রাষ্ট্রের নেতারাও ছিলেন. ভিলেন ইভানভ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতিতে এটাকে একটা অভূতপূর্ব পতন বলেই মনে করে বলেছেন:

“স্নোডেন সারা বিশ্বকেই দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার লোকরা তাদের নির্দেশকে নানা রকমের কাজে পরিণত করতে চায়. তার মধ্যে সকলের সম্বন্ধেই খবর যোগাড় করে, এমনকি নিজেদের জোটসঙ্গীদের সম্বন্ধে, তাদের নেতাদের বিষয়ে, যারা আমেরিকারই রাজনীতির এগিয়ে থাকা প্রবাহে রয়েছে. এটাও ওবামাকে মোটেও ভাল আলোকে দেখাচ্ছে না”.

আর সত্যই সেই তথ্য, যা স্নোডেন ফাঁস করে দিয়েছে, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মুখ্য ইউরোপীয় জোটসঙ্গীদের জন্য খুবই তীক্ষ্ণ সম্পর্কের কারণ হয়েছে. শেষমেষ, ওয়াশিংটনের প্রচেষ্টায় রুশ- মার্কিন সম্পর্ক নতুন কাঠামোয় শুরু করার প্রচেষ্টাও বিফল হয়েছে, যার উপরে সারা বিশ্বেই একটা বড় ধরনের আশা করা হয়েছিল.

এই সবই, সেই আমেরিকার ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে বাধ্য করেছে বলতে যে, বারাক ওবামা মোটেও সেই রকমের রাষ্ট্রপতি নন, যাকে নির্বাচকরা চেয়েছিলেন. তার ওপরে তাঁর বিফলতা এবারে একটা সঙ্কটজনক পরিমাণে জমা হয়েছে. ওবামার জন্যও বিল ক্লিন্টন অথবা জর্জ বুশ জুনিয়রের ভাগ্য অপেক্ষা করে থাকতে পারে, যারা শুরু করেছিলেন খুব সম্ভবতঃ “স্বাস্থ্য কামনা” করেই, আর শেষ করেছিলেন নিজেদের বড় রাজনৈতিক ক্যারিয়ারগুলো একেবারে “অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া” সম্পন্ন করেই. তবে প্রত্যেকে অবশ্য যে যার নিজের মতো করেই.