এই বিষয়ে আমাদের সমীক্ষক ভ্লাদিমির সাঝিন তাঁর মন্তব্য প্রকাশ করেছেন.

বাধ্যতা মূলক ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা নষ্ট করে দেওয়া সমেত এই ধরনের মিছিল ও “আমেরিকা নিপাত যাও!” স্লোগান ইরানে নিয়মিত ভাবেই করা হয়েছে ও তা খুবই সাধারণ ভাবেই ঘটতে দেখা হয়েছে. তবে তা আজ আর নয়.

দেশের রাষ্ট্রপতি পদে সংস্কার সাধক হাসান রোহানির নির্বাচিত হওয়ার পরে ইরানের রাজনীতিতে নির্দিষ্ট রকমের পরিবর্তনের আশাই বিশ্বে করা হয়েছিল, বিশেষত পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, তাদের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও. রোহানি ও তাঁর মন্ত্রীসভার লোকদের বহু সংখ্যক ঘোষণা, আর তারই সঙ্গে “ছয় মধ্যস্থতাকারী” দেশ ও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক দিকগুলো প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, সত্যই, রাজনৈতিক ভাবে নবীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে. তার ওপরে ইরানের সামাজিক মতামত পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, এই রাজনীতিকে সমর্থন করেছে ইরানের শতকরা ৮০-৯০ ভাগ মানুষই.

কিন্তু রোহানির পক্ষ থেকে বর্তমানে শুধু ওয়াশিংটনের সঙ্গে কথাবার্তার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরী করার চেষ্টা (আর আপাততঃ তার চেয়ে বেশী কিছু নয়) ও অনন্তকাল ধরে “আমেরিকা নিপাত যাও!” স্লোগান বন্ধ করার প্রচেষ্টা “কড়া পথের” সমর্থকদের কাছ থেকে শুধু ক্ষোভের প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে.

বিশেষ করে বিরক্তি প্রকাশ করেছে ঐস্লামিক বিপ্লব প্রতিরক্ষা বাহিনীর নেতারা. তাদের শক্তি প্রয়োগ ছাড়া “আমেরিকা নিপাত যাও!” স্লোগান সমেত গণ মিছিল চৌঠা নভেম্বরে হতে পারত না আর তার স্পষ্টই লক্ষ্য ছিল যে, রাষ্ট্রপতিকে ও সর্ব্বোচ্চ প্রশাসককে দেখিয়ে দেওয়া যে, দেশের জনগন “আমেরিকার সঙ্গে মৈত্রীর” বিরুদ্ধে.

সর্ব্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা খোমেনেই এই সমাবেশকে সমর্থন করেছেন, তিনি বলেছেন যে, “হাস্যমুখর শত্রুকে” বিশ্বাস করার দরকার নেই. আয়াতোল্লা খোমেনেই নিজের পক্ষ থেকে চারটি শর্ত তুলেছেন, যা হলে তবেই ইরান ছয় মধ্যস্থতাকারী ও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার সঙ্গে চুক্তিতে স্বাক্ষর করবে. প্রথমতঃ, ফোর্দো এলাকায় মাটির নীচে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ কেন্দ্র বন্ধ করতে দেওয়া যাবে না. দ্বিতীয়তঃ, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণের বিষয়ে মাত্রা শতকরা পাঁচ শতাংশ রাখা অস্বীকার করা. তৃতীয়তঃ, আরাকে ভারী জলের রিয়্যাক্টর নির্মাণ কাজ চালু থাকবে (যা সম্পূর্ণ ভাবেই প্লুটোনিয়াম উত্পাদনের সম্ভাবনা দেবে, যা পারমাণবিক বোমা প্রস্তুত করতে প্রয়োজন). চতুর্থতঃ, ঐস্লামিক প্রজাতন্ত্র ইরান নিজের উপরে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ সংস্থার পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত বাড়তি দায়িত্ব গ্রহণ করবে না, যা যে কোন সময়ে এই সংস্থার পর্যবেক্ষকদের পক্ষ থেকে ইরানের যে কোনও পারমাণবিক কেন্দ্র দেখতে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়.

এই চারটি শর্ত উচ্চারণ করে, ইরানের সর্ব্বোচ্চ নেতা বাস্তবে দেশের চরমপন্থী – সংরক্ষণশীলদের পক্ষেই থেকেছেন, যারা পারমাণবিক ক্ষেত্রে তাঁদের মত অনুযায়ী রোহানির পক্ষ থেকে খুবই বেশী রকমের কম্প্রোমাইস করতে তৈরী থাকা দেখতে পাচ্ছেন. এই প্রসঙ্গে আবার সেই প্রশ্নও খোলা রয়ে গেল যে, আয়াতোল্লা খোমেনেই নিজে এই মতে কতটা বিশ্বাস করেন. এখানে বাদ দেওয়া যেতে পারে না যে, তাঁর এই ঘোষণা প্রাথমিক ভাবে “দেশের ভিতরের জন্যই” করা হয়েছে, যাতে দেশের ক্ষেপে ওটা চরমপন্থীদের ঠাণ্ডা করা যায়.

কিন্তু যে কোন ক্ষেত্রেই স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে যে, এই সব শর্ত খুব কঠোর করে মানা হলে ইরানের পক্ষ থেকে আগামী ৭- ৮ই নভেম্বর ইরান – “ছয় মধ্যস্থতাকারী” দেশের আলোচনায় কোন রকমের অগ্রগতিই হতে পারবে না. কারণ তেহরানের বিরোধীরা এই প্রশ্নগুলোতেই ইরানের কাছ থেকে কম্প্রোমাইস দাবী করেছে.

তা সে যাই হোক না কেন, তেহরানে হয়ে যাওয়া ৪ঠা নভেম্বরের মিছিল ও সমাবেশ, আর তারই সঙ্গে সেই সমস্ত কথা, যা সেই দিনে উচ্চারিত হয়েছে, তা আরও একবার দেখিয়ে দিয়েছে যে, ইরানের নেতৃত্বে একটা বিরোধ দেখা যাচ্ছে. তারই মধ্যে - পারমাণবিক সমস্যা সমাধানের পথ নিয়েও, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের প্রতি রাজনীতি নিয়ে, আর সব মিলিয়ে – দেশে ও বিশ্বে অবস্থানের ভূমিকা নিয়েও.

এই প্রসঙ্গে প্রাচ্য বিশারদ ও রাজনীতিবিদ, ইরানের পররাষ্ট্র নীতি সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ ইরিনা ফিওদরভা বলেছেন:

“ইরানে মিছিলের আয়তন অনেক কিছুই বলে দেয়: সেই বিষয়ে যে, ইরানের সমাজে পশ্চিমের দেশগুলির সঙ্গে, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা শুরু করার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে, সে সম্বন্ধেও যে, “কড়া নীতির” পক্ষের লোকরা এখনও অনেক শক্তিশালী রয়েছে, আর “আমেরিকা নিপাত যাও!” স্লোগান এখনও যথেষ্ট রকম ভাবেই ইরানের সমাজে চাওয়া হয়েছে”.

সুতরাং, আজ ইরানের রাজনৈতিক উচ্চ কক্ষে দুটি শক্তি লড়াই করছে: কট্টরপন্থী সংরক্ষণ শীল লোকরা, যারা নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থান হারাতে ভয় পাচ্ছে এক পশ্চিম বিরোধী তৈরী হওয়া সামাজিক কাঠামোর মধ্যে, আর যারা বাস্তব অবস্থা বুঝে চলতে চাইছেন, যাঁরা ভাল করেই বুঝতে পারছেন সারা বিশ্বের সঙ্গে বিরোধের পরিণতি কি হতে চলেছে, তাদের মধ্যে.

একই সময়ে, তেহরানের কিন্তু হিসাব করে দেখলে বেশী কিছু বাছাই করার নেই. এখানে দ্বিধা খুবই সহজবোধ্য: হয় বাস্তব পন্থী নীতি নেওয়া, অথবা অভ্যস্ত স্লোগানের আওয়াজের নীচে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পথে এগিয়ে যাওয়া.