উপনিবেশবাদী যুগের শেষের পরে নতুন যুগের উষায় যখন নির্জোট আন্দোলনের উন্নতির বছর গুলো কেটেছে, যা “তৃতীয় বিশ্বের” বহু ডজন ছোট দেশকেই একজোট করতে সমর্থ হয়েছিল, তখন ছোট শ্রীলঙ্কা এই নির্জোট দেশগুলোর একটা নেতৃস্থানীয় দেশ হতে পেরেছিল, এই কথা মনে করিয়ে দিয়ে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“বেশ কয়েক দশক পার হয়ে এসে নতুন করে নিজেদের সম্বন্ধে জাহির করার সুযোগ শ্রীলঙ্কার জন্য হওয়া উচিত্ ছিল এই দেশে আসন্ন ১৪ থেকে ১৬ই নভেম্বর হতে যাওয়া কমনওয়েলথ দেশগুলোর শীর্ষ সম্মেলন. এই আন্তর্রাষ্ট্রীয় জোটে গ্রেট ব্রিটেন ও তাদের সবচেয়ে বেশী সংখ্যক বিগত উপনিবেশ, সংযুক্ত রাজ্য ও সংরক্ষিত এলাকা থাকার কথা ধরলে, যেখানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশের বাস, এই কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলন বিশ্বকে সেই সময়ের কথাই মনে করিয়ে দিতে পারত, যখন শ্রীলঙ্কা নির্জোট আন্দোলনে সামিল হওয়া অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে একসাথে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটা সুর বেঁধে দিতে পারত আর উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির বিরুদ্ধে একটা আলোচ্যের তালিকা তৈরী করতে সক্ষম হত”.

কিন্তু এবারে কলম্বোর জন্য বৃহত্ ভূ-রাজনৈতিক প্রদর্শনী হতে চলেছে কিছুটা অমসৃণ ভাবেই. কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলন বয়কটের কথা ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন কানাডার প্রধান মন্ত্রী স্টিভেন হার্পার. তিনি শ্রীলঙ্কার সরকারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার বিষয়ে গুরুতর ভাবে লঙ্ঘণ করার অভিযোগ এনেছেন.

একই ধরনের দোষ দিয়ে এক ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার রক্ষা সংস্থা “হিউম্যান রাইটস ওয়াচ”. “এটা যথেষ্ট রকমই খারাপ যে, কমনওয়েলথ সেই রাষ্ট্রকে তাদের শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের অনুমতি দিয়েছে, যাদের উপরে গণ হারে মানবাধিকার লঙ্ঘণ ও সামরিক অপরাধের অভিযোগ রয়েছে”, - ঘোষণা করেছেন “হিউম্যান রাইটস ওয়াচ” সংস্থার ডিরেক্টর ব্র্যাড অ্যাডামস.

এমনকি ইতিমধ্যেই পরিকল্পিত প্রিন্স চার্লস ও তাঁর স্ত্রীর এই দেশে সফরের কথাও বহু বিদেশী রাজনীতিবিদ ও সংবাদ মাধ্যমের সমালোচনা করে বক্তব্যের সুর পাল্টাতে সক্ষম হয় নি. কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনের আগে শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে এই রকমের প্রবল সমালোচনার ঝড় কি কারণে উঠেছে, আর এই দেশ কি এবারে কোন রকমের আন্তর্জাতিক ষঢ়যন্ত্রের শিকার হতে চলেছে? এই প্রসঙ্গে আবারও সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“এখানে মূল সমস্যা হল যে, শ্রীলঙ্কার সরকার রাষ্ট্রসঙ্ঘের তরফ থেকে প্রস্তাবিত এই দেশে ২৬ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের সম্বন্ধে তদন্তের বিষয়ে জোর দিয়ে অনীহা জানানোর ব্যাপারটা. রাষ্ট্রসঙ্ঘের মহাসচিব বান কী মুনের নির্দেশে নিয়োজিত বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, এই বিরোধের শিকার হয়েছেন কম করে হলেও চল্লিশ হাজার মানুষ. কিন্তু কে ও কবে এর জন্য দায় নেবে, আর শ্রীলঙ্কায় কি কখনও “ইতিহাসের বিচার” করা হবে, তা এখনও অস্পষ্টই থেকে গিয়েছে”.

আরও কয়েক দশক আগে এই দ্বীপে বিরোধ শুরু হওয়ার আগে, শ্রীলঙ্কা দক্ষিণ এশিয়াতে দেখতে ছিল একটা গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের প্রদর্শনীর জানলার মতো. কিন্তু আজ তাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি বিশ্বাসই প্রশ্নের সম্মুখীণ হচ্ছে. এই পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কার সরকারের পক্ষ থেকে আরও বেশী করে আন্তর্জাতিক সমাজের কথা শুনতে না চাওয়াও তাদের জন্যই একটা বেশ বড় রকমের রাজনৈতিক ক্ষতির সম্ভাবনাই নিয়ে আসছে.