বিশ্বের বাণিজ্যে ডলারের প্রাধান্য নিয়ে সমস্যা গত শতকের সত্তরের দশকের গভীরে রয়ে গিয়েছে, যখন বর্তমানের বিদেশী মুদ্রার বাজার তৈরী হয়েছে. তখন স্থির করা হয়েছিল যে, ডলারের সঙ্গে সোনার দামের ওঠা নামাকে শেষ অবধি ছিন্ন করে দেওয়ার, আর আমেরিকার মুদ্রা তখন থেকেই বাস্তবে একটা ঋণ পত্রে পরিণত হয়েছিল. কিন্তু সেটার প্রতি বিশ্বাস এই কারণেই মিলিয়ে যায় নি যে, ডলার নিয়ে বাণিজ্যের জন্য একটা খুবই শাখা প্রশাখা দিয়ে বিস্তৃত ব্যবস্থা তৈরী হয়ে গিয়েছিল, আমেরিকার অর্থনীতি যেমন ছিল তেমনই ভাবে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি হয়েই রয়ে গিয়েছে, আর সেই দেশের সরকার সব রকম ভাবেই নিজেদের দেশে বিনিয়োগ টেনে আনছেন. সেই বিনিয়োগ মার্কিন অর্থনীতিতে আসছে তাদের ঋণপত্র বিক্রী করার মাধ্যমে, যা বর্তমানে ইতিমধ্যেই ১৭ লক্ষ কোটি ডলারেরও বেশী হয়েছে. এই ধরনের বিনিয়োগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই জীবনের মতো প্রয়োজন, কারণ সেই দেশের বাজেট বহুকাল ধরেই ঘাটতি সহ তৈরী রয়েছে – অর্থাত্ তাদের খরচার পরিমাণ আয়ের চেয়ে বহু সহস্র কোটি ডলার বেশী. কিন্তু সমস্যা হচ্ছে না – কারণ আমেরিকার ঋণপত্রকে বিশ্বে মনে করা হয়েছে সবচেয়ে ভরসাযোগ্য বিনিয়োগের অস্ত্র হিসাবে. একদিকে, এই ধরনের মডেল বিশ্বাসের উপরেই ভিত্তি করে হয়েছে, আর অন্যদিকে – বাস্তব কোন অন্য উপায় না থাকার কারণেই. তাই বিশ্বের সমস্ত স্বর্ণ ও মুদ্রার সঞ্চয়ের অর্ধেকের বেশীই রাখা হয়েছে ডলারের উপরে. আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও ঋণ জমানো চালিয়ে যাচ্ছে. সমস্যা হল যে, এই ব্যাপারটা অনন্তকাল ধরে চলতে পারে না, এই রকম একটা বিশ্বাস নিয়ে রাশিয়ার হায়ার স্কুল অফ ইকনমিক্সের প্রফেসর আলেকজান্ডার আব্রামভ বলেছেন:

“এই ঋণ ডলারের উপরেই খুব বেশী প্রভাব ফেলতে পারে, যদি বিনিয়োগকারীদের কোন একটা ভিত্তি তৈরী হয়, এই রকমের ধারণা করার যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফ থেকে এই ঋণের জন্য পরিষেবা দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে না. সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে সেই ব্যাপারেই যে, কেউই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসন্ন সময়ে ও মাঝারি পাল্লার সময়ে কি নীতি নেওয়া হতে চলেছে, তা নিয়ে কিছুই জানেন না, আরও জানেন না যে, তারা এই ঋণ কি করে শোধ করবে. এটা করা হতে পারে মূল্যবৃদ্ধি বাড়িয়ে অথবা অন্য কয়েকটা বিশ্বের জন্য অপ্রিয় অস্ত্র ব্যবহার করেই. যতদিন না আমরা সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাচ্ছি যে, কি করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বাজেটকে স্বাভাবিক করবে, তারা রাষ্ট্রীয় ঋণ কমানোর জন্য কি স্ট্র্যাটেজি নেবে, ততদিন পর্যন্ত এটা থাকবে একটা গুরুতর ঝুঁকি হয়েই, যা হবে সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য”.

স্বল্প পাল্লার ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থার উপরে আঘাত হানা হতে পারে রেটিং সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে. ২০১১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া বাজেট যুদ্ধের ফলে স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড পুওরস সংস্থার পক্ষ থেকে আমেরিকা ইতিমধ্যেই সব থেকে ঋণ যোগ্য দেশ থাকার রেটিং হারিয়েছে. কয়েকদিন আগে এই সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছিল আরও এক দৈত্যাকার কোম্পানী, যারা এই ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত – ফিচ. কিন্তু অনেক বেশী গুরুতর হতে চলেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দার পরিণাম. যেমন, যদি আরও একটি বৃহত্ অর্থনৈতিক বুদ্বুদ ফেটে যায়, তবে এই পিরামিড একেবারেই টলমল করে উঠে ভেঙে পড়তেও পারে.

প্রসঙ্গতঃ, কয়েকদিন আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যে শ্বাসরোধ হয়ে আসছে, সেই কথা বলেছিলেন নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ এডমন্ড ফেল্পস. তিনি মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন সেই বিষয়ে যে, ঐতিহ্যবাহী আমেরিকার অর্থনীতির সেই বিশেষ ক্ষমতা – অর্থাত্ উদ্ভাবনী বিষয়ে সাফল্য, এবারে বিগত সময়ের ব্যাপার হয়ে যাচ্ছে. এটা যে সত্যই তাই হয়েছে, তা সারা বিশ্বই এই বছরের অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধে টের পেয়েছে, যখন ওয়াশিংটন তাদের গভীরে প্রোথিত সমস্যা গুলোকে সমাধানে অপারগ হয়ে, অর্থাত্ বাজেট ঘাটতি কমানো গগনচুম্বী রাষ্ট্রীয় ঋণের সমস্যাকে মেটাতে না পেরে দেউলিয়া হওয়ার কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিল.