জার্মানীর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক থেকে একদল বিশেষজ্ঞকে ওয়াশিংটন পাঠানো হচ্ছে, আর তাঁদের সঙ্গে যাচ্ছেন, তাঁদের ফরাসী সহকর্মীরাও. তাঁদের কাজ হতে চলেছে, এই গুপ্তচর বৃত্তির প্রসার সম্বন্ধে খোঁজ করা ও একটা গ্যারান্টি পাওয়া যে, এই ধরনের গুপ্তচর বৃত্তি ভবিষ্যতে করা হবে না. ইউরোপের লোকরা ওয়াশিংটনের সঙ্গে গুপ্তচর বৃত্তি বন্ধ করা নিয়ে একটা চুক্তি স্বাক্ষর করতে চায়. এটা থেকে কি পাওয়া যেতে পারে, তা এখনও কেউই বলতে চাইছে না. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর আগে কখনও কোন রকমের লিখিত কোন গ্যারান্টি দেয় নি, যা তাদের নিজেদের গুপ্তচর সংস্থার হাত পা বেঁধে ফেলতে পারে.

বার্লিনে, ব্রাসেলস শহরে ও প্যারিসে এরই মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তথ্য আদান প্রদান সংক্রান্ত চুক্তি নতুন করে বিবেচনা করা নিয়ে কথা উঠেছে আর নতুন চুক্তির বিষয়েও পিছিয়ে দেওয়া নিয়ে কথা হচ্ছে. মেরকেল যেমন মন্তব্য করেছেন যে, আগে “বিশ্বাসের পুনর্স্থাপন করতে হবে”.

ইউরোপে ওবামার প্রতি বিশ্বাস এতটাই নষ্ট হয়েছে যে, কিছু জার্মানীর ও ফরাসী সংবাদপত্রে কোন রকমের রাখঢাক না করেই লেখা হয়েছে: ওবামার ব্যক্তি পরিচয় খুবই দ্রুত এমন বিরক্তিকর হয়ে যাচ্ছে, যা আগে কখনও ইউরোপ তাঁর পূর্বসূরি জর্জ বুশ জুনিয়রের প্রতি বোধ করে নি. আর এর আগেও হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধেই এই ধরনের গুপ্তচর বৃত্তি নিয়ে এমন কড়া ঘোষণা ওবামার আগে জর্জ বুশ জুনিয়র কখনও শোনেন নি.

এটা সত্যি যে, রাশিয়ার বিশেষজ্ঞরা অবশ্য ইউরোপের সঙ্গে বারাক ওবামা ও তাঁর প্রশাসনের এই সম্পর্ক খারাপ হওয়াটাকে পুরোপুরি ইউরোপ- আমেরিকার সম্পর্ক খারাপের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছেন না.

এই স্ক্যান্ডাল শুরু শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচর বাহিনী যে, ইউরোপের উপরে নজরদারি করছে, তা নিয়ে হয় নি: এটা অনেকদিন আগে থেকেই জানা ছিল, এই কথা উল্লেখ করে মানবিক– রাজনৈতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ ভ্লাদিমির স্লাতিনভ মন্তব্য করেছেন যে, ইউরোপ এবারে এই গুপ্তচর বৃত্তির বিষয়ে নির্লজ্জ রকমের প্রসার দেখেই আশ্চর্য হয়েছে, তাই তিনি বলেছেন:

“ফাঁস হয়ে যাওয়া খবর সত্যিই বর্তমানের আমেরিকার প্রশাসনের উপরে খুব কড়া আঘাত করেছে. তাঁদের এবারে এই স্ক্যান্ডাল চাপা দিতে হবে, প্রাথমিক ভাবে নিজেদের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে. আর, সবচেয়ে মুখ্য হল, এই ক্ষেত্রে গুপ্তচর বিভাগের সঙ্গে কাজ কারবারের কায়দাকেই ঢেলে সাজাতে হবে. নিজেদের সবচেয়ে কাছের জোটের দেশগুলোর উপরেই আমেরিকার গুপ্তচর বিভাগের নজরদারি করার উপরে একটা নির্দিষ্ট রকমের বাধা-নিষেধ তৈরী করতে হবে”.

হোয়াইট হাউস এবারে একটা চারপাশ থেকে বেড় দেওয়া প্রতিরক্ষা অবস্থান নিয়েছে আর যেমন করে পারছে, তেমন করেই ক্ষেপে ওঠা ইউরোপীয় লোকদের সামাল দিচ্ছে. তারই মধ্যে প্রশাসনের তরফ থেকে এখন একটার পর একটা করে নতুন অর্থহীণ আত্মপক্ষ সমর্থনের ঘোষণা দিয়ে যাওয়া হচ্ছে. প্রশাসনের এক উচ্চপদস্থ কর্মচারী ঘোষণা করেছেন যে, এই রকমের নজরদারির লক্ষ্য (অ্যাঞ্জেলা মেরকেল ও ফ্রান্সুয়া অল্যান্দ) হোয়াইট হাউসের রাডার থেকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় নি. আর জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা থেকে জার্মানীর সংবাদপত্রগুলোর তরফ থেকে আরও এক পশলা আক্রমণের পরে এক ঘোষণা দিয়ে বলা হয়েছে যে, এই সংস্থার প্রধান জেনারেল কীট আলেকজান্ডার ওবামার সঙ্গে মেরকেলের উপরে নজরদারি করা নিয়ে কোনও আলোচনা করেন নি ও তাঁকে এই সম্বন্ধে কিছু জানান নি. খুবই অবাক হওয়ার মতো ঘটনা বটে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসা অভ্যাস অনুযায়ী সমস্ত বৃহত্তম গুপ্তচর বৃত্তি সংক্রান্ত অপারেশন নিয়ে অনুমতি পেতে হয় রাষ্ট্রপতির সরাসরি নির্দেশ থেকেই. তাই খুবই কঠিন হয় বিশ্বাস করতে যে, মেরকেল ও অল্যান্দের উপরে নজরদারি, অর্থাত্ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী দেশের প্রধানদের উপরে গুপ্তচর বৃত্তির কাজ এতটাই বাঁধাধরা কাজে পরিণত হয়েছিল যে, তা হোয়াইট হাউসের নজরের মধ্যেই পড়ে নি.

যখন কোন না কোনও দেশের রাষ্ট্রপতি জানেন না যে, তাঁর নিজের গুপ্তচর বিভাগ কি করছে, - এটা তখন খুবই বিপদ সঙ্কেতের মতো হয়ে দাঁড়ায়. ইতিহাস যেমন দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই ধরনের অজ্ঞান হয়ে থাকা সেই দেশের অভ্যুত্থানের কারণও হতে পারে. এটা অবশ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হবে বলে মনে হয় না. কিন্তু যদি রাষ্ট্রপতি না জানেন, তাঁর গুপ্তচর বিভাগ নিজের সবচেয়ে কাছের আর সবচেয়ে অনুগত জোট সঙ্গীদের উপরেই আড়ি পাতছে, তবে তা নিশ্চয়ই ওবামাকে একজন খুবই কম উপযুক্ত রাষ্ট্রপতি বলেই প্রমাণ করে দেয়. আর যদি তিনি আগে থেকে জানতেন আর এখন অস্বীকার করছেন, এমনটাই প্রমাণিত হয়, তবে তা নিশ্চয়ই তাঁকে খুব একটা ইতিবাচক দিক থেকে দেখার বিষয়ে সাহায্য করবে না.