এটা তারা ধরে নিয়েছিলেন, সারা বিশ্বব্যাপী বিপ্লবের প্রথম পদক্ষেপ. লেনিনের শরিকরা আস্থা রেখেছিলেন ইউরোপীয় শরিকদের ওপর, কিন্তু ভুল করেছিলেন. জার্মানী, স্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরীতে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র গঠণ করার প্রয়াস পর্যুদস্ত হল, এবং তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল. ইউরোপে বিপ্লব রপ্তানী করার প্রচেষ্টা বিফল হওয়ার পরে বলশেভিকরা এশিয়া নিয়ে মাতলেন, বিশেষতঃ ভারতবর্ষকে নিয়ে. তারা সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলন জোরদার করার প্রতিজ্ঞা নিলেন. ১৯১৯ সালের ৫ই অগাস্ট রেড আর্মির হোতা লেভ ত্রোতস্কি নির্দেশ দেন আফগানিস্তান হয়ে বৃটিশ কলোনিয়াল ভারতের ওপর আক্রমণ করার. ত্রোতস্কির মতলব ছিল উরালে এশীয় বিপ্লবের হেড কোয়ার্টার বানানোর. তার এই দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, ভারতে শুরু হওয়া বিপ্লব ইউরোপের প্রধান রাজধানীগুলোতে ছড়িয়ে পড়বে. ত্রোতস্কির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, যে প্যারিস ও লন্ডনের পথে যেতে হলে, যেতে হবে আফগানিস্তান, পাঞ্জাব ও বাংলার পথ ধরে. ত্রোতস্কি ৩০-৪০ হাজার ক্যাভেলরির ব্রিগেড গঠণ করার সুপারিশ করেছিলেন. তার কোনো সন্দেহই ছিল না, যে ঐ ব্রিগেডে যোগ দেবে আফগানি ও ভারতীয়রা. তার আশা ছিল, যে গঙ্গার তীরে আন্তর্জাতিক বিপ্লবের পতাকা উড়বে, সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের চুর্ণবিচুর্ণ করা যাবে. ত্রোতস্কি আশা করেছিলেন, যে ভারত হবে স্বাধীন গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, এবং তারপরে আফগানিস্তানও হবে.

ত্রোতস্কির অনেক আগে থেকেই ভারতবর্ষে পদার্পণ করা ও সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের সেখান থেকে তাড়ানোর পরিকল্পনা ছিল রুশীদের. সম্রাট প্রথম পাভেল সেই ১৮০১ সালেই ভারতে পদার্পণের নির্দেশ দিয়েছিলেন. ক্যাভালিয়েরির সেই রুট দিয়েই যাওয়ার ছিল, যে রুট সম্পর্কে দুই শতাব্দী বাদে লিখে ছিলেন লেভ ত্রোতস্কি. কিন্তু তখন রুশী ক্যাভালিয়েরি সীমান্ত অতিক্রম করতেও পারলো না, বাধলো প্রাসাদী অভ্যুত্থান, সম্রাট প্রথম পাভেলকে খুন করা হল চক্রান্ত করে. আর তার উত্তরসূরী প্রথম আলেক্সান্দর ক্যাভালিয়েরিকে আদেশ দিয়ে অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এল. উনবিংশ শতাব্দীতে রাশিয়া এবং বৃটেনের মধ্যে সম্পর্ক আবার তীক্ষ্ণতর হয়ে উঠেছিল. রাশিয়া চাইছিল ভারতে বৃটেনের সাম্রাজ্যবাদে ছেদ টানতে. যে ভারতবর্ষকে রানী ভিক্টোরিয়া বৃটিশ মুকুটের সবচেয়ে মূল্যবান হীরক বলে অভিহিত করেছিলেন. কিন্তু লন্ডন খুব ঘাবড়ে গেছিল. ইংরেজরা বুঝতে পেরেছিল, যে যদি রুশীরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে ওদের আর মুকুটের সেরা হীরকখন্ডটিই থাকবে না.

ত্রোতস্কি অবশ্যই ইতিহাস চর্চা করেছিলেন এবং খুব ভালো বুঝতে পেরেছিলেন, যে তার পরিকল্পনা ইংল্যান্ডের জন্য কতখানি বিপজ্জনক. কিন্তু তখনই রাশিয়ায় শুরু হল উন্মত্ত গৃহযুদ্ধ, এবং তখন সুদূর অভিযানে যাওয়া সম্ভব ছিল না. রেড আর্মির কয়েক বছর সময় লেগেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ভূখন্ডে নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে. শেষপর্যন্ত ভারত মহাসাগর পর্যম্ত পৌঁছানো গেল না, ত্রোতস্কির প্ল্যান কার্যকরী হল না. এর পঁচিশ বছর পরে ভারতীয়রা নিজেরাই স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, ১৯৪৭ সালের এপ্রিলে সরকারিভাবে স্বাধীনতা পাওয়ার আগেই ভারত রাশিয়ার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল. ভাবুন একবার! এরকমই আমাদের দুই দেশের বন্ধুত্ব!