২রা অক্টোবর – মহাত্মা গান্ধীর জন্মদিবস. তাঁর মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক সম্পদের প্রতি গোটা বিশ্বে আগ্রহ এখনো এতটুকু কমেনি এবং মনে হয়, কোনোদিন কমবে না. মহাত্মাজির ওপর রাশিয়ায় ডজন ডজন গবেষণামুলক পুস্তক প্রকাশ করা হয়েছে. পাঁচ বছর আগে প্রকাশিত হয়েছে রাশিয়ার প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ রোস্তিস্লাভ রীবাকোভের লেখা বই – ‘মহাত্মা গান্ধীর প্রত্যাবর্তন’, যেখানে ১৯১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফেরার পরে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ভারতবর্ষের ভূমিতে প্রথমদিনগুলিতে কর্মকান্ডের বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করা হয়েছে.

মহান ভারতীয় লেখক প্রেমচাঁদের রচনাবলী বহুবার রাশিয়ায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে. রাশিয়ার সাহিত্যতত্ত্ববিদেরা মাক্সিম গোর্কির সাথে মুন্সী প্রেমচাঁদের রচনাশৈলীর বহু সাদৃশ্য দেখতে পেতেন. প্রেমচাঁদ প্রয়াত হন গোর্কির মাত্র দুই মাস পরেই. গোর্কির মৃত্যু উপলক্ষে আয়োজিত শোকসভার জন্য ভাষণ প্রস্তুত করতে গিয়ে গুরুতর অসুস্থ মুন্সী প্রেমচাঁদ তাঁর স্ত্রী শিবারানি দেবীকে বলেছিলেন – “যথন ভারতবর্ষে শিক্ষার আলো আম জনতার মধ্যে ব্যাপৃত হবে, তখন তুলসীদাসের মতোই গোর্কির রচনাবলীও ভারতের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়বে.” ১৯৩৬ সালের ৭ই অক্টোবর মুন্সী প্রেমচাঁদ পরলোকগমন করেন.

প্রায় ৮০ বছর আগে প্রখ্যাত রুশী চিত্রশিল্পী ও পরিব্রাজক নিকোলাই রেরিখ লিখেছিলেন – সুবিশাল রুশ দেশ নিরন্তর কাছে টানে ভারতীয় হৃদয়কে, ভারত চুম্বকের মতো আকর্ষন করে রুশী হৃদয়. রেরিখের জীবন ও সৃজন ছিল ভারতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যেখানে তিনি জীবনের প্রায় ২০ বছর অতিবাহিত করেছিলেন. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জওহরলাল নেহরু ও তাঁর মহতী কন্যা ইন্দিরা গান্ধীর সাথে নিকোলাই রেরিখের সখ্যতা ছিল. সেই ঔপনিবেশিক(কলোনিয়াল)ভারতবর্ষেও নেহরু ও রেরিখ স্বপ্ন দেখতেন যে, এমন একদিন আসবে, যখন রুশী ও ভারতীয় জনগণ ভাইয়ের মতো একে অপরের দিকে হাত বাড়িয়ে দেবে. নিকোলাই রেরিখ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮৭৪ সালের ৯ই অক্টোবর.

আরও একজন সুপ্রসিদ্ধ রুশী চিত্রশিল্পীর সৃষ্টিকর্মে ভারতবর্ষ বিশাল স্থান জুড়ে আছে – তিনি ভাসিলি ভেরেশাগিন. তিনি দুইবার দীর্ঘকালীন ভারতভ্রমণ করেছিলেন. ভেরেশাগিন দিল্লি, আগ্রা,জয়পুর সহ উত্তর ভারতের বহু শহর সফর করেছিলেন. তিনি এমনকি কাশ্মীর, সিকিম ও লাদাখে পর্যন্ত গিয়েছিলেন. কোলকাতার ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে প্রিন্স অফ ওয়েলসের জয়পুরে প্রবেশের ওপর আঁকা ভেরেশাগিনের সুবিশাল তৈলচিত্র প্রদর্শন করা হয়. রাশিয়ায় এই শিল্পীর সর্ববৃহত্ চিত্রসংগ্রহ প্রদর্শন করা হয় মস্কোর ত্রেতিকোভ আর্ট গ্যালারিতে. স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকায় পন্ডিত জওহরলাল নেহরু যেবার প্রথম সরকারি সফরে সোভিয়েত ইউনিয়নে এসেছিলেন, তখন তাঁকে সেই সংগ্রহ দেখানো হয়েছিল. তার প্রতিক্রিয়ায় পন্ডিতজি বলেছিলেন – “ভারতবর্ষকে নিয়ে এইরকম ছবি আঁকতে পারেন শুধুমাত্র সেই শিল্পীই, যিনি মনেপ্রাণে ভারতবর্ষকে ভালোবেসেছিলেন, যিনি সাধারণ ভারতবাসীর অন্তরাত্মাকে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন.” ভাসিলি ভেরেশাগিনের জন্ম হয়েছিল ১৮৪২ সালের ১৪ই অক্টোবর.

ভারতের দুটি বৃহত্ চিকিত্সা বিদ্যাকেন্দ্র ভ্লাদিমির হাভকিনের নামে নামাঙ্কিতঃ Haftkine training, research & testing এবং Haftkine Bio-Pharmaceutical Corporation Ltd. উনবিংশ শতকের শেষদিকে হাভকিন প্রথমে কোলকাতায় ও পরে মুম্বইয়ে কাজ করা কালে কলেরা ও প্লেগ রোগের প্রতিষেধক টীকা আবিষ্কার করেছিলেন. ২২ বছর ভারতে বসবাসকালে হাভকিন ও মুষ্টিমেয় একদল ভারতীয় ডাক্তার গরুর গাড়িতে টীকার ওষুধ বোঝাই করে হাজার হাজার কিলোমিটার দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বহু লক্ষ মানুষকে সে যুগের মারণাত্মক এই দুই রোগের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন. বিশেষত ভারতীয় চাষাভুষোরা শুধু তখনই টীকা নিতে রাজি হতো, যখন তারা জানতে পারতো যে ডাক্তারটি রুশী, ইংরেজ নন. ডাঃ ভ্লাদিমির হাভকিনের স্মৃতিদিবস পালন করা হবে ২৬শে অক্টোবর.

ইন্দিরা গান্ধী হত্যার খবর রাশিয়ায় তীব্র জনরোষের সৃষ্টি করেছিল. সেদিন রাশিয়ার সেই জমানার মহান কবি আন্দ্রেই ভোজনিসেনস্কি লিখেছিলেন – “ওরা হত্যা করলো এক মহীয়সী মহিলাকে. তাঁর থেকে অনর্গল বিচ্ছুরিত হত বুদ্ধিদীপ্তি, অসম সাহসিকতা, মধুর সৌন্দর্য্য. কোন পর্যায়ে যেতে পারে মানুষের পাশবিকতা! ভাবতেও গা শিউড়ে উঠছে যে, তাঁকে হত্যা করা হলো সেই ভারতবর্ষেই, যে ভূমি খ্রীষ্টের জন্মের বহু আগেই সারা বিশ্বে অহিংসার বাণী প্রচার করেছিল.” এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ড ঘটেছিল ১৯৮৪ সালের ৩১শে অক্টোবর.