আজ আমরা উত্তর দেব নিম্নোক্ত দুটি প্রশ্নের. প্রথম প্রশ্ন পাঠিয়েছেন বাংলাদেশের রয়না ভারত গ্রাম থেকে আতিয়া সুলতানা রিমা – রাশিয়ায় কতগুলি প্রাইভেট টিভি চ্যানেল আছে ?

রাশিয়ায় ইংরেজি ভাষা চর্চা করা হয় কি ? – জানতে চেয়েছেন পাকিস্তানের ফয়জলাবাদ থেকে রশিদ নাশ.

সবশুদ্ধ এদেশে ৩৩০টি সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেল প্রতিদিন কাজ করে. তার মধ্যে প্রায় ৮০টি চ্যানেল গোটা রাশিয়ার ভূখন্ডে প্রত্যক্ষ করা যায়.

সামাজিক চ্যানেলগুলি, যারা নিজেদের সোশিও-পলিটিক্যাল বলে নিজেদের পরিচয় দেয়, তারা চেষ্টা করে খবর ও তথ্যচিত্র প্রদর্শন করার. এরকম সব চ্যানেলও আছে, যারা গৃহপালিত পশু বা প্রকৃতি সম্পর্কে বিবরণী দেয়. স্পোর্টসের, পর্যটনের, আধুনিক মিউজিকের ও ফ্যাশনের অনুরাগীদের জন্যও আলাদা আলাদা চ্যানেল আছে.

সবচেয়ে জনপ্রিয় বেসরকারি টিভি চ্যানেল হচ্ছে এনটিভি এবং রেন টিভি. এনটিভি স্থাপন করা হয়েছিল ঠিক ২০ বছর আগে, ১৯৯৩ সালে. শুরু থেকেই ঐ চ্যানেল ঘোষণা করেছিল,যে “নিউজ পরিবেশন – আমাদের কর্তব্য”. ঐ চ্যানেলের সংবাদদাতারা এখনো সবচেয়ে বিতর্কমুলক বিষয় নিয়ে তথ্যচিত্র তোলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তপ্ত জায়গাগুলি থেকে ছবি ও বৃত্তান্ত নিয়মিত পাঠান. ফিচার ফিল্ম, ইউরোপিয়ান ফুটবল ও অন্যান্য বড়মাপের ক্রীড়া প্রতিযোগিতাও ঐ দুটি টিভি চ্যানেলের দর্শনসূচীর আবশ্যিক অঙ্গ.

রুশী ভাষায় এনটিভি দেখা যায় শুধুমাত্র রাশিয়া বা প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলোতেই নয়, আমেরিকায়, ইউরোপে এবং নিকট প্রাচ্যেও.

আর এবার সবিষদে জানাই আরেকটা প্রাইভেট টেলিচ্যানেল – রেন টিভি সম্পর্কে. ১৬ বছর আগে চালু হওয়া এই চ্যানেলটি রাশিয়া সহ প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের ৪০৬টি স্থানীয় সম্প্রচার মাধ্যমকে এক ছাতার তলে নিয়ে এসেছে. রেন টিভির প্রোগ্র্যাম রাশিয়ার পশ্চিম সীমা কালিনিনগ্রাদ থেকে শুরু করে একেবারে পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত দক্ষিণ-সাখালিনস্ক পর্যন্ত ৭২৫টি জনবসতি কেন্দ্রে ধরা যায়. তাদের মধ্যে রাশিয়ার সবচেয়ে জনঅধ্যুষিত যেমনঃ মস্কো, সেন্ট-পিটার্সবার্গ, কাজান, একাতেরিনবার্গ, সামারা ইত্যাদি নগরগুলোও রয়েছে.

রেন টিভির টার্গেট অডিটোরিয়াম হচ্ছে কর্মশীল যুবক সম্প্রদায় ও মধ্যবয়সীরা. মুলতঃ ১৮-৪৫ বছর বয়সী দর্শকদের মনোরঞ্জন করার পাশাপাশি রেন টিভি শিশু ও বেশি বয়স্ক দর্শকদের কথাও ভুলে যায় না. কারণ, সাধারণতঃ টিভি দ্যাখে গোটা পরিবার একসাথে. রেন টিভির কর্মীরা ও তাদের দ্বারা প্রস্তুত করা অনুষ্ঠানাদি বহুবার জাতীয় দূরদর্শন পুরষ্কার ‘তেফি’ জিতেছে.

আমাদের বাংলাদেশের এই মহিলা শ্রোতার প্রশ্নটির বিষদে উত্তর দেওয়ার জন্য আমি মনোযোগ সহকারে বেশ কয়েকদিন দীর্ঘক্ষণ ধরে রেন টিভির অনুষ্ঠান দেখলাম. আমার মনে হয়েছে যে, ঐ চ্যানেলের সাংবাদিকরা রাশিয়ার সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল কিন্তু আমেরিকা ও কয়েকটি পশ্চিমী দেশের সাম্রাজ্যবাদী নীতির কট্টর সমালোচক.

আর লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে এই, যে ঐ চ্যানেলে কিন্তু রাশিয়ার বাস্তব নিয়ে ব্যঙ্গ কথাশিল্পীদের কড়া সমালোচনায় কোনো কাটছাট করা হয় না. সেরকমই একজন দেশে সুবিদিত ব্যঙ্গ কথাশিল্পী মিখাইল জাদোরনভ খোলাখুলি ঐ টিভি চ্যানেল থেকে বলেছেন, যে একমাত্র ঐ চ্যানেলেই তার বক্তব্য সেন্সর কাটছাট করে না.

আরও কয়েকটি জনপ্রিয় চ্যানেল আছে, যাদের রাজনীতির সঙ্গে কোনো সংস্পর্শই নেই. যেমন ধরা যাক, টেলি চ্যানেল দমশনি(ঘরোয়া). ওখানে আলোচনা করা হয় পরিবার, দাম্পত্য জীবন, পরিবেশদূষণ, চিকিত্সা নিয়ে. ঐ চ্যানেলে বহু রাশিয়ান সিরিয়াল সারাদিন ধরে প্রদর্শন করা হয়. আর ঐ চ্যানেলটির ফিল্মের সংগ্রহ ঈর্ষাজনক.

প্রসঙ্গতঃ জানাই যে, ভারতের বিজয়ওয়াড়া থেকে আমাদের নিয়মিত শ্রোতা মহম্মদ আকবর খান জানতে চেয়েছেন যে, কটি ভাষায় রাশিয়ায় ভারতীয় সিনেমা দেখানো হয়.

একটা ভাষাতেই – রুশী ভাষায়. সব ভারতীয় ফিল্ম রুশী ভাষায় অনূদিত হয়.

আরও একটা প্রাইভেট টিভি চ্যানেলের কথা উল্লেখ করতে চাই এখানে. ‘ইন্ডিয়া-টিভি’ নামক এই চ্যানেলে ২৪ ঘন্টা ধরে ভারতের খবর, ভারতীয় সিনেমা ও সিরিয়াল দেখানো হয় রুশী ভাষায় রুশভাষী দর্শকদের জন্য.

আর এবার উত্তর দিচ্ছি আমাদের পাকিস্তানের ফয়জলাবাদ থেকে পাঠানো শ্রোতা রশিদ নাশের পাঠানো প্রশ্নটির – রাশিয়ায় ইংরাজি ভাষা চর্চা সম্পর্কে.

আমাদের দেশের অধিবাসীরা প্রায় ১৬০টি বিভিন্ন ভাষায় কথা বলে, কিন্তু তারা সবাই রুশী ভাষা জানে, ঐ ভাষাতেই একে অপরের সাথে বাক্যালাপ করে. জার শাসিত রাশিয়ায়, সোভিয়েত ইউনিয়নে এবং আধুনিক রাশিয়াতেও সেই রেওয়াজ বজায় রয়েছে. প্রাক্তন প্রজাতন্ত্রগুলির স্কুলে ও উচ্চ শিক্ষায়তনগুলিতে হয় রুশী ভাষায় অথবা প্রজাতান্ত্রিক ভাষায় পঠনপাঠন হয়.

ইংরাজি হচ্ছে অন্যতম বিদেশী ভাষা, যেটা স্কুলপড়ুয়ারা অধ্যয়ন করে. শিক্ষণীয় বিদেশী ভাষা হয় পড়ুয়া নিজে অথবা তার পিতামাতা বাছাই করে নেয়. কেউ বেছে নেয় ইংরাজি, কেউ ফরাসি, জার্মান বা স্প্যানিশ. রাশিয়ার বড় শহরগুলিতে এমন স্কুলও আছে, যেখানে ইতালিয়ান, চীনা, জাপানি, আরবী, হিন্দি, উর্দু প্রভৃতি ভাষা গভীরভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়.

মস্কোর একটি মাধ্যমিক স্কুলের পড়ুয়ারা হিন্দি শেখে, দেবনাগরীতে লিখতে ও পড়তে শেখে, শেখে হিন্দুস্তানি ফিল্মী গান.

উচ্চ শিক্ষায়তনে ভর্তি হওয়ার প্রবেশিকা পরীক্ষা দেওয়ার সময় তরুনতরুনীরা অনেকগুলো পেপারের পরীক্ষা দেয়, যার মধ্যে বিদেশী ভাষাও অবশ্যই থাকে. এবং অবশ্যই পরীক্ষা নেওয়ার জন্য সেই ভাষা শিক্ষাদায়ী শিক্ষককে আমন্ত্রণ জানানো হয়. যেমন ধরুন, যদি কোনো পরীক্ষার্থী হিন্দি ভাষা অধ্যয়ন করে থাকে, তাহলে তার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য অবশ্যই হিন্দি স্কুলের শিক্ষককে আমন্ত্রণ জানানো হয়, যদিও সেটা মেডিক্যাল বা ইঞ্জিনীয়ারিং ইনস্টিটিউট হতে পারে.

তবে ইংরেজি বোধহয় রাশিয়ায় এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় বিদেশী ভাষা. তার কারণ বোধহয় এই যে, এই ভাষার উপর খানিকটা দখল থাকলেও রুশী পর্যটকরা বিদেশে যে কোনো জায়গায় সাবলীলভাবে কথাবার্তা বলতে পারে.

যদি আমাদের কোনো পাঠক বা শ্রোতা ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে ধরা যাক মস্কোয় এসে পথচলতি কাউকে ইংরেজি ভাষায় কিছু জিজ্ঞাসা করেন, তবে প্রত্যুত্তরে শুনবেন – জার্মান ভাষায় বলুন বা ফরাসি ভাষায় বলুন, আমি জার্মান বলি বা ফরাসি বলি. আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুচকি হেসে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে, যদিও ওরা সবাই মাধ্যমিক স্কুলে কোনো এককালে ইংরাজি শিখেছিল. কারণ কথা বলার অভ্যাসের অভাবে বিদেশি ভাষা মানুষ খুব দ্রুত ভুলে যায়. তাই রাশিয়ায় উচ্চশিক্ষা নিতে আসা সকলেই গভীরভাবে রুশী ভাষা শিক্ষা করে. বহুবছর ধরে তৈরী করা শিক্ষাদান পদ্ধতি বিদেশিদের দ্রুত ও গভীরভাবে রুশী ভাষা শিখতে সাহায্য করে.

রাশিয়ার আদ্যোপান্ত অনুষ্ঠানটি এখানেই শেষ করছি. আমরা আপনাদের কাছ থেকে রাশিয়া সম্পর্কে নতুন নতুন আগ্রহোদ্দীপক প্রশ্নাবলীর অপেক্ষায় থাকবো.

আমাদের কাছে লেখার ইলেকট্রনিক ঠিকানা letters a @ruvr.ru আদাব.