১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ যা পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের থেকে আলাদা করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃষ্টি করেছিল, এই দেশ পেয়েছিল এক অভূতপূর্ব বেদনার মূল্য দিয়েই, সরকারি তথ্য অনুযায়ী এই যুদ্ধের বলি হয়েছিলেন তিরশ লক্ষ মানুষ, এই কথা উল্লেখ করে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এই সকল অপরাধের কথা বলতে গিয়ে আজ পর্যবেক্ষকরা গণহত্যা ও ধর্ষণের অভিযোগ করারে থাকেন পাকিস্তানের যোদ্ধা ও ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের পক্ষে থাকা স্থানীয় রাজনীতিবিদদের উপরেই, যদিও স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যায় যে, যখন এই ধরনের যুদ্ধ হয়, তখন দুই পক্ষেরই দোষ থাকে”.

তা সে যাই হোক না কেন, ২০০৮ সালের নির্বাচন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ দলের নেত্রী ও বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওয়াজেদ আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, তিনি ১৯৭১ সালের ঘটনার খুঁটিয়ে তদন্ত করবেন ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবেন. শেখ হাসিনার জন্য এই কাজ একটা ব্যক্তিগত কারণও রাখে – তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবর রহমানের কন্যা, যাঁকে ১৯৭৫ সালে হত্যা করা হয়েছিল. সেই সময়ের অভ্যুত্থানের কারণ এখনও স্পষ্ট করে জানা নেই, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িত রয়েছে বলে বর্তমানের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি দলকেও সন্দেহ করা হয়ে থাকে.

এই বারের এই রায় দিয়ে মূল আঘাত প্রসঙ্গতঃ, বিএনপি দলের বিরুদ্ধে করা হয় নি, বরং তাদের প্রধান জোটসঙ্গী জামাত-এ-ইসলামি দলের বিরুদ্ধেই করা হয়েছে. এই দলের নেতা আবদুল কাদের মোল্লাকে ফেব্রুয়ারী মাসে সামরিক অপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছিল. এই রায় দুই পক্ষের তরফ থেকেই প্রতিবাদের কারণ হয়েছিল: মোল্লার বিরোধীরা ধরে নিয়েছিল যে, এটা খুবই কম শাস্তি ও দাবী করেছিল মৃত্যুদণ্ডের, আর তার পক্ষের লোকরা বলেছিল রাজনৈতিক কারণেই রায় দেওয়া হয়েছে আর তারা দাবী করেছিল মোল্লাকে ছেড়ে দেওয়া হোক, ভলখোনস্কি এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

“আওয়ামী লীগ দেশের পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল, তারা খুবই সহজে নতুন এক আইন নিয়েছে, যা আগে নেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে অ্যাপীল করে আরও কড়া রায় দেওয়াতে পারে. এটাই নীতিগত ভাবে বিশ্বে বাস্তবে যা ঘটে, তার থেকে আলাদা হয়েছে. সাধারণতঃ আইন যা শাস্তিকে আরও কড়া করে থাকে, তার কোনও উল্টো রায় হতে পারে না”.

দেশের সুপ্রীম কোর্ট দুটি অ্যাপীল দেখেই – একদিকে সরকারের পক্ষ থেকে মোল্লার শাস্তি কড়া করার ও অন্যদিকে মোল্লার উকিলের পক্ষ থেকে তাকে নির্দোষ প্রমাণ করার – সরকারের পক্ষই নিয়েছে. আর মঙ্গলবারে তার মৃত্যুদণ্ডই ঘোষণা করেছে. এই রায়ের প্রতিবাদে বিরোধী পক্ষ দুদিনের হরতাল ডেকেছিল, যা দেশের সমাজ জীবন ও ব্যাবসা বাণিজ্যের জীবনকে প্রায় অচল করে দিয়েছিল ও পুলিসের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণ হয়েছিল.

এই পুরো পরিস্থিতিতেই রাজনৈতিক ব্যাপারগুলোকে আইনের থেকে আলাদা করার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু এটা করাই খুব কঠিন. একদিকে আবদুল কাদের মোল্লা (অথবা তারই মতন যে কেউই হতে পারে), যে এই ধরনের ভয়ানক সমস্ত অপরাধ করেছে, তার জন্য শাস্তি হওয়া দরকার. কিন্তু বর্তমানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যা আমরা দেখতে পাচ্ছি তাকে অনায়াসে আইনের উপরে রাজনৈতিক ভাবে উদ্দেশ্য প্রণোদিত ভাবে কাজ বলে ব্যাখ্যা করা যায়: বলা যেতে পারে যে, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনের আগে এই ভাবেই রাজনৈতিক ক্ষেত্রকে “খালি” করা হচ্ছে, যাতে বেশী করেই বিরোধী পক্ষের উপরে আঘাত করা যেতে পারে – এই রকমই মনে করেন এই রুশ বিশারদ বরিস ভলখোনস্কি.