শান্তিপূর্ণ উপায়ে সিরিয়ার সংকট সমাধানের সম্ভাবনা দেখা দেয় গত ৯ সেপ্টেম্বর সোমবার। ওই সময়ে লন্ডনে একটি সাংবাদিক সম্মেলনে মার্কিন পররষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছিলেন, বাশার আসাদ যদি আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে রাসায়নিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের কাছ তুলে না দেয় সেক্ষেত্রে সিরিয়ার ওপর সামরিক হামলা চালানো হবে। তখন কেরি নিজেও হয়ত ভাবেন নি যে তাঁর বক্তব্যের রেশ অনেক দূরে চলে যেতে পারে। অনেক মার্কিন বিশেষজ্ঞরা এভাবেই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছেন। মস্কোতে এ সংবাদ পৌছায় স্থানীয় সময়ে বিকেলের দিকে। আর এরপরই জরুরি এক সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয় সোমোলেনস্কী স্কোয়ারে। সেরগেই ল্যাভরোভ যে বিবৃতি সংবাদ সম্মেলনে দিয়েছিলেন তা হয়ত পরবর্তিতে ইতাহাসের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হবে। সিরিয়ার সংকট ইতিহাসের পাল্টা চিত্রপটে রুপান্তর। সেরগেই ল্যাভরোভ বলেছেন, "আমরা সিরিয়ার সরকারকে শুধুমাত্র রাসায়নিক অস্ত্রের ওপর আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিতে বলছি না বরং পরবর্তিতে তা ধ্বংস করা এবং রাসায়নিক অস্ত্র নিরস্ত্রকরণ কনভেনশনে যুক্ত হওয়ার আহবান করেছি।"

সিরিয়ার পক্ষ থেকে খুব জলদিই পাল্টা উত্তর দেওয়া হয়। নিজেদের মজুদে থাকা রাসায়নিক অস্ত্র আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে দিতে সম্মতি জানায় দামাস্কাস। ঠিক এর পরের দিনই রাশিয়া সিরিয়ার সংকট নিরসণের ধাপে ধাপে কার্যপ্রনালী যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাঠায়। এর প্রথম ধাপ হচ্ছে- রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ কনভেনশনে সিরিয়ার যুক্ত হওয়া. দ্বিতীয় হচ্ছে- দামাস্কাসকে রাসায়নিক অস্ত্র মজুদ থাকা ও তৈরীর স্থান ঘোষণা করা। তৃত্বীয় হচ্ছে- আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের রাসায়নিক অস্ত্র মজুদের অবকাঠামো পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া। চতুর্থ ও সর্বশেষ ধাপ হচ্ছে- কোথায়, কারা এবং কিভাবে ওই সব রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংস করবে। সিরিয়ানদের এই পরিকল্পনাগুলো ভালো লেগেছিল। খুব তাড়তাড়ি রাসায়নিক অস্ত্র নিষিদ্ধকরণ কনভেনশনে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা দেয় দামাস্কাস। আর কিভাবে সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে দেওয়া হবে তা নিয়ে ল্যাভরোভ ও কেরি শুক্রবার জেনেভায় আলোচনা শুরু করেন। অত্যন্ত গোপন পরিবেশে তাদের মধ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

শনিবার দিনের মধ্যভাগে চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। বৈঠক শেষে এক চুড়ান্ত প্রেস বিফিংয়ে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরোভ ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি জানিয়েছেন যে একটি নীতিগত সিদ্ধান্তে তাঁরা পৌছেছেন।

আগামী ১ সপ্তাহের মধ্যে দামাস্কাস রাসায়নিক অস্ত্রের পূর্ণ তথ্য জাতিসংঘের কাছে পেশ করবে এই মর্মে ঐক্যমতে পৌছায় রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই উদ্দেশ্যে পৌছানের জন্য স্বচ্ছ ও সময়স্বাপেক্ষ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন কেরি। অন্যদিকে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেরগেই ল্যাভরোভ বলেছেন যে, সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনের এক পার্শ্ব বৈঠকে বারাক ওবামা ও ভ্লাদিমির পুতিন যে লক্ষ্যমাত্রা নির্দিষ্ট করেছিলেন তা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র সম্পূর্ণ ধ্বংস করার পথে এটি প্রাথমিক অর্জন বলে উল্লেখ করেন ল্যাভোরভ। তিনি বলেন, "অবশ্যই, সিরিয়ার ওপর সামরিক হামলার প্রসঙ্গ এখন আর আসছে না। কোন প্রকার স্বংয়ক্রিয় নিষেধাজ্ঞাও সিরিয়ার ওপর জারি করা কথা উল্লেখ করা হয়নি। যে কোন ধরণের আইন অমান্য কর্যকলাপ হলে তার সিদ্ধান্ত নিবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ।"

সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে ধ্বংস করতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে রাশিয়া ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নভেম্বরের মধ্যে সিরিয়া সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে জাতিসংঘ পরিদর্শকদের। রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে করনীয় সিদ্ধান্ত নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনায় নেওয়া হবে।