রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি এই প্রসঙ্গে বলেছেন:

“ইতিহাস – একটা আশ্চর্য জিনিষ. যখন রাজনৈতিক নেতারা সেই দিয়েই মনে থেকে যান, যা তাঁরা করেছেন, তার থেকে যা তাঁরা করেন নি সেই দিয়েই বেশী করে. বারাক ওবামাকে ২০০৯ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল, যখন তিনি মার্কিন রাষ্ট্রপতি হিসাবে কোন কিছুই স্রেফ করে উঠতে পারেন নি. স্রেফ এই কারণেই যে, তখন মনে হয়েছিল যে, তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের মত নন”.

পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আসিফ আলি জারদারিকে নিয়েও একই ধরনের কিছু একটা ঘটে গিয়েছে. তিনি নিজের পদে অনেকটাই হঠাত্ করে নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০০৮ সালে – স্রেফ এই কারণে যে, ২০০৭ সালের শেষে তাঁর স্ত্রী বেনজির ভুট্টো নিহত হয়েছিলেন, যাঁকে মনে করা হয়েছিল এই পদের সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী বলেই.

আর পাঁচ বছর জারদারির রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে কোন রকমের বিশেষ সাফল্য দিয়ে উল্লেখ করার মতো হয়ে ওঠে নি বলেই বরিস ভলখোনস্কি মনে করেছেন. বরং উল্টোই হয়েছে – এটা ছিল একটা কঠিনতম পরীক্ষার সময়, যার থেকে প্রশাসন মোটেও সব সময়ে বিজয়ী হতে বের হতে পারে নি. অর্থনীতিতে সমস্যা বেড়ে উঠেছে, সন্ত্রাসবাদ ডানা মেলেছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিরা শক্তি অর্জন করেছে, এক সময়ের প্রধান স্ট্র্যাটেজিক জোটসঙ্গী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ঐতিহাসিক ভাবে সবচেয়ে নীচু স্তরেই নেমে এসেছে. আর হ্যাঁ, এমনকি রাষ্ট্রপতি নিজেও শুধু নিজের ভুলের জন্যই ক্রমাগত সমালোচনার আগুনের নীচে থাকেন নি, বরং তিনি হয়েছেন এক অভিযোগের লক্ষ্য, তাঁরই আগে করা দুর্নীতির জন্য, যার ছায়া তাঁর পেছনেই সেই নব্বইয়ের দশকে থেকে অনুসরণ করে চলেছিল. আর যদি তাঁর পক্ষে এই পদে সাংবিধানিক মেয়াদের শেষ অবধি বসে থাকা সম্ভব হয়েও থাকে, তবে সেটা হয়েছে শুধু সেই কারণেই যে, তিনি নিয়মিত ভাবে নিজের মন্ত্রীসভার সদস্যদের আরও দুর্বল ঘুঁটি হিসাবে বিসর্জন দিয়ে গিয়েছেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রীকেও, যা ঘটেছিল ২০১২ সালের জুন মাসে ইউসুফ রেজা গিলানির সঙ্গে. এই প্রসঙ্গে তাই বরিস ভলখোনস্কি আবারও বলেছেন:

“অবশেষে, ২০১০ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে কিছু পরিবর্তন করা হয়েছিল, যার ফলে পাকিস্তান জারদারির আগে রাষ্ট্রপতি থাকা পারভেজ মুশারফের সময়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত প্রজাতন্ত্র থেকে পরিবর্তিত হয়ে পার্লামেন্ট পরিচালিত প্রশাসনে পরিণত হয়েছিল. যতদিন পাকিস্তান পিপলস্ পার্টি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে ক্ষমতায় ছিল, ততদিন রাষ্ট্রপতি জারদারির পক্ষে সম্ভব হয়েছিল সেই বাইরে থেকে দেখতে পাওয়ার মতো ব্যাপারটাকে বহাল রাখা যে, তিনিই দেশের সর্বময় কর্তা. কিন্তু এই বছরের বসন্তে দেশের পার্লামেন্ট নির্বাচনের সময়ে এই দল সম্পূর্ণ ভাবে পরাজিত হয়ে যাওয়ার পরে, দেশের বাস্তব পরিস্থিতি দেশের প্রধান আইনের সঙ্গে আক্ষরিক অর্থেই মিলেছে: নতুন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সময়ে জারদারি আড়ালে চলে গিয়েছেন, যা সংবিধানেই লেখা রয়েছে, সেই রকমই”.

আর তা স্বত্ত্বেও, আসিফ আলি জারদারির পক্ষে সম্ভব হয়েছে নিজের নামকে ইতিহাসে লেখার. শুধু এই কারণেই যে, তাঁর রাষ্ট্রপতিত্বের সময়ে পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম তা মেয়াদের আগে শেষ হয়ে যায় নি. অবশ্য তার জন্য কার কৃতিত্ব যে বেশী – জারদারির, নাকি তাঁর সময়ে পাকিস্তানের পদাতিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আশফাক পারভেজ কায়ানির, তা ইতিহাসই বলে দেবে, প্রসঙ্গতঃ সেই কায়ানি নিজেও এই বারে হেমন্তে অবসর নিতে যাচ্ছেন. যে কোন ক্ষেত্রেই একটা প্রাক্ ইতিহাস তৈরী করা সম্ভব হয়েছে, যা দেখিয়ে দিয়েছে যে, পাকিস্তান স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পথেই চলতে শুরু করেছে, যা সামরিক অভ্যুত্থান দিয়ে আর ব্যাহত হচ্ছে না, যেমন হয়েছিল এই দেশের প্রায় সমস্ত ইতিহাস জুড়েই, তাই ভলখোনস্কি যোগ করে বলেছেন:

“নতুন রাষ্ট্রপতি মামনুন হুসেইনের ব্যক্তি পরিচয়, যাঁকে এই পদে জুলাই মাসের শেষে নির্বাচন করা হয়েছে, তা শুধু এটাই বিশেষ করে উল্লেখ করে যে, এই প্রক্রিয়া একটা স্থিতিশীল চরিত্র নিতে চলেছে, আপাততঃ আমরা সেটাকে পরিবর্তনের অযোগ্য বলার বিষয়ে সাবধানী থাকবো. তাঁর সম্পর্কে খুব কমই জানা রয়েছে, শুধু জানি যে, তিনি ব্যবসাদার ও এমন একজন মানুষ, যিনি নওয়াজ শরীফের প্রতি খুবই অনুগত. বিশেষ কোন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নতুন রাষ্ট্রপতির নেই, যদি শুধু সে টুকুই হিসেবের মধ্যে না আনা হয় যে, তিনি ১৯৯৯ সালে সিন্ধু প্রদেশের রাজ্যপাল পদে নির্দেশ অনুযায়ী অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন আর সেই বছরেই সামরিক অভ্যুত্থানের পরে তাঁকে পদচ্যুত করা হয়েছিল”.

প্রসঙ্গতঃ, যেহেতু অন্তত পক্ষে আগামী পাঁচ বছরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি হবেন একেবারেই আনুষ্ঠানিক এক ব্যক্তি মাত্র, তাই রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায় তাঁর কোন প্রয়োজনও নেই. প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আনুগত্যই অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ.