এই দলিল থেকে যা বোঝা গিয়েছে, আমেরিকার গুপ্তচর বাহিনীর বিশেষ অপারেশনের বাজেটের একটা বড় অংশ এশিয়াতে আমেরিকার মুখ্য জোটসঙ্গী পাকিস্তানের পারমাণবিক অস্ত্র ভাণ্ডারের উপরে নজরদারি করার জন্য খরচা করা হয়েছে. হুমকির তালিকায় পাকিস্তান এমনকি ইরান ও উত্তর কোরিয়াকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে. এই স্ক্যান্ডালকে থামাতে গিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে ইতিমধ্যেই ঘোষণা করা হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বিশ্বাস বজায় রেখেছে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র ভাণ্ডারের উপরে নিয়ন্ত্রণ রাখার ক্ষমতা সম্বন্ধে. কিন্তু বর্তমানে প্রকাশ্যে এসে যাওয়া ফাঁস হওয়া খবর সাক্ষী দিয়েছে: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যে বিশ্বাসের মাত্রা রেকর্ড মাত্রায় নীচু হয়েছে, এই রকম মনে করে আমাদের সমীক্ষক সের্গেই তোমিন বলেছেন:

““ওয়াশিংটন পোস্ট” সংবাদপত্রে বের হওয়া খবরের তীক্ষ্ণতা দিয়েছে সেটাই, যে, এই সব তথ্য প্রকাশনার আয়ত্ত্বে এসেছে প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার কর্মী এডওয়ার্ড স্নোডেন মারফত. এই সব তথ্যের উপরে ভিত্তি করে সংবাদপত্র এক চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে: সেই সমস্ত রাষ্ট্রের তালিকা, যাদের পারমাণবিক পরিকল্পনা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটা উদ্বেগে কারণ হয়েছে, তাদের প্রথমে রয়েছে পাকিস্তান, ইরান বা উত্তর কোরিয়ার চেয়েও আগে”.

“পাকিস্তান সেই সমস্ত দেশের তালিকায় শীর্ষস্থানে রয়েছে, যাদের প্রসঙ্গে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মার্কিন গুপ্তচর বিভাগ সবচেয়ে বেশী পরিমানে অন্ধকার এলাকার সম্মুখীণ হয়েছে. তা নিয়ে গবেষণার জন্য নতুন করে তৈরী করা বিশ্লেষণ বিভাগের কাজকর্মকে দিক নির্দেশ করা হয়েছে. পাকিস্তানের পারমাণবিক পরিকল্পনার নিরাপত্তা প্রশ্নে ভয় এতই বেশী যে, বিশ্বে বেআইনি ভাবে ছড়িয়ে পড়া গণহত্যার অস্ত্র প্রসারের মোকাবিলা করার জন্য বাজেটের অর্থ দুটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে: পাকিস্তান ও বাকী দেশগুলো”, - উল্লেখ করা হয়েছে এই খবরেই.

যেমন আশা করা হয়েছিল, তেমন ভাবেই ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিক্রিয়াই হয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট কাগজে বের হওয়া খবরের. পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ইজাজ চৌধুরী খুবই কড়া ভাবে নিজেদের দেশের পারমাণবিক কেন্দ্র ও অস্ত্রের নিরাপত্তার অভাবের কথা অস্বীকার করেছেন. যাতে এই স্ক্যান্ডালকে থামানো যায়, তাই পাকিস্তানের পারমাণবিক পরিকল্পনার একটা মূল্যায়নও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে করা হয়েছে. আমরা পাকিস্তানের প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরস্ত্রীকরণ ও প্রসার রোধ নিয়ে করা ঘোষণাকে স্বাগত জানাচ্ছি, বলেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিনিধি জেন পাসকি. প্রসঙ্গতঃ, এটা কিন্তু তাঁকে পরবর্তী মন্তব্য যোগ করা থেকে বিরত করে নি, তিনি বলেছেন, যে কোন দেশেরই পারমাণবিক পরিকল্পনার নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও ভাল করা যেতে পারে. এই প্রসঙ্গে সের্গেই তোমিন বলেছেন:

“পক্ষগুলোর তরফ থেকে এই স্ক্যান্ডাল চেপে যাওয়ার প্রচেষ্টা স্বত্ত্বেও সিআইএ সংস্থার গোপনীয় দলিল ফাঁস হয়ে যাওয়াতে এমনিতেই খুব একটা ভাল নয় এমন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইসলামাবাদ ও ওয়াশিংটনের আরও সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে. কারণ আমেরিকার লোকরা তাদের অনুসরণ করার প্রকল্পগুলোকে আরও প্রসারিত করছে, এটার অর্থ হতে পারে শুধু একটাই: সম্পর্কের ক্ষেত্রে অবিশ্বাস স্পষ্টই বিশ্বাসের চেয়ে বেশী হয়েছে. আমেরিকার গুপ্তচর বিভাগের জন্য দুটো অনুমিত ঘটনা পরম্পরা রয়েছে: সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র সংরক্ষণ ও উত্পাদন কেন্দ্র গুলোর উপরে হামলা, আর তারই সঙ্গে দেশের শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ভিতরেই এই ধরনের জঙ্গীদের ঢুকে পড়ার সম্ভাবনা. পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটি, যেখানে পারমাণবিক অস্ত্র রাখার সম্ভাবনা রয়েছে, তা নিয়মিত ভাবেই সন্ত্রাসবাদীদের পক্ষ থেকে আক্রমণের লক্ষ্য হয়েছে. শেষ বড় আক্রমণ হয়েছে ২০১২ সালের আগষ্ট মাসে কামরা বিমানঘাঁটিতে”.

এখানে বাদ দেওয়া যেতে পারে না যে, সামরিক বাহিনী ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের মধ্যে যারা কট্টরপন্থী ইসলামে ধারায় বিশ্বাসী, তারাই তৈরী আছেন এই ধরনের কট্টরপন্থীদের পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডারে যাওয়ার রাস্তা করে দিতে. অর্থাত্ তাদেরই, যারা এটা অর্থের জন্য না করে স্রেফ আদর্শের নামে করতেই পারে. কারণ ২০০০ সালের আগে পাকিস্তানে একটা বেআইনি সংগঠন ছিল “মুসলিম উম্মার পুনর্গঠন” নামে, যাতে পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ গুপ্তচর বিভাগের কর্মকর্তারা ছিলেন, নৌবহরের অফিসার আর পারমাণবিক বিজ্ঞানীরাও ছিলেন. কিছু তথ্য অনুযায়ী তাদের নেতা সুলতান বশিরুদ্দীন মাখমুদ ওসামা বেন লাদেনের সঙ্গেও দেখা করেছিল আর তাকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরীর বিষয়েও পরামর্শ দিয়েছিল.

সুতরাং উদ্বেগের কারণ রয়েছে, কিন্তু পাকিস্তানের পারমাণবিক পরিকল্পনার উপরে গোয়েন্দাগিরি করে ওয়াশিংটন শুধু তাদের জোটের লোকদের প্রতিই সম্পূর্ণ রকমের অবিশ্বাসের প্রদর্শনী করে নি, বরং নিজেদের পক্ষ থেকে ইসলামাবাদের সঙ্গে নিরাপত্তা বিষয়ে সহযোগিতার ব্যাপারেই একটা অনাস্থা প্রস্তাব করেছে. আর তাতেই স্বাক্ষর করেছে যে, তারা শত কোটি ডলার বিনা কারণেই খরচ করে যাচ্ছে.