শুরু করছি আমাদের পাক্ষিক অনুষ্ঠান – ‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’.

এই অনুষ্ঠানে আমরা আপনাদের পাঠানো রাশিয়া সম্পর্কে প্রশ্নাবলীর উত্তর দিয়ে থাকি. তাই ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানের পাঠক ও শ্রোতাদের কাছে অনুরোধ যত বেশি সম্ভব রাশিয়া সম্পর্কে জানতে চাওয়া আগ্রহোদ্দীপক প্রশ্ন পাঠানোর.

আজ আমরা উত্তর দেব নিম্নোক্ত দুটি প্রশ্নেরঃ

পাকিস্তানেরই ফয়জলাবাদ থেকে মাহমুরা সুলতানা প্রশ্ন করেছেন – রাশিয়ায় কত বাঁধ (ড্যাম)আছে ? 

এবার উত্তর দিচ্ছি পাকিস্তান থেকে আজম আলি সুমরোর পাঠানো প্রথম প্রশ্নটার – সোভিয়েত আমলের মস্কোর সাথে আজকের মস্কোর কোনো ফারাক আছে কি ?

 হ্যাঁ, অবশ্যই. কয়েকদিন আগে আমাদের মহানগরীর সেন্টারে বেড়াতে গিয়ে আমি ভাবছিলাম, যে আমাদের পাকিস্তানি শ্রোতার পাঠানো প্রশ্নের কি উত্তর আমি দেবো. বিগত কয়েক বছরে মস্কো সত্যিই অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে. বিশেষতঃ মস্কো সুন্দরী বসন্তে, গ্রীস্মে ও শরতের শুরুতে, যখন নগরী সবুজে সবুজ, আর প্রায় প্রত্যেক বাড়ির সামনে ফুলের মেলা. নতুন নতুন সুদৃশ্য ভবন তৈরী হয়েছে, অজস্র নতুন বহুতল বাড়ি. শুধুমাত্র গত এক বছরের মধ্যে মস্কোর পুরাতন ৮০০টি ভবনের ফ্যাসাডের(সম্মুখরূপের)সম্পূর্ণ সংস্কার করা হয়েছে. খাঁটি মস্কোবাসীদের জন্য, যারা মহানগরীর কেন্দ্রস্থলের অবয়ব অটুট রাখতে চায়, তাদের জন্য এই তথ্য মহার্ঘ্য.

 অধিকাংশ পাঁচতলা প্যানেল নির্মিত বাড়ি উচ্ছেদ করা হয়েছে, যেগুলো ৫০-৬০ বছর আগে নির্মাণ করা হয়েছিল সেই আমলে বাসস্থানের প্রবল ঘাটতি সামাল দেওয়ার জন্য. সেই জায়গায় ২৪ তলা, এমনকি ৪০ তলা কংক্রীটের বিল্ডিং গজিয়ে উঠছে. হাজার হাজার মস্কোবাসী হয় নিজের পয়সায় অথবা সরকারের সূত্রে তাদের বাসগৃহের উত্কর্ষমান বাড়িয়েছে.

 বহু নতুন দোকানঘাট খুলেছে, সর্বত্র জ্বলজ্বলে বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি. বিশ্ববন্দিত ব্র্যান্ডের কোম্পানীগুলি শহর জুড়ে তাদের শো-রুম খুলেছে. সোভিয়েত আমলের মতো এখন আর খাবার, পোষাক বা যে কোনো কিছু কেনার কোনো সমস্যা নেই, পয়সা থাকলেই হল. সেকালে লোকের কাছে পয়সা ছিল, কিন্তু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দুর্লভ ছিল. এখন মস্কোবাসীরা তাদের আর্থিক ক্ষমতা অনুসারে নিজেরাই পছন্দ করে নেয়, যে কি তারা কিনবে. যেমন অত্যন্ত দামী অভিজাত শো-রুম আছে, তেমনই আছে অসংখ্য সস্তা সামগ্রীর দোকান.

 জিনিসপত্রের প্রাচুর্যতার কারণে শুধু মস্কো কেন, সারা দেশেই আর লাইন বা কিউ বলে কিছু নেই. অদ্ভুত, কিন্তু আজকের দিনে লাইন শুধু দেখতে পাওয়া যায় মস্কোর জগদ্বিখ্যাত পুশকিন ভ্যিজুয়াল আর্ট মিউজিয়ামের সামনে, যখন সেখানে বিশ্ববিখ্যাত কোনো শিল্পকলার সাময়িক প্রদর্শনী হয়.

 আর কি যে মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা নামার পরে মস্কো নগরী! ঐতিহাসিক ভবনগুলি, ফোয়ারাগুলি, স্মৃতিমুর্তিগুলি বিশেষ আলোর ব্যাঞ্জনায় সাজানো. সবকিছু ঝকমক করে, আমেজটাই যেন হয়ে ওঠে উত্সবের. সেইজন্য আমরা চেষ্টা করি অন্তত একটু সময় বের করার সন্ধ্যার পরে মস্কোয় ঘোরার জন্য.

কিন্তু মস্কোয় যানজটের সমস্যা তীব্র হয়ে দাঁড়িয়েছে. আগে যানজট হতো কখনো কখনো সেন্টারে. কিন্তু আজকাল শহরের যে কোনো জায়গায় গাড়িতে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতে হতে পারে.

 আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই. গত দুই দশকে মস্কোয় গাড়ির সংখ্যা খুব বেড়েছে. মস্কোয় রেজিস্ট্রিকৃত গাড়ির সংখ্যা ৪০ লক্ষ! ভাবুন একবার! এর উপর যোগ করুন প্রতিদিন প্রতিবেশী শহরগুলো থেকে যাতায়াত করা অসংখ্য গাড়ি. এবং সবারই তো কোথাও পার্কিং করাতে হয়. এইমুহুর্তে যানজটের সমস্যায় মস্কো মহানগরীর নাভিশ্বাস উঠছে. গাড়িচালকরা বিরক্ত হয়, রেগে যায়. কিন্তু নগর প্রশাসন এখনো এই সমস্যার সমাধা করে উঠতে পারেনি.

 সত্যি কথা বলতে কি, অধিকাংশ মস্কোবাসীর মতোই আমিও এই সমস্যায় তেমন জর্জরিত হই না. পাবলিক ট্র্যান্সপোর্ট – বাস ও ট্রলিবাসের জন্য এখন সর্বত্র আলাদা লেন, আর বিশ্বসেরা মস্কোর মেট্রো তো প্রায় সর্বত্র নাগালের মধ্যেই. গাড়ি ছাড়াও নগরীর যে কোনো জায়গায় দ্রুত পৌঁছানো যায়.

ল্যুসিয়াঃ প্রসঙ্গতঃ জানাই, যে গত কয়েক বছরের মধ্যে মস্কো মেট্রোর স্টেশনের সংখ্যা বেড়ে ১৮৮ হয়েছে এবং মেট্রো রেলের মোট দৈর্ঘ্য হয়েছে ৩০০ কিলোমিটার.

 আরও একটা ইতিবাচক দিক. ইদানীং রাস্তাঘাট ও পার্কগুলি অনেক বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন. কারণটা হচ্ছে এই, যে এই সল্পবেতনের ও মর্যাদাহীন কাজে আসছে বিপুল সংখ্যায় প্রাক্তন সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রগুলির অধিবাসীরা. ওদের ওখানে প্রচন্ড বেকারীত্ব, আর যাই হোক না কেন, মস্কোয় রোজগারের মাত্রা অনেক ওপরে. 

‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ অনুষ্ঠান শুনছেন আপনারা ‘রেডিও রাশিয়া’ থেকে. এবার আসছি পাকিস্তানের ফয়জলাবাদ থেকে মাহমুরা সুলতানার প্রশ্নের উত্তরে – রাশিয়ায় কত বাঁধ(ড্যাম)আছে ?

সঠিক সংখ্যা কেউ জানে না, তবে আমরা মোটামুটি হিসাব দিতে পারি দেশে জলবিদ্যুত কেন্দ্রগুলির সংখ্যা থেকে. এক হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুত উত্পাদনকারী জলবিদ্যুত কেন্দ্র আমাদের দেশে ১৫টি. আর সবমিলিয়ে জলবিদ্যুত্কেন্দ্রের সংখ্যা দুইশোরও বেশি.

রাশিয়ার উচ্চতম বাঁধ ককেশাসে দাগেস্তান প্রজাতন্ত্রে অবস্থিত. ওখানে দুটো পাহাড়ের মধ্যবর্তী সরু নদীপথের উপর ২৩৩ মিটার উচ্চতায় বাঁধ আছে.

কেবলমাত্র জলবিদ্যুত্কেন্দ্র নির্মাণ করার জন্যই বাঁধ দেওয়া হয় না, আরও দেওয়া হয় বানভাসি রোখার জন্য. তবে বাঁধের সঠিক সংখ্যা জানানো অসম্ভব, কারণ ছোট-বড় মিলিয়ে রাশিয়াতে প্রবাহিত হয় ২০ লক্ষেরও বেশি নদীনালা.

সুতরাং এই অবান্তর বিষয়ে এখানেই ইতি টানছি, বরং এবার একটা গান শুনুন. –

‘রাশিয়ার আদ্যোপান্ত’ অনুষ্ঠানটি এবারের মতো এখানেই শেষ করছি. রাশিয়া সম্পর্কে আমরা আপনাদের নতুন নতুন প্রশ্নের অপেক্ষায় থাকবো. ইন্টারনেটে আমাদের কাছে লেখার ঠিকানা – lettera@ruvr.ru, আর ডাকযোগে আমাদের কাছে চিঠি পাঠানোর ঠিকানা – Voice of Russia, Broadcasting for India & Pakistan section, 25, Pyatnitskaya st. Moscow-115326, Russia.

আদাব!

নমস্কার!