কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সবার আগে ক্ষমতাসীন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস মোদীর মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করার দাবী করেছে. প্রসঙ্গতঃ, বিরোধী দল জনতা পার্টির কাছেও নিজেদের এক তৈরী করা জঞ্জালের পাহাড় রয়েছে, যা তারাও কংগ্রেসের নেতাদের উপরে ঢালার জন্য তৈরী রয়েছে. সুতরাং সর্বজনীন লোকসভা নির্বাচনের এগিয়ে আসার সাথে সাথেই এই ধরনের স্ক্যান্ডাল নিয়ে যুদ্ধের পরিমাণ খালি বাড়তেই থাকবে.

নতুন স্ক্যান্ডাল যে, নরেন্দ্র মোদীকেই আবার স্পর্শ করেছে, তা নিয়ে কোনও অবাক হওয়ার মতো কিছু নেই – এই ব্যক্তিত্বই খুবই পরস্পর বিরোধী. বাস্তবে, তিনি নিজের মধ্যেই বেশ কিছু একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকা ভূমিকা চরিতার্থ করে চলেছেন, এই রকম মনে করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“একদিক থেকে, মোদী – একজন খুবই ফলপ্রসূ ম্যানেজার, আর গুজরাট রাজ্যের অর্থনৈতিক বিকাশের সাফল্য এমনকি তাঁর অনেক রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও এই বিষয়ে নেতিবাচক বক্তব্য দেওয়া থেকে বিরত করেছে. এমনকি যদি এই রাজ্যের বাসিন্দাদের কথা না ধরাও হয় তাহলে, যারা তাঁকেই গত বছরের শেষে এই নিয়ে পরপর তিনবার মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে নির্বাচন করেছেন. অন্যদিক থেকে, ইনি খুবই আদর্শ হিসাবে দেখানো একজন রাজনীতিবিদ, তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিকল্পনাকে “হিন্দুত্বের” উপরে নীতিগত ভাবে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন – যেখানে কট্টর হিন্দু ধর্মের নিয়মের কথা বলা হয়েছে. আর ঠিক এই কারণেই তাঁর পিছনে একসারি অভিযোগ অনুসরণ করে চলেছে – তার মধ্যে ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলমানদের ধ্বংস করার ঘটনাও রয়েছে”.

আর এবারে আবার নতুন অভিযোগ, যাতে মোদীর ব্যক্তিত্বের এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে. কোন এক প্রাক্তন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার ডি. জি. বানজারা, যিনি ২০০৭ সাল থেকে বিচারের অপেক্ষায় বসে আছেন এই বিনা বিচারে হত্যার অভিযোগেই, তিনি এক চিঠি লিখেছেন, যাতে জোর দিয়ে বলেছেন যে, এই সমস্ত হত্যাকাণ্ড হয়েছে গুজরাট রাজ্যের প্রশাসনের সরাসরি নির্দেশেই ও মোদী শুধু এই বিষয়ে জানতেনই নয়, তিনি সেই প্রশাসনের নেতাও ছিলেন.

এই প্রসঙ্গে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বানজারা যে ঘোষণা করেছেন – তা আজকের দিনে মোদীর অপরাধের একমাত্র প্রমাণ, তার ওপরে তাও আবার কোন প্রমাণ ছাড়াই. এই কথা সিবিআই এর প্রধান রঞ্জিত সিংহও মেনে নিয়েছেন, যিনি স্বীকার করেছেন যে, “বানজারা যে চিঠি লিখেছেন, তার শুধু রাজনৈতিক মূল্যই রয়েছে, কোন আইন সম্মত মূল্য নেই””.

কিন্তু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা এই সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজী হন নি, তারা সেই লোকের উপরেই আবার করে আক্রমণ শুরু করেছেন, যাকে অনেকেই ভারতে আগামী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেখছেন. মোদীর বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা করতে আহ্বান করেছে ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি আর কংগ্রেসের পক্ষ থেকে গুজরাটে শুক্রবারে বন্ধ করানোর চেষ্টা হয়েছে. বহু শত সক্রিয় কর্মী রাস্তাঘাটে গাড়ী চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিল, কিছু শহরে কল কারখানা বন্ধ হয়েছিল শতকরা ৮০ ভাগ. দাখুদ শহরে মোদীর কুশ পুত্তলিকা জ্বালানোর সময়ে এমনকি পুলিশের গাড়ীও পুড়ে গিয়েছে. উত্তরে প্রশাসন ৬০০ জন কংগ্রেস কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে.

এর পরেই বেশ কিছু দলের পক্ষ থেকে দাবী করা হয়েছে এই প্রশ্ন নিয়ে পার্লামেন্টে আলোচনা করার, তারা স্পষ্টই চেষ্টা করেছে মোদীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনাকে একেবারেই নষ্ট করে দিতে. প্রসঙ্গতঃ, এই সব স্ক্যান্ডালের যুদ্ধ – তা একতরফা অস্ত্র নয়. বিজেপি দলেরও কংগ্রেসের নেতাদের বিরুদ্ধে বহু স্ক্যান্ডাল জমা করা রয়েছে. যা নিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছে এই ঘোষণা করে যে, তারা বানজারা যে চিঠি লিখেছে, তা নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত রয়েছে শুধু সেই ক্ষেত্রেই, যদি কংগ্রেস রাজী হয় হরিয়ানা রাজ্যে সোনিয়া গান্ধীর জামাতা রবার্ট ভদ্রের জমি কেলেঙ্কারি নিয়ে আলোচনা করতে, তাই ভলখোনস্কি আবারও বলেছেন:

“আসলে ছবিটা খুবই শোকের. ভারতের অর্থনীতি মোটেও ভাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে না, কিন্তু এই সঙ্কট থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজার বদলে রাজনৈতিক নেতারা একে অপরের উপরে কাদা ছুঁড়ছেন. এই রকমের একটা পারিপার্শ্বিকে বিশেষ করে চোখে পড়ে যাচ্ছে সেই জনমত গ্রহণের ফলাফলই, যা ভারতের “ইকনমিক টাইমস” পত্রিকার পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে, ভারতেরই বড় কোম্পানীগুলোর কর্ণধারদের থেকে. শতকরা ৭৪ ভাগ ভারতীয় ব্যাবসায়ী মহলের নেতারা মোদীকেই আগামী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে সমর্থন করেছেন, আর শুধু ১০ শতাংশ মনে করেন যে, এই ভূমিকায় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সবচেয়ে সম্ভাব্য প্রার্থী রাহুল গান্ধী উপযুক্ত হবেন”.

দুঃখের বিষয় হল যে, “বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের” রাজনীতিবিদরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সবচেয়ে খারাপ দিকটাকেই নিজেদের হাতিয়ার করছেন, বাস্তব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনার বদলে কেলেঙ্কারি নিয়ে যুদ্ধ বাধিয়ে.