নভি পিল্লাইয়ের শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের লক্ষ্য ছিল সত্য নির্ধারণ, সেই সমস্ত প্রশ্নের ক্ষেত্রে, যা মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে রয়েছে, প্রথমতঃ, তামিল সংখ্যালঘুদের অধিকার, যা ২০০৯ সালের গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে আছে. এই প্রসঙ্গে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“শ্রীলঙ্কাতে নির্দিষ্ট কিছু বৃত্তের লোকরা, প্রাথমিক ভাবে সিংহলী জাতীয়তাবাদীরা রাষ্ট্রসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনের হাই কমিশনারের সফর নিয়ে প্রথম থেকেই নেতিবাচক মনোভাব নিয়েছিল. তাঁকে স্বাভাবিক ভাবেই একেবারে শুরুতে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, যদিও তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক, তবুও তিনি প্রজাতিগত বিচারে নিজেই – তামিল মহিলা. সংবাদ মাধ্যমে এমনকি সেই ধরনের সংজ্ঞাও দেখতে পাওয়া গিয়েছিল যে, “রাষ্ট্রসঙ্ঘে থেকে আসা তামিল বাঘিনী” – তাতে ইঙ্গিত করা ছিল যে, শ্রীমতী পিল্লাই সেই সমস্ত রাজনীতির জগতের লোকদের বরাতেই কাজ করছেন, যারা আগের মতই বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর পথ ধরে রয়েছে – অর্থাত্ “তামিল ইলমের স্বাধীনতার টাইগারদের” পথ, যাদের সরকারি ফৌজ চার বছরের কিছু আগে একেবারে দেশের মাটিতে ধ্বংস করে দিয়েছে”.

নিজের সফরের পরিণাম সংক্রান্ত ঘোষণাতে নভি পিল্লাই সেই সমস্ত অভিযোগ খর্ব করার জন্যই তাড়াতাড়ি করে বলে ফেলেছেন যে, তামিল টাইগারদের সংগঠন একটা “হত্যাকারী সংঘ, যারা বহু অপরাধ করেছে ও বহু জীবন নষ্ট করেছে”. তার উপরে তিনি আবার শ্রীলঙ্কার দক্ষিণের এলাকায় যুদ্ধ পরবর্তী বছরগুলোতে মানুষের জীবনে হওয়া বহু ইতিবাচক দিকের কথাও উল্লেখ করেছেন.

কিন্তু এই প্রসঙ্গেই শ্রীমতী পিল্লাই শ্রীলঙ্কার প্রশাসনকে ছাড় দেন নি ও খুবই কড়া সমালোচনা করেছেন. রাষ্ট্রসঙ্ঘের কমিশনার ঘোষণা করেছেন যে, “যুদ্ধ হতে পারে যে শেষ হয়েছ, কিন্তু একই সঙ্গে গণতন্ত্রও ধ্বংস হয়ে গিয়েছে, আর এই দেশে আইনের প্রশাসনের নীতি আর কাজ করছে না”. আর তিনি আবার একটা সিদ্ধান্ত করেছেন যে, “শ্রীলঙ্কা এখন দেখিয়ে দিচ্ছে সেই সমস্ত বিষয়েরই ইঙ্গিত, যা আরও বেশী করেই এক নায়ক তন্ত্রের দিকেই চলেছে”. এই সূত্রে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“বিগত সময়ে শ্রীলঙ্কায় সত্যিই ধর্মীয় সমাজের ভিত্তিতে সংঘর্ষের ঘটনা হয়েছে – তা আবার যত না সিংহলী ও তামিলদের মধ্যে, তার চেয়েও বেশী হয়েছে বৌদ্ধ সিংহলী ও মুসলমান বা ক্যাথলিক খ্রীষ্টানদের মধ্যেই. তারই মধ্যে বিশ্বের সংবাদ মাধ্যমে শ্রীলঙ্কার সমস্যা নিয়ে স্পষ্টই দেখতে পাওয়া গিয়েছে যে, একটা একদেশদর্শী ধারণা তৈরী করা হয়েছে. এটা এমনকি শ্রীমতী পিল্লাইয়ের সফরকে কিভাবে দেখানো হয়েছে, তাতেও ধরা পড়েছে. বিশ্বের সংবাদ মাধ্যম বাস্তবে প্রায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের হাই কমিশনারের ঘোষণার সমস্ত ইতিবাচক দিকগুলোকেই উপেক্ষা করেছে, তার বদলে সম্পূর্ণ ভাবেই মনোযোগ দিয়েছে সমালোচনার বিষয়ে”.

তাই শ্রীলঙ্কার প্রশাসনের প্রতিক্রিয়াও বোধগম্য হয়েছে. রাষ্ট্রপতি মাহিন্দা রাজপক্ষে নবি পিল্লাইয়ের সঙ্গে সাক্ষাত্কারের সময়ে ঘোষণা করেছেন যে, রাষ্ট্রসঙ্ঘকে তাঁর দেশের জনগণ একটা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট সংস্থা বলেই মনে করে. আর সরকারি ভাবে দেওয়া ঘোষণাতে বলা হয়েছে যে, শ্রীমতী পিল্লাইয়ের সিদ্ধান্ত যে, শ্রীলঙ্কা আরও বেশী করেই স্বৈরতন্ত্রের দিকে চলেছে, এটা তাঁর মিশনের দায়িত্ব ও ক্ষমতার বাইরের ব্যাপার.

এই সবই চলছে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ সংস্থার শীর্ষ সম্মেলন বয়কটের আহ্বানের মধ্যে, যা এই বছরের হেমন্তে কলম্বো শহরেই হওয়ার কথা. আপাততঃ এটা বয়কট করার ইচ্ছার কথা জানিয়েছে শুধু কানাডা, কিন্তু ভারত সরকারের কাছ থেকে সেটাই দাবী করছে দেশের নেতৃস্থানীয় তামিল রাজনৈতিক দলগুলো, তাই ভলখোনস্কি আবারও বলেছেন:

“এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল দুটো ব্যাপারকে দেখা. প্রথমটা হল প্রভাবশালী তামিল গোষ্ঠী, যারা তামিল টাইগারদের পরাজয় স্বত্ত্বেও স্বাধীন “তামিল ইলমের” স্বপ্ন দেখা থেকে নিজেদের নিষেধ করে নি. আর এই গোষ্ঠীই খুব শক্তিশালী প্রভাব ফেলছে সামাজিক মতামতের বিষয়ে ও সেই সমস্ত দেশের রাজনীতিবিদদের উপরেও, তাদের মধ্যেই রয়েছে কানাডা. যেখানে খুব একটা কম সংখ্যক তামিল লোক বাস করেন না”.

আর দ্বিতীয়তঃ, শ্রীলঙ্কা আজ শুধু নিজে থেকেই একটি দেশ হিসাবে সংজ্ঞাবহ নয়, বরং তা আরও বেশী করেই ভারত মহাসাগরে চিনের রাজনীতির ঘাঁটি হয়ে দাঁড়াচ্ছে. আর তাই সেই সমস্ত শক্তি, যাদের চিনের প্রসার স্বার্থহানী করেছে, তারাই চাইছে চিনের এই জোট সঙ্গীর উপরে চাপ সৃষ্টি করার, এই রকমই মনে করেছেন রাশিয়ার বিশেষজ্ঞ.