এই পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“ভারতীয় অর্থনীতি আজ খুবই কঠিন সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছে. এই কিছুদিন আগেও, যখন পশ্চিম ২০০৮-২০০৯ সালের সঙ্কটের পরিণতিতে অসুবিধায় ছিল, তখনও ভারতের গড় বার্ষিক উত্পাদনের হার ছিল বছরে ৮, ৫ শতাংশ, আর মনে হয়েছিল যে, ভারত বিশ্বের অন্যান্য উন্নত অর্থনীতিগুলোর চেয়ে সঙ্কটের পরিণামের সঙ্গে ভাল করেই যুঝতে পেরেছে. কিন্তু গত বছরেই এই উন্নতির হার কমে হয়েছিল শতকরা ৫ ভাগ, আর এই বছরের পূর্বাভাস আরও বেশী হতাশাব্যাঞ্জক. আর এটা অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী শুধু সেই কারণেই যে, দেশের জনগনের জীবনযাত্রার মানকে আগের স্তরে ধরে রাখার জন্য প্রত্যেক বছরে উন্নতির প্রয়োজন পড়বে কম করে হলেও শতকরা ৬ ভাগ”.

আজকের পরিস্থিতিতে মনে হতে পারে যে, এটা একেবারেই বিপর্যয় হয়েছে – বরিস ভলখোনস্কি এই সূত্রে যোগ করেছেন যে, ভারতীয় টাকার মূল্যও খুব দ্রুত কমে যাচ্ছে. গত বুধবারে তা এক রেকর্ড সংখ্যা প্রতি মার্কিন ডলারে ৬৮ টাকা ৮৫ পয়সা হয়েছিল. বৃহস্পতিবারে অবশ্য টাকা নিজের অবস্থা কিছুটা ঠিক করতে পেরেছে, কিন্তু এটা দেখা যেতে পারে স্রেফ সাময়িকভাবে টাকার মূল্য সংশোধন বলেই. বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামীতেই এই দাম কমে ডলারে ৭৭ টাকা হতে পারে.

এই রকমের একটা পরিস্থিতিতে বিশেষ করে জোরে শোনা যাচ্ছে পিঁয়াজের দাম – যা ভারতীয় রান্নার একটা মুখ্য উপাদান. আজ এই দাম কিলো প্রতি ৬০ থেকে ৮০ টাকা ছুঁয়েছে, অর্থাত্ গত বছরের গরমের চেয়ে দামে দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে. বিরোধী “ভারতীয় জনতা দল” ও “আম আদমি পার্টি” সরকারের বিরুদ্ধে সত্যিকারের এক প্রচার অভিযান তৈরী করেছে, যা তথ্য মাধ্যমে নাম দেওয়া হয়েছে “পিঁয়াজ যুদ্ধ” বলে. এই দলগুলোর সক্রিয় কর্মীরা সরকারকে শুধু বর্তমানের পরিস্থিতির জন্যই দায়ী করছে না, বরং তারা আবার সাবসিডি দিয়ে ২৫ থেকে ৪০ টাকা দামে পিঁয়াজ বিক্রী করতেও শুরু করেছে. এমন হয়েছে যে, চোরদের জন্য সবচেয়ে ভাল চুরির জিনিষ হয়েছে পিঁয়াজ: দিন দশেক আগে রাজস্থানে একদল লুঠেরা একটা ট্রাক লুঠ করেছে, যাতে করে ৯ টন পিঁয়াজ নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল – বর্তমানের দামে এটা প্রায় পাঁচ থেকে সাত লক্ষ টাকা বা ৭ থেকে ১০ হাজার ডলার.

এই প্রসঙ্গেও ভলখোনস্কি বক্তব্য রেখে বলেছেন:

“ব্যাপারটা অবশ্যই শুধু পিঁয়াজ নিয়েই নয়, এটা বড় জাতের অর্থনৈতিক সমস্যার একটা সূচক, যা আজ ভারত সামনে পড়েছে. অন্য তার থেকেও বেশী গুরুতর সূচক হয়েছে যে, এই বছরের জুন মাস থেকেই ভারত থেকে মূলধন বেরিয়ে গিয়েছে ১ হাজার ১৫ শো কোটি ডলার.

মন্ত্রীসভা চেষ্টা করেছিল অর্থনীতিতে পরিস্থিতি বশে আনার একটা চূড়ান্ত চেষ্টা করে দেখতে, সপ্তাহ দুয়েক আগে দেশের টাকা বাইরে নিয়ে যাওয়া নিয়ে একটা নিষেধ তৈরী করা হয়েছে, আর তারই সঙ্গে দেশে সোনার বার ও মুদ্রা আনাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে. কিন্তু এই সব ব্যবস্থা, যে পরিণাম আশা করা হয়েছিল, তা হতে দেয় নি: একই সময়ে টাকার দাম কমে ৬২ থেকে ৬৯ হয়েছে”.

আর এবারে এই নতুন আইনগুলো নেওয়া হয়েছে. একটা বর্তমানের ৪০ কোটি থেকে ৮০ কোটি দরিদ্র লোককে খাদ্য সরবরাহ দিয়ে সহায়তা করার জন্য নেওয়া হয়েছে, আর একটা ১৮৯৪ সালে নেওয়া জমির মালিকানা হাতবদল নিয়ে আইনে সংশোধন করেছে, যে কারণে ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকা জমি পরিকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্পের জন্য সরকার আগে নিয়ে নিতে পারতো, তাই ভলখোনস্কি আবারও বলেছেন:

“মনে হতে পারত যে, এই সব আইন দেশের বেশীর ভাগ মানুষের জীবন সহজ করার জন্য নেওয়া হয়েছে – বিশেষ করে গ্রামের মানুষের. কিন্তু এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন রয়েছে যে, তা শুধু দেশের অর্থনীতির জন্যই একটা কঠিন সময়ে নেওয়া হচ্ছে না, বরং প্রাক্ নির্বাচনী বছরে. আর খুবই সন্দেহের ব্যাপার হল যে, কি করে দেশের দুই তৃতীয়াংশ লোকের সামাজিক সহায়তার ব্যবস্থা অর্থনৈতিক বিকাশের কারণ হবে. একটা পুরনো সত্য রয়েছে: যদি ক্ষুধার্ত লোককে খেতে দিতে চাও, তবে তাকে মাছ দিও না, বরং একটা ছিপ দিও, সে নিজের জন্য নিজেই করে খাক”.

বোধহয় যে, সরকার স্থির করেছে ক্ষুধার্তদের খেতে দেওয়ার, একটা স্বল্প সময়ের জন্য – আগামী সর্বজনীন নির্বাচনের আগে পর্যন্ত. কিন্তু নিজে থেকে সমস্যা এই ভাবে মিটবে না, বরং আরও গভীর হবে.