“বিগত দশকগুলো ধরেই বহু উন্নয়নশীল দেশ দেখিয়ে দিয়েছে নিজেদের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একেবারেই বিরল রকমের দ্রুত উন্নতি করার ক্ষমতা, যা রপ্তানী বাড়িয়ে করা হয়েছে. এই বিষয়ে পাইয়োনিয়র ছিল দক্ষিণ কোরিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো, যাদের বাঘের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল. আর ২০০০ সালের শুরু থেকেই এই প্রবণতা ছড়িয়ে পড়েছিল বিশাল উপনিবেশ পরবর্তী বিশ্বে: শতকরা ৭৫ ভাগ উন্নয়নশীল দেশে উত্পাদনের উন্নতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির চেয়ে দ্রুত হয়েছে. এই প্রসঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলো দেখিয়ে দিয়েছে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে খুব একটা খারাপ নয়, এমন সূচক: ২০০৩ থেকে ২০০৭ সাল অবধি গড়ে বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে লাভ বেড়ে হয়েছিল মোট জাতীয় উত্পাদনের শতকরা ২ থেকে শতকরা ৬ শতাংশ অবধি”.

বিশেষ করে দেখবার মতো হয়েছিল ব্রিক দেশগুলোর বিষয়ে (এটা ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চিন), যারা আজকের দিনে দক্ষিণ আফ্রিকা এই গোষ্ঠীতে যোগ দেওয়ার পরে ব্রিকস বলে পরিচিত. ২০০০ সালে তাদের সব মিলিয়ে উন্নতির পরিমাণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক রকমের হয়েছিল আর ২০০৭ সালে তা মার্কিন উন্নয়নের গতির চেয়ে চারগুণ বেশী হয়েছিল. এমনকি সঙ্কটের ২০০৯ সালেও ব্রিক দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার ছিল আমেরিকার চেয়ে তিনগুণ বেশী, এই কথা উল্লেখ করে তোমিন বলেছেন:

“উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিকাশ শুধু বিশ্ব অর্থনীতির জন্যই ইঞ্জিনের কাজ করে নি, বরং তাকে মূল ধারাতেই পরিবর্তিত করে দিয়েছে. এই সব দেশগুলোর তরফ থেকে চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বিশ্বে অনেকাংশেই কাঁচামালের দাম বেড়ে গিয়েছিল. একই সময়ে বিশ্বে শিল্পোত্পাদিত পণ্যের দাম ও শ্রমের দাম অনেক কমে গিয়েছিল. এটা সেই কারণেই ঘটেছিল যে, বিশ্বের শ্রমের বাজারে ঢেউ উঠেছিল সস্তা শ্রমিক শ্রেনীর”.

সস্তা শ্রম চলেছিল রপ্তানী হয়ে, আর তার ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানীর ভাগ বিশ্বে গড় বার্ষিক উত্পাদনে ১৯৯৫ সালে শতকরা ১৬ ভাগ থেকে বেড়ে ২০০৮ সালে শতকরা ২৭ ভাগ হয়েছিল. এই রপ্তানীর ফলে পাওয়া অর্থ উন্নয়নশীল দেশগুলো ডলারে সঞ্চয় করতে শুরু করেছিল. এই ধরনের সঞ্চয় তৈরী করার ফলে এই সব দেশের সরকার নিজেদের জাতীয় মুদ্রার বিনিময় হার অপেক্ষাকৃত নিম্ন স্তরেই নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল, ফলে রপ্তানীর মূল্য আরও কমে গিয়েছিল আর তা বিশ্বের বাজারে আরও বেশী করেই প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়েছিল. সবমিলিয়ে ব্রিক দেশগুলো ৪, ৬ ট্রিলিয়ন ডলার জমা করতে পেরেছিল.

কিন্তু আজ পরিস্থিতি নবীন অর্থনীতিগুলোর জন্যই পাল্টে যাচ্ছে – তাদের স্বর্ণ যুগ এবারে শেষ হচ্ছে. গত বছরে উন্নতিশীল দেশগুলোর সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ছিল শতকরা পাঁচ ভাগ. এই বছরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী আরও কম হবে.

আর একই সঙ্গে অর্থনীতিবিদরা উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে মূলধন বেরিয়ে যাওয়া দেখতে পাচ্ছেন, যা খুব বেশী করেই এই বছরের মে মাস থেকে দেখতে পাওয়া গিয়েছে. প্রথমে এর শিকার হয়েছে বিশ্বের কাঁচামালের বাজারে সবচেয়ে বড় রপ্তানীকারক দেশগুলো. দক্ষিণ আফ্রিকার রাণ্ড তার দামের শতকরা সাড়ে তের ভাগ হারিয়েছে, ব্রাজিলের রিয়াল শতকরা ষোল ভাগ “মাইনাসে” গিয়েছে. তারপরে এদের সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার টাকা.

সুতরাং যা ঘটছে আজ ভারতীয় মুদ্রার সঙ্গে – এটা শুধু একটা হিমবাহের চূড়া আর সবার একসাথে “বৃদ্ধির সময়ের রোগের” লক্ষণ এখানেও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর হয়েছে. এখানে একটা বোধের উদয় হয় যে, এই সব দেশগুলোর জন্যে স্বর্ণযুগ আজীবন চলতে পারে না. কিন্তু কোন রকমের বিপর্যয় হবে না – বর্তমানের বিশ্বের আরও কঠোর বাস্তবের সঙ্গেই ধীরে হলেও মানিয়ে নেওয়া ও তার থেকেই উন্নতি করার শুরু হবেই.