‘রাসায়নিক গ্যাস’ অবিলম্বে দামাস্কাসের শহরতলী থেকে ছড়িয়ে পড়লো গোটা বিশ্বে, এমনকি রাষ্ট্রসংঘের সদর-দপ্তরের খাস তালুকে. সেখানে ২১শে অগাস্ট অপরাহ্নেই সিরিয়ায় বিরোধীদের পোষনকারী পশ্চিমী দেশগুলি রাষ্ট্রসংঘে সিরিয়ার বিষয়ে চরম কড়া ঘোষণাপত্র গ্রহণ করানোর জন্য জোরাজুরি করেছিল. রাশিয়া ও চীনের বিশ্বস্ত আঁতাত তাদের নিরস্ত করে, সরেজমিনে তদন্ত শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বাধ্য করেছে.

সপ্তাহান্তে এটা পরিষ্কার হলো, যে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের ঘটনা বাস্তবেই ঘটেছে, তবে ঠিক কি বিষাক্ত গ্যাস এবং সংঘর্ষরত কোন পক্ষের তরফ থেকে তা প্রয়োগ করা হয়েছে – সেই প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে. সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করার ঘটনাগুলির তদন্তের ভার ন্যস্ত আছে রাষ্ট্রসংঘের বিশেষজ্ঞদের বিশেষ কমিশনের উপর, যারা ২০শে অগাস্ট থেকে সিরিয়ায় অবস্থান করছেন.

তবে তাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পূরণ করা সহজ হবে না. তদন্তের কাজ সুসম্পন্ন করা কষ্টকর হবে, যেহেতু ঐ এলাকাটি বর্তমানে বিদ্রোহীদের হেফাজতে – এই মত পোষন করেন রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রকের মুখপাত্র আলেক্সান্দর লুকাশেভিচ. –

যে এলাকাটা নিয়ে কথা হচ্ছে, বর্তমানে সেটি বিরোধীদের দখলে. এই কাজ করতে গেলে রাষ্ট্রসংঘের মিশনকে অভ্যর্থণাকারী পক্ষ হিসাবে সিরিয়ার শাসক কর্তৃপক্ষের সাথে বোঝাপড়ায় আসতে হবে. বিনা কারণে রাষ্ট্রসংঘের উপ-সাধারণ সচিব জন এডিয়াসন বলেননি, যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হলে অন্তত কাজ চলার সময় যুদ্ধ থামানো আবশ্যক.

বিরোধীদের হারাবার আর কিছুই নেই. তারা বুঝে গেছে, যে এই যুদ্ধে তারা কোনোমতেই জিততে পারবে না, আর তাই যেনতেনপ্রকারেণ পশ্চিমী দুনিয়াকে সংঘাতে হস্তক্ষেপ করতে রাজি করানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে, এই চিত্র পরিবেশন করে, যে “ক্ষমতাসীন শাসনব্যবস্থা রক্তলোলুপ ও অমানবিক” – মন্তব্য করছেন স্ট্র্যাটেজিক বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ণ ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ সের্গেই দেমিদেনকো. তিনি বিশেষ করে উল্লেখ করছেন, যে রাসায়নিক আক্রমণের বিষয়ে খবরাখবর প্রচার করছে একান্তভাবেই সেই সব টেলি চ্যানেল, যাদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকরা পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় সিরিয়ার বিরোধী জঙ্গীদের অর্থের অবিরত যোগান দিয়ে চলেছে. –

এসবই অতীতের পুনরাবৃত্তি. যে মুহুর্তে আমেরিকা ঘোষণা করবে, যে সিরিয়ার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করতে যাচ্ছে, তত্ক্ষণাত্ সেখানে রাসায়নিক অস্ত্র খুঁজে পাওয়া যাবে এবং কাতারের টেলি চ্যানেল ‘আল-জাজিরা’ সাথেসাথে প্রচার করে দিল, যে ইতিমধ্যেই তা খুঁজে পাওয়া গেছে. যেই রাষ্ট্রসঙ্ঘের বিশেষজ্ঞদল সিরিয়ায় এলো রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ সম্পর্কে যাচাই করে দেখতে, তত্ক্ষণাত্ দুবাইয়ের টেলি চ্যানেল ‘আল-আরাবিয়া’ প্রচার করে দিলো, যে সিরিয়ার সরকারি ফৌজ ঐ অস্ত্র ব্যবহার করেছে.

বহু পশ্চিমী পন্ডিতদেরও ঘোরতর সন্দেহ, যে রাষ্ট্রীয় ফৌজ এত বড় পাগলামি করতে পারে. সে রকমই এক জন ফ্রান্সের হায়ার স্কুল অফ ন্যাশন্যাল সিকিউরিটির পক্ষপূটে প্রকাশিত ‘ডিফেন্স’ পত্রিকার মুখ্য-সম্পাদক রিশার লাবেভ্যিয়ে. তিনি বলছেন – “সিরিয়ার বিদ্রোহীদের খুব সম্ভবত রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করা ছাড়া আর কোনো গতি ছিল না, যাতে অন্তত এইভাবে বিশ্ব জনসমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়”. –

সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগের প্রতিটি ঘটনা অনুধাবন করা দরকার অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে. প্রত্যেকবার এই বিষয়টির উদ্ভব হয়, যখনই সিরিয়ার বিদ্রোহীরা দুর্বল হয়ে পড়ে – বলছেন রিশার লাবেভ্যিয়ে. ইরাকেও অনেকটা এরকমই ঘটেছিল, এখন ঘটানো হচ্ছে সিরিয়ায়. এখানে মুলতঃ মনস্ত্বাত্তিক যুদ্ধের কথা হচ্ছে, যাতে জনমত নিজের অনুকূলে টানা যায়.

অন্যদিকে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল তার মালয়েশিয়া সফরকালে সাংবাদিকদের কাছে ঘোষণা করেছেন, যে যদি রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামা অনুমতি দেন, তাহলে পেন্টাগন সিরিয়ায় সামরিক অনুপ্রবেশ করার জন্য তৈরী. হেগেল সাংবাদিকদের বলেছেন – “রাষ্ট্রপতি আমাদের সব সম্ভাব্য চিত্রনাট্য চুলচেরা বিচার করে তাকে জানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন. আমরা সেই কাজ সেরে ফেলেছি. আমরা ঘটনাধারার যে কোনো মোড়ের মোকাবিলা করতে প্রস্তুত”.