এই ধরনের ধারণার কারণ হয়েছে চিনের জন্য ভারত মহাসাগরের বিশেষ সংজ্ঞা রয়েছে বলেই. চিনের জন্য জ্বালানী পরিবহনের সামুদ্রিক পথ বর্তমানে রয়েছে জলদস্যূ কবলিত আডেন উপসাগর ও সরু মালাক্কা প্রণালী দিয়েই, যেখানেও জলদস্যূদের সক্রিয়তা সোমালির তীরের কাছের চেয়ে কিছু অর্থেই কম নয়. আর যে প্রণালী ছোটখাট সামরিক শক্তি দিয়েই সহজে বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে – যেমন সেই রকমের শক্তি, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরে অথবা অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম দিকে রেখেছে. আর কারণ হল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুই বছর আগে নিজেদের পররাষ্ট্র নীতির “স্ট্র্যাটেজিক দিক পরিবর্তনের” কথা ঘোষণা করে “এশিয়াতে ফিরে আসার” কথা বলেছে. অর্থাত্ ওয়াশিংটন স্পষ্টই দেখতে পাওয়ার মতো করে নিজেদের স্ট্র্যাটেজি চিনের সম্প্রসারণ বৃদ্ধি আটকানোর জন্য করেছে, তাই রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এখান থেকেই চিনের লক্ষ্য নির্ণয় হয়ে যাচ্ছে, প্রথমতঃ, নিজেদের সামরিক নৌবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করা, আর দ্বিতীয়তঃ, স্থল পথে জ্বালানী পরিবহনের জন্য এড়িয়ে যাওয়ার পথ বের করা – পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মায়ানমার ও থাইল্যাণ্ড হয়ে. চিনের এই স্ট্র্যাটেজি ইংরাজী ভাষার বইপত্রে নাম দেওয়া হয়েছে “মুক্তামালা” নীতি বলে. এই নীতির কাঠামোর মধ্যেই চিন এক বছর আগে জলে নামিয়েছে নিজেদের বিমানবাহী জাহাজ “লিয়াওনিন” – ইউক্রেনের প্রাক্তন “ভারিয়াগ” নামের যুদ্ধ জাহাজ, যা নব্বইয়ের দশকের শুরুতে কেনা হয়েছিল একটা পর্যটনের হোটেল আর প্রমোদ কেন্দ্র তৈরী করার জন্য”.

ভারতীয়দের সম্পূর্ণ ভাবেই বোধগম্য অনুভূতিকে ব্যবহার করে, যারা স্পষ্টই চিনের এই “মুক্তামালা” নীতিকে নিজেদের সমুদ্রে চার পাশ থেকেই ঘিরে ধরার চেষ্টা বলে দেখতে পাচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারত মহাসাগরে ভারতকেই নিজেদের “বকলমে প্রতিনিধি” হিসাবে ভূমিকা দিতে চাইছে. তার ওপরে যেমন বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা থেকেই দেখা গিয়েছে যে, একসঙ্গে বেশ কয়েকটি এলাকায় লড়াই করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্রেফ ক্ষমতায় কুলোবে না.

এখন তাই প্রশ্নের উদয় হয়েছে: ভারতের প্রথম বিমানবাহী জাহাজ জলে নামানোর কি অর্থ? এটা কি চিনের স্বার্থের জন্যই সত্যিকারের হুমকি, যেরকম লেখা হয়েছে চিনের ইংরাজী ভাষায় বের হওয়া “গ্লোবাল টাইমস” জার্নালে, অথবা এটা স্রেফ ভারতের পক্ষ থেকে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ প্রতিরক্ষার চেষ্টা? – এই প্রসঙ্গে বরিস ভলখোনস্কি বলেছেন:

“এখানে উল্লেখ করার দরকার রয়েছে যে, প্রথমতঃ, নিজে থেকে একটা বিমানবাহী জাহাজ – খুবই চট করে ধ্বংস হওয়ার মতো লক্ষ্য, যদিনা তারই সঙ্গে অন্যান্য যুদ্ধজাহাজের পুরো একটা দলই থাকে, যেগুলো এর সঙ্গে যাওয়ার সময়ে সঙ্গ দিতে পারে, কারণ তা না হলে শক্তির ভারসাম্যে কোন বদলই হয় না. আর দ্বিতীয়তঃ, কোন অস্ত্রই নিজে থেকে চালু হয় না. আধুনিক পরিস্থিতিতে কোন দিকে গুলি করতে হবে, সেটা সামরিক বাহিনীর লোকরা ঠিক করেন না, করে রাজনীতিবিদরা. আর ভারত মহাসাগর এলাকাতে এমনিতেই অনেক হুমকি রয়েছে, যা যেমন ভারতের জন্য, তেমনই চিনের জন্যও আবার এমনকি সারা বিশ্বের জন্যও একই রকমের. অন্তত পক্ষে শুধু যদি জলদস্যূ সমস্যার কথাই ধরা হয়”.

তাই ভারতের “অবসার্ভার” (পর্যবেক্ষক) নামের তহবিলের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মী পি. কে. ঘোষের মতের সঙ্গে সহমত হওয়া চলতে পারে, যা সেই গ্লোবাল টাইমস কাগজেই লেখা হয়েছে যে, “ভারত ও চিনের উচিত্ হবে পারস্পরিক স্বার্থেই সামুদ্রিক জলদস্যূ সংক্রান্ত বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া, স্বার্থের ফারাকের দিকে নয়”.

শেষমেষ, লেখক যেমন ন্যায্য ভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, “স্থল আলাদা করে, আর সমুদ্রগুলো এক করে দেয়”.