“রেডিও রাশিয়ার” সাংবাদিক প্রতিনিধি ফোর্ট মিড সামরিক ঘাঁটিতে একদিন কাটিয়েছেন, যেখানে এই রায় দেওয়া হয়েছে ও বিভিন্ন মতামত শুনেছেন.

উইকিলিক্স সাইটের মুখ্য তথ্য সরবরাহকারীকে ৩৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, এটাই ছিল গতকালের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়. আর ম্যানিং নিজে এক যুব আদর্শবাদীর মডেল হয়েছেন, যে সরকারি ব্যবস্থার মধ্যে কাজ করে নিজের বিষয়ে সম্পূর্ণ রকমের ঝুঁকি নিয়েছে, যাতে সমস্ত মানব সমাজের সঙ্গে আমেরিকার প্রশাসনের অপরাধের বিষয়ে কথা বলা সম্ভব হয়.

আর যতক্ষণ এই সামরিক ঘাঁটিতে সাংবাদিকরা রায়ের অপেক্ষা করেছেন, ফোর্ট মিড ঘাঁটিতে ঢোকার পথে ব্র্যাডলি ম্যানিংয়ের পক্ষের লোকরা মিটিং করেছেন, যারা সারা দেশ থেকেই এখানে এসেছিলেন, তাঁরা স্লোগান দিয়েছেন:

“ব্র্যাডলি ম্যানিং, আমরা তোমার সঙ্গেই আছি! তুমি বিশ্বাসঘাতক নও, তুমি একজন বীর!”

ম্যানিং বিশ্বাসঘাতক নয়, সে বীর এই অবস্থান – বহু লক্ষ আমেরিকার লোকই মনে করেছেন, নিজেদের অবস্থান বলে. যুবক এই কম্পিউটার বিশেষজ্ঞের সমর্থনের মিছিল বুধবারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বহু শহরেই হয়েছে. আর তার ওপরে আদালতের সেই রায়ও লোকেদের খুবই আবেগাপ্লুত করেছে – ৩৫ বছরের জেল আর সামরিক বাহিনী থেকে বরখাস্ত করে অপমান করে ছেঁটে ফেলা. একদিক থেকে – এটা আজীবন কারাদণ্ড নয়, যা নিয়ে এই প্রক্রিয়ার শুরুতে বলা হয়েছিল, এটা ২০টি ধারা অনুযায়ী সব মিলিয়ে ৯০ বছরের জেল নয়, যে সব ধারাতে ম্যানিংকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে আর এমনকি ৬০ বছরও নয়, যা সামরিক অভিশংসকরা চেয়েছিল. কিন্তু ৩৫ বছর দেওয়া হয়েছে দেশের অপরাধ ফাঁস করে দেওয়ার জন্য আর তার সত্যের জন্য লড়াইকে গুপ্তচর বৃত্তির সঙ্গে এক করা হয়েছে – এটাই প্রশাসনের মিথ্যাচরণের বহিঃপ্রকাশ. এই রকমই মনে করেছেন সাংবিধানিক অধিকারের কেন্দ্র নামের সংগঠনের সভাপতি ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উইকিলিক্স সাইটের অ্যাডভোকেট মাইকেল রাটনার. তিনি এই রায় ঘোষণার সময়ে আদালতে উপস্থিত ছিলেন, তাই বলেছেন:

“আদালতে উপস্থিত সকলেই চমকে গিয়েছেন. এটা কোন রকমের যুক্তি ছাড়াই একটা রায়. ব্র্যাডলি ম্যানিংকে বিচার করাই যেতে পারে না, কোন কারণই নেই. সে এমন লোক, যে আমাদের দেশ সম্বন্ধে একটা ভয়ঙ্কর আর বীভত্স রকমের সত্য কথাই বলে দিয়েছে – অত্যাচারের বিষয়ে, অপরাধের বিষয়ে, নিরীহ লোকদের হত্যার বিষয়ে – আফগানিস্তানে ও ইরাকে যা করা হয়েছে. প্রশাসন আমাদের বিশ্বাস করাতে চেয়েছে যে, তার কাজের জন্য কেউ নাকি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আর নাকি সম্পত্তির ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু তারা এটা তারা প্রমাণই করতে পারে নি. কিন্তু আমরা জানি যে, চেইনি, বুশ, কণ্ডোলিজা রাইস, যারা সরকারি ভাবে সারা বিশ্ব জুড়ে বহু শত লক্ষ মানুষের বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য দায়ী, তারা কোন রকমের শাস্তি না পেয়েই পার পেয়ে গিয়েছে, এদের সঙ্গে তুলনায় সেই লোকটিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে, যে তাদের কাজ কারবার নিয়ে সত্য কথা বলেছে”.

যুবক এই সৈনিকের অ্যাডভোকেট প্রকৃত তথ্য ফাঁস করে দেওয়া সৈনিকের তরফ থেকে আদালতে একটি ঘোষণা পাঠ করেছেন, যেখানে তিনি আবারও বলেছেন যে, নিজের বিবেক ও নীতির পথ ধরেই তিনি চলছেন. ম্যানিং তাঁর ঘোষণায় উল্লেখ করেছেন যে, তিনি আমেরিকার লোকদের এক স্বাধীন দেশে থাকার অধিকারের জন্য নিজের স্বাধীনতার মূল্য দিতে তৈরী রয়েছেন.

আমেরিকার সামরিক বাহিনীর আইন অনুযায়ী, ম্যানিংয়ের মামলা স্বয়ংক্রিয় ভাবেই আপীল আদালতে যাবে. সৈনিকের অ্যাডভোকেটের কথামতো, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির কাছেও আবেদন করবেন হয় মার্জনা নয়তো ম্যানিংয়ের কারাবাসের সময় সীমা কমিয়ে দেওয়ার জন্য. তাত্ত্বিক ভাবে ম্যানিং নয় বছর বাদেই জেল থেকে বের হতে পারেন আর ভাল ব্যবহার করলে, তারও আগে. সুতরাং প্রাথমিক ভাবে দেওয়া ৩৫ বছর কারাদণ্ড ততটা রক্তপিপাসু বলে মনে হচ্ছে না. এমনকি উইকিলিক্স সাইটের স্থপতি জুলিয়ান আসাঞ্জ এই রায়কে বলেছেন অ্যাডভোকেটদের বিজয় বলে, তিনি বলেছেন:

“এটা একটা কৌশলগত বিজয়. সব থেকে কম সময়, যতটা ম্যানিংকে জেলে থাকতে হবে, তা মাত্র পাঁচ বছরের কিছুটা বেশী সময়, কারণ সে ইতিমধ্যেই জেলে যতদিন রয়েছে, তা হিসাবে আনলে, তাই হয়. তার ওপরে তার ভাল ব্যবহার ও সেই সমস্ত অত্যাচার, যা তার ওপরে করা হয়েছে. সুতরাং ম্যানিংয়ের অ্যাডভোকেটদের দল ও আরও সমস্ত মানুষ, যাঁরা ম্যানিংকে সমর্থন করেছেন, তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে একটা বড় কৌশলগত বিজয় অর্জন করার. তারই মধ্যে আমি বিশ্বাস করি যে, ম্যানিংকে গ্রেপ্তার করাই একেবারে ঠিক কাজ হয় নি”.

বহু আমেরিকার বিশেষজ্ঞই বিশ্বাস করেন যে, সামরিক আদালতের রায় – এটা একটা স্পষ্টই দেখতে পাওয়ার মতো ইঙ্গিত যা সাংবাদিক ও সরকারি কর্মচারী আর সামরিক বাহিনীর লোকদেরকে, যারা সম্ভাব্য খবর ফাঁস করতে পারেন, তাদের প্রতি দেওয়া হয়েছে. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন, এই ভাবেই দেখিয়ে দিচ্ছে যে, যারা সিস্টেমের বিরুদ্ধে যাবে, তাদের জন্য কি ভাগ্য অপেক্ষা করছে.