আলেক্সেইয়ের জন্ম হয়েছিল ১৬৯০ সালে. তার মা ছিলেন পিটার দ্য গ্রেটের প্রথম পত্নী ইয়েভদাকিয়া লপুখিনা. কিন্তু দুর্দমমতি পিটার শীঘ্রই ইয়েভদাকিয়ার প্রতি নিরাসক্ত হয়ে যান এবং তাকে খ্রীশ্চান মঠে পাঠিয়ে দেন চিরকালের মতো. ছেলেবেলাতেই আলেক্সেই মা’কে হারিয়েছিল আর নির্দয় পিতা তার প্রতি মনোযোগ দিতেন না, আদরাত্মির কথা তো বলাই বাহুল্য. বয়স বাড়ছিল এবং ১৭১১ সালে তত্কালীন রুশী যুবরাজ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন জার্মানীর রাজকন্যার সাথে. তবে তার ব্যক্তিগত পছন্দে নয়, তাকে বিয়ে করতে হয়েছিল পিতার লৌহসম মনোবাসনায়. চার বছর পরে যুবরানীর অকালপ্রয়াণের পরে পিটার আবার ছেলের জন্য উপযুক্ত পাত্রী খুঁজতে শুরু করলেন. পুত্রের নিজস্ব মতামতের প্রতি পিটার আমলই দিতেন নাঃ সর্বদা এবং সর্বক্ষেত্রে তাকে পিতার আদেশ মেনে চলতে হতো. বোঝাই যায়, যে তাদের মধ্যে দূরত্বের গহ্বর ক্রমশঃ গভীরতর হচ্ছিল. জারের শত্রুরা যুবরাজের ওপর বাজি ধরছিল, যাতে সে যত দ্রুত সম্ভব পিটারের জায়গায় রাশিয়ার সিংহাসনে আসীন হয়.

১৭১৫ সালের অক্টোবরে পিটারের দ্বিতীয় স্ত্রী একাতেরিনা তাকে পুত্রসন্তান উপহার দেন. পিতার সম্মানে তারও নামকরন করা হয়েছিল পিটার বলে. বিগলিত সম্রাট জ্যেষ্ঠ পুত্রকে চরম শর্ত দিয়েছিলেনঃ হয় সে রাশিয়াকে খোলনলচে ধরে বদলানোর কাজে পিতাকে সহায়তা করবে, অন্যথায় কনিষ্ঠ ভাইকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার ছেড়ে দিক. আলেক্সেই নির্দ্বিধায় নবজাতক পিটারকে সিংহাসনের উত্তরাধিকার ছেড়ে দিতে সম্মত হন. আলেক্সেইয়ের তরফ থেকে এত সহজে সিংহাসনের উত্তরাধিকার হাতছাড়া করা পিটার দ্য গ্রেটকে যুগপত্ বিস্মিত ও ক্রুদ্ধ করেছিল. তিনি ভেবে নিয়েছিলেন, যে তাঁর মৃত্যুর পরে আলেক্সেই অবশ্যই কনিষ্ঠ ভাইকে সিংহাসনচ্যুত করার চেষ্টা করবে. জীবনে সেই প্রথমবার জার পিটার মনস্থির করতে পারলেন না, যে কিংকর্তব্য. সিদ্ধান্ত নিতে না পেরে তিনি পাড়ি দিলেন ডেনমার্কে.

১৭১৬ সালের অগাস্ট মাসে আলেক্সেই সম্রাট পিতার কাছ থেকে পত্রযোগে আদেশ পেলেন অবিলম্বে কোপেনহেগেনে উপস্থিত হওয়ার. পিটারের শত্রুরা তত্ক্ষণাত আলেক্সেইয়ের মগজ ধোলাই করতে শুরু করলো তাকে এই বুঝিয়ে, যে “জার তোকে খতম করতে চায় দেশের বাইরে, তাই পালিয়ে যা অবিলম্বে, অস্ট্রিয়ার রাজার কাছে সাহায্য প্রার্থণা কর”. দীর্ঘ সময় ধরে দোদুল্যমান থাকার পরে অবশেষে আলেক্সেই দেশ থেকে পালাতে সম্মত হয়েছিলেন. তিনি অস্ট্রিয়ার ভূখন্ডে পিটারের দেহাবসানের প্রতীক্ষা করতে চেয়েছিলেন, যিনি সেই সময় গুরুতর অসুস্থ ছিলেন. তারপরে অস্ট্রিয়দের সহায়তায় তীক্ষ্ণবুদ্ধি যুবক রাশিয়ার সিংহাসন কেড়ে নিতে চেয়েছিল. শুরুতে রাশিয়ার সিংহাসনে হাতের পুতুল জারকে বসানোর ধারণাটা অস্ট্রিয়ার রাজসভার মনঃপূত হলেও, শীঘ্রই তারা বুঝতে পারলো যে যুবরাজের না আছে যথেষ্ট সাহস, না প্রয়োজনীয় বুদ্ধি. মোহভঙ্গ হওয়া অস্ট্রিয়রা তার প্রতি আগ্রহ হারালো.

অন্যদিকে পিটার বুঝে উঠতে পারছিলেন না, যে তাঁর ছেলে উধাও হয়ে গেল কোথায় ? প্রথমে তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে তাকে কব্জা করেছে সুইডিশরা, যাদের বিরুদ্ধে তখন তিনি যুদ্ধাভিযান চালাচ্ছিলেন. কিন্তু শীঘ্রই রুশী গুপ্তচরেরা পলাতককে আবিষ্কার করে অস্ট্রিয়ায়. জার অবিলম্বে পুত্রকে ফেরত পাঠানোর দাবী করেন, অন্যথায় অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার হুমকি দেন. যুবরাজ পিটারের কাছ থেকে পত্র পেলেন, যেখানে জার তাঁর পদস্খলিত পুত্রকে লিখেছিলেন – “আমি তোকে আশ্বস্ত করছি এবং ভগবান ও আদালতের দিব্যি দিয়ে বলছি, যে তোকে কোনো সাজা দেওয়া হবে না”. কিন্তু আলেক্সেই পিতার প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করতে না পেরে মরিয়া হয়ে পিতার পরম শত্রু সুইডেনের রাজার কাছে সাহায্য প্রার্থণা করে পত্র পাঠিয়েছিলেন. কিন্তু তার কোনো উত্তর না পেয়ে তিনি স্বদেশে প্রত্যাগমন করতে বাধ্য হন. পিতার কাছে তার অন্যায় আচরণের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আলেক্সেই সব দোষ চাপিয়েছিলেন ঘনিষ্ঠদের ঘাড়ে, যে তারাই নাকি তাকে পদস্খলিত করেছিল. কিন্তু আলেক্সেইয়ের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে তার প্রাক্তনা প্রেয়সী এফ্রাসিনিয়া, যে আলেক্সেইয়ের সাথে একত্রে চম্পট দিয়েছিল অস্ট্রিয়ায়. সে জারের কাছে পুত্রের সব কুমতলব ফাঁস করে দেয়, এমনকি সুইডেনের রাজার উদ্দেশ্যে লেখা চিঠির কথাও জানিয়েছিল. আপন পুত্রের বিশ্বাসঘাতকতায় পিটার এতটাই বিদ্যুত্স্পৃস্ট হয়েছিলেন, যে সন্তানের শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করার ভার তিনি অর্পণ করেছিলেন সভাসদদের উপর. তারা মৃত্যুদন্ডের রায় দিয়েছিল.

জার পিটারের জ্যেষ্ঠ পুত্র আলেক্সেই মারা যায় কারাগারে ১৭১৮ সালের ২৬শে জুন. কেউ নিশ্চিত করে জানে না, কিভাবে সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর মৃত্যু হয়েছিল. সরকারিভাবে জানানো হয়েছিল, যে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে. তবে কেউ তাতে বিশ্বাস করেনি. সাধারণ মানুষ কানাকানি করে বলতো, যে তাকে কারাগারে শ্বাসরুদ্ধ করে মারা হয়েছিল. যুবরাজের মৃত্যুর এক বছরের মধ্যেই আচমকা মৃত্যু হয় সিংহাসনের অপর উত্তরাধিকারী ৪-বছর বয়সী জুনিয়র পিটারের. লোকে বলতো, যে ভগবানের দিব্যি দিয়ে আলেক্সেইকে সাজা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা পূরণ না করার সাজা পেয়েছেন জার ভগবানের কাছ থেকে – একেবারে পুত্রহীন হয়ে. বিদীর্ণহৃদয় জার রয়ে যান উত্তরসূরীবিহীন হয়ে. তাই পিটার দ্য গ্রেটের মৃত্যুর পরে রাশিয়ায় শুরু হয়েছিল একের পর এক প্রাসাদ অভ্যুত্থান.