রাজিনের অনুগত লোকেরা তুরস্ক, পারস্যে সামরিক অভিযানে জোটবদ্ধ হয়ে পাড়ি দিয়েছিল, তারা রুশী ব্যবসায়ী জাহাজগুলোর উপরও হানা দিয়ে লুটপাট করতো. জারের সেনানায়কদের জন্য রাজিন ছিল লুঠতরাজ আর নিরন্ন জনতার জন্য সে ছিল রূপকথার নায়ক. আর ১৬৭০ সালের বসন্তে যখন আতামান রাজিন জারের স্থানীয় প্রশাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার ডাক দিয়েছিল, তখন হাজার হাজার মানুষ তাতে যোগ দিয়েছিল. কিন্তু শক্তিতে কুলায়নি, জারের বাহিনী বিদ্রোহীদের চূর্ণবিচূর্ণ করেছিল. স্তেপান রাজিন ও তার ভাই ফ্রোলকে পাকড়াও করে মস্কোয় আনা হয়েছিল মুন্ডচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে. তাদের উপর নৃশংস শারীরিক অত্যাচার করে জানবার চেষ্টা করা হয়েছিল, যে কোথায় লুকানো রয়েছে আতামানের বিপুল ধনসম্পদ. কিন্তু স্তেপান তার গোপন রহস্য উদ্ঘাটন করেনি. তার ভাই ফ্রোল শেষ মুহুর্তে হত্যা মঞ্চ থেকে চিত্কার করে বলেছিল, যে সে জানে কোথায় লুকানো আছে বিপুল ধনসম্পদ. অত্যাচারে জর্জরিত স্তেপান রাজিন গোঙানির স্বরে বলেছিল – “চুপ কর”. এটা ছিল স্তেপান রাজিনের উচ্চারিত শেষ কথা. ঘাতক তত্ক্ষণাত তার মুন্ডচ্ছেদ করে. ফ্রোলের মৃত্যুদন্ড সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়. কিন্তু তার নির্দেশানুযায়ী খোঁজ করে কোনো ধনসম্পদ আবিষ্কার করা যায়নি. অবশেষে রুশী জার ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেন এবং ফ্রোলেরও মুন্ডচ্ছেদ করা হয়.

এই কাহিনী সাধারণ মানুষের কল্পনাশক্তিকে চাগিয়ে দিয়েছিল এবং ভোলগা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে স্তেপান রাজিনের ভূগর্ভস্থ অসংখ্য ধনরত্ন ভান্ডারের সম্পর্কে রটনা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা রাশিয়ায়. এই কথা প্রচলিত ছিল, যে প্রত্যেকটি গুপ্তভান্ডারে আতামান নাকি এমন সাংঘাতিক গুপ্তিমন্ত্র রেখেছিলেন যে, যে ব্যক্তি সেই ভান্ডারের দুয়ার উন্মোচণ করার দুঃসাহস দেখাবে, তার অনতিবিলম্বে অপঘাতে মৃত্যু হবে.

জ্ঞানগম্যিওয়ালা মানুষেরা হাসতো এই সব কুসংস্কার শুনে. কিন্তু তারাও ১৮৯৩ সালে নিঝেগরোদস্কি রাজ্যে ঘটা অবোধ্য ঘটনায় হতবাক্ হয়ে গিয়েছিল. একবার স্থানীয় চাষীরা মাটির নীচে প্রায় ৪০ মিটার গভীর খাদ আবিষ্কার করলো. দুই জন দুঃসাহসী দড়ি ধরে সেখানে নেমেছিল. যখন একজনকে টেনে তোলা হয়, সে এতটাই ভয়ার্ত ছিল, যে তার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার প্রাণবায়ু উড়ে যায়. দ্বিতীয় জনের ভাগ্য তুলনামুলকভাবে ভালো ছিল – সে জানাতে পেরেছিল, যে ভূগর্ভে সে দেখেছে বিশাল ভারী ওক কাঠের দরজা, যাতে ভারী লোহার খিল লাগানো এবং বিশাল তালা ঝুলছে সেখানে. চাষীদের প্রত্যক্ষ করা বৃত্তান্ত সবিষদে পুলিশকে জানানো হয়েছিল. তারাও তারপর ঐ খাদে নেমেছিল, কিন্তু কোনো ওক কাঠের দরজা দেখতে পায়নি. কিন্তু নীচে নামা কৃষকটি তার প্রত্যক্ষ দর্শনে অনড় ছিল, বোঝা যায়নি, আদপে কি ছিল সেখানে.

১৯৪২ সালের শেষ নাগাদ স্তালিনগ্রাদে জার্মান ফৌজদের বিরুদ্ধে সোভিয়েত সেনাবাহিনীর মরনপণ যুদ্ধ চলছিল তখন. সিনিয়র ক্যাপ্টেন বেসসোনভ তার স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, কেমন করে তার অধীনস্থ যোদ্ধারা ঘটনাচক্রে ধনরত্নের ভান্ডার আবিষ্কার করেছিল. জার্মান নাত্সী বাহিনীর গোলাগুলির বহরে ভোলগা নদীর পাড় ধ্বসে যেতে শুরু করেছিল, তখন সৈন্যরা আবিষ্কার করে মাটির তলায় পোঁতা কয়েকটি লৌহনির্মিত প্রাচীন কামান. একটা কামানের মুখ বিচূর্ণ হয়ে যাওয়ায় সেখান থেকে খসে পড়ছিল দামী অলঙ্কার, মুক্তো ও স্বর্ণমুদ্রা. সৈনিকদের তত্ক্ষণাত্ মনে পড়েছিল রাজিনের অলৌকিক ধনভান্ডার সম্পর্কে. তারা কামানগুলোকে ভূগর্ভ থেকে বার করার চেষ্টা করেছিল. কিন্তু শত্রুপক্ষ এত তীব্র আক্রমণ শানাচ্ছিল, যে তারা লুকাতে বাধ্য হয়েছিল. পরের দিন নাত্সীদের প্রবল গোলানিক্ষেপে ভোলগার পাড় কামানগুলোসুদ্ধ সলিল সমাধি নেয় ভোলগার তলায়. তারপরে শুরু হয় প্রতি-আক্রমণ, এবং কামানগুলো সম্পর্কে ভুলে যেতে বাধ্য হয়েছিল সৈনিকরা.

মহাফেজখানায় এখনো অক্ষত নথি থেকে জানা গেছে, যে বাস্তবিকই স্তেপান রাজিন তার বিপুল ধনরত্ন কামানে ভরে সেগুলির মুখ সীল করে মাটির নীচে চাপা দিয়ে রেখেছিল. খুব সম্ভবতঃ রাজিনের অধীনস্থ লোকেরা সেরকমই কয়েকটা কামানের হদিশ পেয়েছিল. তার মানে আতামানের ঐশ্বর্য কোনো রূপকথা নয়, বাস্তবে তার অস্তিত্ব আছে. আর কেই বা বলতে পারে, ভবিষ্যতে কোনো সৌভাগ্যশালীর কপালে হয়তো আতামানের বিপুল সম্পদ আবিষ্কার করে তার অধিপতি হওয়ার ললাটলিখন থাকবে!